ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

পাকিস্তান

ইমরান বনাম জেনারেলের খেলা শেষ হবার নয়

ইমরান বনাম জেনারেলের খেলা শেষ হবার নয়

.

বিবেক কাতজু

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:৪৬ | আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০৯:৫৬

পাকিস্তানের নির্বাচনে প্রধান দুই খেলোয়াড় ছিলেন বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও  পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান। জেনারেল মুনির পর্দার আড়ালে থেকে সব পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ইমরান খানকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সে নির্বাচনে ইমরান খানের পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যেভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছেন, তাতে বলতেই হবে– সেনাপ্রধান এতে ব্যর্থ হয়েছেন।

গত বছরের মে মাসের শুরু থেকে ইমরান খান কারাগারে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলায় তাঁকে দণ্ডও দেওয়া হয়েছে, যে কারণে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা প্রচারণায় অংশ নিতে পারেননি। তাঁর দলের প্রার্থীদেরও স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছে। কারণ, পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন পিটিআইর ব্যাট প্রতীক নিষিদ্ধ করে। এসব সত্ত্বেও নির্বাচনে ইমরান খানের সহকর্মী তথা পিটিআইর প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান। তারা সেনাবাহিনীর পছন্দের দল নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লীগের (পিএমএল-এন) নওয়াজ শরিফ কিংবা বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) থেকেও বেশি আসন পান। এর মানে, ব্যাপক প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও ইমরান খান ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন।

কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পওয়ায় পাকিস্তানে জোট সরকার গঠন করতে হবে। পাকিস্তানের মোট আসন ৩৩৬টি। এর মধ্যে সরাসরি নির্বাচন হয় ২৬৬টি আসনে, তবে এবার একটি আসনে স্থগিত থাকায় ২৬৫টিতে ভোট হয়েছে। সেখানে ৭০টি সংরক্ষিত আসন; এর মধ্যে ৬০টি নারী ও ১০টি সংখ্যালঘু আসন। পিটিআই যেহেতু দলগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি, দলটি নারী ও সংখ্যালঘু আসন পাবে না। তবে পিটিআই মজলিস ওয়াহদাত-ই-মুসলিমিন (এমডব্লিউএম) দলের সঙ্গে যোগ দেবে। ছোট্ট এ দলটি খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে নির্বাচিত। এমডব্লিউএমের সঙ্গে যোগ দিলেও পিটিআই সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। অন্য দলগুলো জেনারেল মুনিরের চাপে কিংবা নিজেরাই পিটিআইর সঙ্গে জোটবদ্ধ হবে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার গঠন করতে পিপিপির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দলটি সিন্ধু ও পাঞ্জাবে জয়ী হয়েছে। এ নির্বাচনের আগে পিএমএল-এন ও পিপিপি মিলে যে পিপলস ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট বা পিডিএম গঠন করা হয়, সে আলোকে সরকার গঠনের বিষয়ে সেনাবাহিনী বলতে পারে। সরকার গঠন বিষয়ে উভয়ের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে কিছু কারণে তাদের জোটের আলোচনা কঠিন হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সম্ভবত জেনারেল মুনির এবং তাঁর জেনারেলরা ‘পাকিস্তানের মঙ্গল’-এর জন্য দল দুটিকে সমঝোতায় নিয়ে আসবে। পিএমএল-এন ও পিপিপির সরকারে নওয়াজ শরিফের চতুর্থবারের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণ না-ও হতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত– এ জন্য পিএমএল-এন লড়াই করবে।

পাকিস্তানের এবারের নির্বাচনের ফলাফলকে কীভাবে দেখা উচিত? ইমরান খান আবারও খাইবার পাখতুনখোয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন। মজার বিষয় হলো, ইমরান খান রাজনৈতিকভাবে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ পাঞ্জাবের ঘাঁটি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বলার বিষয় হলো, দেশটির সেনাবাহিনী মূলত পাঞ্জাবি এবং গত বছরের ৯ মে ইমরান খানের সমর্থকরা সেনানিবাসে হামলা চালায়। এ কারণে জেনারেল মুনির ও ইমরান খানের মধ্যকার সম্পর্কের স্থায়ী অবসান ঘটে। এ ঘটনার পর গত ৯ মাসে সেনাবাহিনী এই বয়ানকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে– ইমরান খান এবং পিটিআইর সদস্যরা দেশপ্রেমিক নয়। কারণ তারা দেখাতে চেয়েছে, সেনাবাহিনী তার ভূখণ্ড ও আদর্শিক অখণ্ডতার প্রতীক। এটি স্পষ্ট, সেনাবাহিনীর এমন প্রচারণায় খানের জনসমর্থনে তেমন প্রভাব পড়েনি।

প্রশ্ন হলো, ইমরান খান যে এই নির্বাচনে সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন, তা কি আদালতে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে, যাতে তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে নামতে পারেন? কারণ, জাতীয় পরিষদে ‘ইমরান খানের’ সদস্যদের উপস্থিতি বেশি থাকবে, ফলে বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপরও তাদের প্রভাব কাজ করতে পারে। অন্যদিকে সেনাবাহিনী ও সরকারি জোট পিটিআই সমর্থিত সদস্যদের ভাগাতে চেষ্টা করবে। তবে বেশির ভাগই হয়তো ভোটারদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া চিন্তা করে ইমরান খানের প্রতি অনুগত থাকবেন। ইমরান খান অবিলম্বে বিচার বিভাগ থেকে মুক্তি পাবেন– এমনটি হয়তো দেখা যাবে না। তবে তিনি মুক্তি পেলে পাকিস্তানেই থাকবেন; তিনি এমন প্রকৃতির নন যে ভিনদেশে নির্বাসনে যেতে রাজি হবেন। 

সবাই এটি জানেন, সেনাবাহিনীর মধ্যেও ইমরান খানের যথেষ্ট সমর্থন রয়েছে। যদিও ৯ মে পিটিআইর সেনা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনার পর জেনারেল মুনির ইমরানপন্থিদের নির্মমভাবে নির্মূল করেন এবং এর মধ্যে একজন সেনা কমান্ডারও ছিলেন। তবে নির্বাচনের এই ফল ইমরানের পক্ষের সেনাসদস্যদের পুনরুজ্জীবিত করতে পারে; আবার জেনারেল মুনির এবং আইএসআইও কঠোরভাবে হয়তো তাদের মোকাবিলা করবেন।

পাকিস্তানি নাগরিকদের একটি অংশ চায়, সেনাবাহিনী যাতে রাজনীতির বাইরে থাকে। এবারের নির্বাচনের ফল তাদের জন্য আশার আলো হবে। তারা আশা করতে পারে, সেনাবাহিনী যাতে জাতীয় দায়িত্ব পালনে তার নিজস্ব ভূমিকায় ফিরে যায়; সে জন্য তারা উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু তেমনটি ঘটবে বলে মনে হয় না। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার পেশাদারিত্ব ও রাজনৈতিক উভয় ভূমিকাই পালন করে যাবে। আর ইমরান খানের প্রতি জেনারেল মুনিরের বিদ্বেষও কমবে বলে মনে হয় না, কারণ ইমরান সেনাবাহিনীর বহু যুগের খেলায় ছাই ঢেলে দিয়েছেন।

বিবেক কাতজু: ভারতের সাবেক কূটনীতিক; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×