ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

উচ্চারণের বিপরীতে

পাকিস্তানের নির্বাচনে যে নতুন বার্তা

পাকিস্তানের নির্বাচনে যে নতুন বার্তা

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:৪৮

গত ১০ মাস যাবৎ কারাগারে ইমরান খান। তিন মামলায় ৩০ বছর সাজা হয়েছে তাঁর, দলের প্রতীক বাতিল হয়েছে। দলের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। প্রচার-প্রচারণায় প্রতিবন্ধকতা ছিল, দলের প্রধান নেতাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু সব ছাপিয়ে বৃহস্পতিবার [৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪] অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ [পিটিআই] রীতিমতো বিস্ময় জাগিয়েছে। শুক্রবার গভীর রাতে বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, ঘোষিত ২৪১ আসনের ফলাফলে ইমরানের দল-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই অন্য যে কোনো দলের চেয়ে বেশি আসনে জয়ী হয়েছেন। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও পাকিস্তানের রাজনীতিতে পিটিআইয়ের শক্ত অবস্থান বিশ্বব্যাপী নতুন বার্তা দেবে।

১৯৪৭ সালে অখণ্ড ভারত বিভক্তির মধ্য দিয়ে যে পাকিস্তানের সৃষ্টি, জন্মলগ্ন থেকে দেশটিতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি অনুপস্থিত। একই সময়ে সৃষ্ট ভারতে দ্রুত ১৯৫১ সাল নাগাদ প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী ৭৪ বছরে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ধারাবাহিকতা অবিরাম চলে, সেখানে ১৯৭০ সালের আগে সেনাবাহিনীর দাপটে পাকিস্তানে আদৌ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও পাকিস্তানি সেনাশাসকরা ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করে। পাকিস্তানে সেনাশাসন এর পরও বেশির ভাগ সময়ই নানাভাবে জেঁকে বসে থাকে। গত পঞ্চাশ বছরে পাকিস্তানে সামরিক গোষ্ঠী কখনোই রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ রাজনীতিবিদদের হাতে ছাড়েনি। কখনও নিজেরা সরাসরি, কখনও আপাত বেসামরিক নেতৃত্বকে সামনে রেখে সেনাবাহিনী দেশটির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণে পাকিস্তানের শোচনীয় দুর্বলতা দেশটিকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে শনাক্ত করতে থাকে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠে বিশ্বখ্যাত সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের অনমনীয় দৃঢ়তা আসলে কী বার্তা দেয়? ২০১৮ সালে পিটিআই নেতা ইমরানের পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসার পেছনে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের কথা যতটা জোরেশেরে শোনা যায়, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন ইমরানকে দেখা যায়, তার প্রশাসনে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের ততটাই বিরোধী ছিলেন তিনি। এমনকি নিজের ক্ষমতা হারানোর পেছনে ইমরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রসহ পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দায়ী করে বসেন। ইমরানের সাহসী আচরণ তাঁকে বিপুল জনপ্রিয় করে তোলে। পাকিস্তানের নির্বাচনে বন্দি ইমরানের জনপ্রিয়তায় বোঝা যাচ্ছে, জনগণের নেতা হতে চলেছেন তিনি।
অক্সফোর্ডে শিক্ষিত, খেলার মাঠে কখনও হাল ছেড়ে না দেওয়া ক্রিকেটার ইমরান খান রাজনীতির মাঠেও হাল ছেড়ে না দেওয়ার যে মরণপণ ও সুদৃঢ় আচরণ দেখাতে শুরু করেছেন, এর ফল তিনি পাচ্ছেন; তাঁর দল পাচ্ছে। পাকিস্তানের ক্ষমতার মসনদে শেষ পর্যন্ত ইমরানের দল বসতে পারবে কিনা, এ নিয়ে সন্দেহ থাকলেও নেতৃত্বের সাহস ও দৃঢ় মনোবল খাদের কিনারে থাকা দলকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, পাকিস্তানের পিটিআই ও ইমরান খান এর দুর্দান্ত উদাহরণ। 

০২.
ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রবণতার ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের সাথেই বাংলাদেশের সাযুজ্য বেশি, বলা যায়। ভারতে একটিবারের জন্যও সেনাবাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়নি, আমাদের দেশে সেনাবাহিনীর রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগীদার হওয়ার অভিজ্ঞতা বেশ পুষ্ট। অন্যদিকে বিরোধী নেতাকর্মীকে দমন-পীড়নে ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের সাথেই আমাদের সাদৃশ্য বেশি। বিশেষ করে ৭ জানুয়ারি, ২০২৪-এর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বছরখানেক সময়ের মধ্যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির যে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর নামে মামলা দায়ের করা হয় এবং তাদের মধ্যে একটি বড় অংশকে নানা সময়ে জেলে আটকে রাখা হয়; তার পরিসংখ্যান বিভিন্ন সময়ে আমরা জানতে পারি। বিএনপি নেতাকর্মী অনেকেই দীর্ঘদিন বাড়িঘর ছাড়া– এমন সংবাদ নিয়মিত মেলে। এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের প্রধান নেতাদের আচরণ আমরা কেমন দেখি?

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থ, দীর্ঘ কারাভোগের পর বিশেষ বিবেচনায় তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসাধীন। তাঁর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একক নির্দেশনায় দল পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে অনেক মামলা আছে, তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ভিডিও বার্তায় সংযুক্ত হয়ে দল পরিচালনা করেন বলে আমরা জানতে পারি। তবে তাঁর কোনো কোনো সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে বরাবর প্রশ্ন থাকে। যেমন, ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না– এই দাবিতে অনড় থাকলেও শেষ মুহূর্তে তারা সেখান থেকে সরে এসে সমমনা কয়েকটি দলের সাথে জোট গঠন করে নির্বাচনে যায়, নির্বাচনে তারা সাতটি আসনে বিজয়ী হয়। বিজয়ী ছয়জন শপথ গ্রহণ করে সংসদে অংশ নিলেও দলের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে শপথ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। কেন এই সিদ্ধান্ত– জানা যায় না। আরও জানা যায় না, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ২৮ অক্টোবর, ২০২৩ বিএনপির মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর কেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার নেপথ্য কারণ জানতে চেয়ে সজোর দাবি জানালেন না! সেদিন মহাসমাবেশ পণ্ড হবার পর বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের আচরণ যথাযথ বিরোধীদলীয় নেতৃত্বের মতো ছিল কিনা– এই প্রশ্নের উত্তর তাদের অবশ্যই খুঁজে দেখতে হবে। পল্টনের পাশেই প্রেস ক্লাব, অন্তত সেখানে পৌঁছে পল্টনে যা হয়েছে, সে সম্পর্কে জাতিকে অবগত করতে পারতেন নেতারা। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো ৭৭ বছর বয়স্ক বর্ষীয়ান নেতা দেড় বছর টানা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে কেন শেষ মুহূর্তে প্রধান বিচারপতির বাসায় হামলা করতে উদ্যত হবেন– এর কার্যকারণ নিয়ে প্রশ্ন করার মতো যুক্তিবোধ তাদের থাকতে হবে। ২৮ অক্টোবরের পর আমরা দেখি, বিএনপি প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার বিরতি দিয়ে অন্যান্য দিন হরতাল-অবরোধের ডাক দিতে থাকে। সেটিও ভিডিও বার্তায়, কোথাও নেতাকর্মীর জমায়েত দেখা যায় না। প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে একটি পর্যায়ে ব্যর্থ হলেও আরেকটি পরিকল্পনা কার্যকর হতে দেখা যায়। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির একটি পরিকল্পনা ব্যর্থ হবার পর তাদের হতোদ্যম মনে হয়েছে। দ্বিতীয় কোনো কার্যকর পরিকল্পনার দেখা মেলেনি। 

০৩.
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যে সম্পন্ন করার পর এবার স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ চাইবে নিজেদের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে ক্ষমতা কাঠামো আরও পোক্ত করার জন্য। বিএনপি এবার কী করবে? সেই একই কথা তারা বলবে? ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়। বিএনপির রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের কোনো নির্বাচনেই জনগণের মতের প্রতিফলন ঘটেনি। একতরফা, পাতানো, রাতের ভোট আর ডামি নির্বাচন নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। আসন্ন উপজেলা নির্বাচন নিয়ে তৃণমূল নেতাদের কোনো আগ্রহ তিনি দেখতে পাননি। যেখানে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনই তারা বয়কট করেছেন, সেখানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। [সমকাল, ৯.২.২৪]। দেশজুড়ে আনাচে-কানাচে নির্বাচন হয়ে যাবে, আর বিএনপির মাথাব্যথা থাকবে না– এত সরল চিন্তায় এত বড় একটি রাজনৈতিক দল পরিচালিত হতে থাকলে তার নেতৃত্বের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানোর কী উপায় ভাবছেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ? নাকি রাতের ভোট আর একতরফা ভোট– ইত্যাদি অভিযোগ তুলে তারা অপেক্ষা করবেন হাজার হাজার মাইল দূর থেকে কোনো ভিডিও বার্তার? বস্তুবাদী এই কঠিন জগতে আজ আর আসমানি ধ্বনিতে কাজ হয় না। নেতাকে কারাবরণ করতে হয়, কারাগার প্রকোষ্ঠে দিনের পর দিন অধিকার আদায়ে নিজেকে নিঃশেষ করতে হয়। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ পাকিস্তানের ইমরান খান। তাঁর দেশের জনগণ নেতার নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছে ভোটের মধ্য দিয়ে। রাজনীতিতে কৌশল সবচেয়ে বড় অস্ত্র। একটি কৌশলে হেরে যাওয়া মানে সব শেষ হওয়া নয়; তাকে সেখান থেকে দুর্বলতাগুলো বুঝে নিতে হবে। নিজের দুর্বলতা বোঝে তারাই, যারা বিজয়ী হয়।

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল ও সাহিত্যিক
mahbubaziz01@gmail.com 

আরও পড়ুন

×