ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

সেই বুদ্ধিজীবীরা কোথায় গেলেন?

সমাজ

সেই বুদ্ধিজীবীরা কোথায় গেলেন?

.

আবু তাহের খান 

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪ | ০০:১৭ | আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৪ | ১৬:৪৬

আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ এখন তোষামোদ, চাটুকারিতা ও লেজুড়বৃত্তিতে ছেয়ে গেছে। এখানে তোষামোদে যে যত এগিয়ে, স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তার অবস্থান তত বেশি দৃঢ় ও সংহত। তা দেখে অনেকে সেটিকেই রাষ্ট্র ও সমাজে বিষয়-বৈভব ও কর্তৃত্ব নিয়ে টিকে থাকার মোক্ষম কৌশল গণ্য করছেন। এর ফল দাঁড়িয়েছে এই– মেধা, জ্ঞান, শিক্ষা, দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের ব্যাপারে মানুষের সহজাত চেতনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। 

তোষামোদ ও লেজুড়বৃত্তির স্বভাব উদ্দেশ্যমূলক, সহজাত নয়; সব সমাজের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই সমভাবে বিরাজমান ও কার্যকর নয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাসক বা উচ্চতর শ্রেণি ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চারপাশে উচ্ছিষ্টভোগী ও অনুগত শ্রেণি সৃষ্টি করতে চায়। ঔপনিবেশিক আমলে ভিনদেশি শাসকরা ভারতবর্ষ শাসনের উপায় হিসেবে এ কৌশলের আশ্রয় নিয়ে যথেষ্ট সফল হয়েছিল। তা দেখে বিষয়টি স্থানীয় সমাজপতিদের মনেও বেশ ভালোভাবে গেঁথে গিয়েছিল। ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর ওই সামরিক ও বেসামরিক সমাজপতিরা যখন দেশ শাসনের সুযোগ পান, তখন তারাও একটি অনুগত চাটুকার শ্রেণি গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করেন। সেই ব্যবস্থাও কোনোভাবে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের চেয়ে কম শোষণমূলক ছিল না।

পাকিস্তান আমলের নয়া ঔপনিবেশিক শাসনকাল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ধারণা করা হয়েছিল, পূর্ববর্তী দুই শোষণকালের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অতিক্রম করে এবার হয়তো তোষামোদ ও লেজুড়বৃত্তিক সংস্কৃতির অবসান ঘটবে। কিন্তু তেমনটি দূরের কথা; যে কোনো ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ এখন অতীতের ঔপনিবেশিক ও নয়া ঔপনিবেশিক কালের চেয়েও করুণ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রাম ও ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত দেশের মানুষকে যে এ রকম অনাকাঙ্ক্ষিত সমাজ ব্যবস্থায় এসে পড়তে হলো, সে ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাও নেহাত কম নয়।

বুদ্ধিজীবীদের কাজ হচ্ছে গভীরতর জ্ঞান, মেধা ও দার্শনিক চিন্তা দ্বারা সমাজকে অগ্রসরমানতার পথে এগিয়ে যেতে প্রভাবিত করা। সমাজ ও রাষ্ট্র কখনও দুরবস্থা বা সংকটে পড়লে বুদ্ধিজীবীদের কাজ হচ্ছে সঠিক পথ খুঁজে পেতে সহযোগিতা করা। কিন্তু বাংলাদেশের হাতেগোনা কিছু ব্যক্তি ছাড়া বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই এখন অন্ধ রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা বিভাজিত। তাদের এ ধরনের সংশ্লিষ্টতা একনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মীর বৈশিষ্ট্য হতে পারে; কিন্তু একজন বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা কিছুতেই নয়। কেউ কেউ আসলে বুদ্ধিজীবীই নন; বড়জোর রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত পেশাজীবী। তাদের কণ্ঠ অনেকটাই সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রের তোষামোদি চরিত্রগুলোর সঙ্গে মিলে যায়। 

বাংলাদেশে পেশাজীবীদের বিভাজনকে আপাতদৃষ্টে রাজনৈতিক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি স্বার্থের বিভাজন। এই পেশাজীবীরা নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলে সুবিধাজনক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সখ্যই শুধু গড়ে তোলেননি; দলগুলোর প্রতি শর্তহীন আনুগত্যও যুক্ত করেছেন। আনুগত্যের বিনিময়ে ক্ষমতাসীনদের কাছে তাদের মূল প্রত্যাশা হচ্ছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের অধিষ্ঠান। এর বাইরে প্লট, পুরস্কার, বিদেশ ভ্রমণ তো আছেই। এসব করার মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও পৌঁছে গেছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু খোদ রাষ্ট্রব্যবস্থার বুদ্ধিবৃত্তিক মানও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। সত্য এটাই, একটি জ্ঞানভিত্তিক, মানসম্পন্ন রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধিজীবী শ্রেণির অগ্রসর ভূমিকার বিকল্প নেই। সে ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীদের যে কোনো প্রকার তোষামোদ, চাটুকারিতা ও লেজুড়বৃত্তির ঊর্ধ্বে থেকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদের হতে হবে সেই বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, যাদের প্রয়োজনের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন (লেনিন এখনও কেন জীবন্ত, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সমকাল, ২০ জানুয়ারি ২০২৪)।

লেজুড়বৃত্তিমুক্ত বুদ্ধিজীবীরা এ দেশে নিকট অতীতেও দাপটের সঙ্গে ছিলেন। বিশ শতকের প্রথমভাগে আমরা পেয়েছি ‘শিখা গোষ্ঠী’। এর কেন্দ্রে ছিলেন আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ। তাদের চিন্তার মূলমন্ত্র ছিল– ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। ১৯৪৮ সালে রেসকোর্স ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষা-সংক্রান্ত বক্তৃতার বিরোধিতা থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ষাটের দশকে ‘দ্বি-অর্থনৈতিক তত্ত্ব’ দিয়েছিলেন বুদ্ধিজীবীরাই। এ দেশে একসময় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মুনীর চৌধুরী, সিকান্‌দার আবু জাফর, আবুল ফজল, আহমদ শরীফ, সুফিয়া কামাল, শওকত ওসমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, সরদার ফজলুল করিম, আনিসুজ্জামান, আহমদ ছফার মতো উচ্চশির বুদ্ধিজীবী ছিলেন। এখনও আছেন বদরুদ্দীন উমর বা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। কিন্তু এক নিঃশ্বাসে বলার মতো ১০টি নাম কোথায়?

স্বাধীনতার পরও রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা প্রায় দু’দশক কমবেশি অব্যাহত ছিল। কিন্তু ১৯৯০ সালে ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা’ চালুর পর থেকেই যেন বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে চরম অধঃপতনের ধারা সূচিত হয়। 

শিখা গোষ্ঠী থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবীরা আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বুদ্ধিজীবীরা শোষণহীন ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সেই মশাল এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো বুদ্ধিজীবী শ্রেণি আজ কোথায়? কারা সংকীর্ণ স্বার্থতাড়িত চাটুকারিতা ছেড়ে দেশ ও দশের পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তবুদ্ধির পক্ষে দাঁড়িয়ে মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে অনুপ্রাণিত করবেন?

আবু তাহের খান: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন

×