ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

খাদ্যাভ্যাস

ভোজ্যতেল উৎপাদন যে কারণে জরুরি

ভোজ্যতেল উৎপাদন যে কারণে জরুরি

.

মো. মাহমুদুল হাসান খান

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:৪৪

মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও জনসংখ্যার ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। মাথাপিছু দৈনিক ৪০ গ্রাম ধরে ২০৩০ সালে ভোজ্যতেলের দেশীয় চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ২৮ লাখ টন। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ভোজ্যতেল আমদানি করতে বাংলাদেশ সরকারকে প্রতি বছর ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয় (২০২৩)। অথচ তেল জাতীয় ফসলের দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব। 

বর্তমানে ২৪ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে দেশে ভোজ্যতেল উৎপাদন মাত্র ৩ লাখ টন। অর্থাৎ মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভোজ্যতেলের মধ্যে সরিষার তেলই প্রধান, যা দেশীয় ভোজ্যতেলের প্রায় ৩৬ শতাংশ। সয়াবিন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈলবীজ ফসল, যা বছরে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার টন উৎপাদিত হয়। তবে এর পুরো পরিমাণ তেল নিষ্কাশন ছাড়াই পোলট্রি ফিড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। 
উল্লেখ্য, ভোজ্যতেল হিসেবে সরিষার তেলে সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ ৩০ শতাংশের নিচে ও অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ ৫০ শতাংশের ওপরে এবং ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ এর অনুপাত ১:২ বিদ্যমান, যা পুরোপুরি স্বাস্থ্যসম্মত।

বাংলাদেশে আবাদ করা তেলবীজ আবাদি জমির প্রায় ৬০ শতাংশ সরিষার আওতায় এবং কমবেশি সব জেলাতেই সরিষার চাষ হয়। ডিএই সূত্রে জানা যায়, দেশে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদে উৎপাদিত সরিষার পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৩৫ লাখ টন এবং গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের সরিষার আওতায় জমির পরিমাণ বাড়ে প্রায় ২ লাখ হেক্টর। ভোজ্যতেল হিসেবে সরিষা তেলের চাহিদা বৃদ্ধি, অনুকূল আবহাওয়া, সরিষা আবাদে কৃষকের সচেতনতা বৃদ্ধি ও উচ্চফলনশীল জাতের সরিষা কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারিত হওয়ায় চলতি অর্থবছরে সরিষার উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বৃদ্ধির কারণ। সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ‘তেল জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’-এর আওতায় জুন ২০২৫ সালের মধ্যে প্রত্যাশার অনুকূলে ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন দিয়ে মেটানো সম্ভব হবে। ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশে তেল জাতীয় ফসল সরিষা চাষের আওতায় জমির পরিমাণ বৃদ্ধিসহ উচ্চফলনশীল জাতের দ্রুত সম্প্রসারণ ও উৎপাদন কলাকৌশলে আধুনিক পদ্ধতির অনুসরণই একমাত্র উপায়।

বাংলাদেশে সাধারণত আমন ধান চাষের পর জমি পতিত থাকে। এর পর সেই জমিতে বোরো ধানের চাষ করা হয়। তেল উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজন আমন ধানের পর জমি পতিত না রেখে স্বল্পমেয়াদি সরিষার আবাদ করা। এ জন্য দেশের বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে স্বল্প জীবনকালের (১০০ থেকে ১২০ দিন) অথচ উচ্চফলনশীল আমন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন, যেগুলো মূল জমিতে চারা রোপণের মাত্র ৮০ থেকে ৯৫ দিনের মধ্যেই ঘরে তোলা যায়। এর পর জমি পতিত না রেখে উন্নত জাতের সরিষা চাষ করা সম্ভব হচ্ছে, যেগুলো ৮০-৮৫ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হওয়ায় পর একই জমিতে আবার বোরো ধান চাষ করে প্রচলিত দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলিতে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ২২ লাখ হেক্টর জমি আমন-পতিত-বোরো শস্য বিন্যাসের অন্তর্ভুক্ত (সূত্র: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর)। বাংলাদেশে সরিষা বপন-পরবর্তী অগ্রহায়ণ (মধ্য নভেম্বর থেকে মধ্য ডিসেম্বর) মাসে নিম্নচাপজনিত বৃষ্টিপাতের কারণে জমিতে সাময়িক জলাবদ্ধতায় দেশি জাতের সরিষা টরি-৭সহ অন্যান্য উচ্চফলনশীল জাত নষ্ট হলেও বারি সরিষা-১৮ ও বারি সরিষা-১৯ জাত পাঁচ দিন পর্যন্ত সাময়িক জলাবদ্ধতা/জলমগ্নতা-সহিষ্ণু হওয়ায় কৃষকরা ফসলহানি থেকে রক্ষা পাচ্ছে। কাজেই উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৭সহ বারি সরিষা-১৮ জাতের আবাদ নিশ্চিতকরণ; শস্যবিন্যাসে উল্লিখিত সরিষার জাতগুলোর অন্তর্ভুক্তিকরণসহ পতিত জমি ও চরাঞ্চলে সরিষার জাতগুলোর আবাদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। 

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীগণ পরিবর্তনশীল আবহাওয়া উপযোগী ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, যা তেলবীজ উৎপাদনের সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা (চাহিদার ৪০ শতাংশ) অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বারি উদ্ভাবিত সরিষার জাতগুলোর বীজের সহজলভ্যতার জন্য প্রয়োজন সরকারি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএডিসি ও বেসরকারি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উন্নতজাতের মানসম্পন্ন বীজ পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন। একই সঙ্গে প্রয়োজন কৃষি সম্প্রসারণ ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মাধ্যমে সরিষা চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্বুদ্ধকরণ, সরিষার সঠিক চাষাবাদ পদ্ধতি বিষয়ে কৃষকদের অবহিতকরণ, মাঠ পর্যায়ে মনিটর জোরদারকরণ এবং যথাসময়ে বীজ সরবরাহের নিশ্চয়তা প্রদান।

ড. মো. মাহমুদুল হাসান খান: গবেষক, 
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট
mhasan.bari12@gmail.com

আরও পড়ুন

×