ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি ও ইউরোপের প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতা

অভিবাসী

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি ও ইউরোপের প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতা

.

এমিলি ওরেইলি

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪ | ২৩:৫৪ | আপডেট: ০২ মার্চ ২০২৪ | ০৭:২৭

ভূমধ্যসাগরে গ্রীষ্মের এক রাতেই যখন ৬০০ লোক মারা যায়, তখন এ প্রশ্ন উঠতেই পারে– ‘এটা কীভাবে ঘটল?’ বিশেষ করে ডুবে যাওয়া এসব মানুষ কীভাবে ওখানে এলো, তা কারও অজানা ছিল না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি এজেন্সি, ইইউর দুটি দেশের নৌ কর্তৃপক্ষ, সিভিল সোসাইটি অ্যাক্টিভিস্ট এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন বহু জাহাজ ও নৌকা অতীতে বহুবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। সবাই যখন চোখের সামনে লোকদের ডুবে যেতে দেখেছে, তখন কি এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি মেনে নেওয়া যায়?

২০২৩ সালের জুনে আদ্রিয়ানা নামে একটি মাছ ধরার নৌকা উপচে পড়া যাত্রী নিয়ে ইতালি থেকে লিবিয়া যাচ্ছিল। আনুমানিক ৭৫০ জন যাত্রী নিয়ে নৌকাটি সাগরে ডুবে গিয়েছিল। এ ঘটনায় ইইউ বর্ডার ও কোস্টগার্ড এজেন্সি ফ্রন্টেক্সের দায় নিয়ে আমার অফিস অনুসন্ধান চালিয়েছে। আমাদের অনুসন্ধানের বিষয় ছিল, মানবাধিকারের সবচেয়ে মৌলিক দিক বেঁচে থাকার অধিকারের ব্যাপারে সাগরে আমাদের সীমানার পাহারা ও জীবন রক্ষায় নিয়োজিত লোকেরা কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন তা বের করা। কিন্তু এ অনুসন্ধানের ফল বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে বিশাল ফারাক তুলে ধরেছে।  
২০২০ সালে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লিয়েন বলেছিলেন, ‘সাগরে জীবন রক্ষা করা ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়।’ তবে ইইউ ও সদস্য রাষ্ট্রগুলো যে ধরনের নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে এ কথার মর্ম খুঁজে পাওয়া কঠিন। দাবি করা হয়, কারও দ্বারা উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা এ ধরনের অভিবাসনকে উৎসাহ জোগায়। মানব পাচারকারী, যারা ওই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের শোষণ করে– এসব সুযোগের জন্য বসে থাকে। 

আমরা দেখেছি, আদ্রিয়ানা ডুবে যাওয়ার সময় সেখানে আগেভাগে ইইউর কোনো অনুসন্ধান-উদ্ধারকারী অভিযান সক্রিয় ছিল না। ইতালি ও ইইউর যৌথ উদ্ধার কার্যক্রম ‘মেয়ার নসট্রাম’ বন্ধ রাখা হয়েছিল। 

ইইউর বর্ডার ও ‘কোস্টগার্ড’ এজেন্সি বলে পরিচিত সবচেয়ে বড় ও সমর্থ এজেন্সি ফ্রন্টেক্স। কিন্তু এর কার্যক্রম নিছক ‘অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে’ সীমাবদ্ধ। সাগরে সংঘটিত ঘটনাবলিতে হস্তক্ষেপ করা, বিশেষ প্রেক্ষাপটে উদ্ধারকাজে নেমে পড়া ও কারও জীবন রক্ষার ক্ষমতা প্রাথমিকভাবে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত।
ফ্রন্টেক্স ভালো করেই জানে, অতীতে এসব দেশের হাতে ইউরোপমুখী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৌলিক মানবাধিকার কতটা লঙ্ঘিত হয়েছে। কিন্তু তারা বলেছে, এ ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করার ক্ষেত্রেও তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উল্লেখ্য, গ্রিসের কোস্টগার্ড এক দল অভিবাসনপ্রত্যাশীকে ফিরে যেতে বাধ্য করে এবং এ নিয়ে ইইউর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পরই ফ্রন্টেক্সের পরিচালক পদত্যাগ করেছিলেন। আদ্রিয়ানার শোকাবহ ঘটনাটি ঘটেছিল তার পরই। 

এক বছরেরও কম সময় আগে মানবাধিকারবিষয়ক ইউরোপীয় আদালত আদ্রিয়ানা ট্র্যাজেডির মতো আরেকটি প্রাণহানিমূলক নৌকাডুবির ঘটনায় গ্রিসের ভূমিকার প্রমাণ পায়। তবুও ফ্রন্টেক্স এখন পর্যন্ত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে গ্রিস থেকে তাদের আইনি এখতিয়ার প্রয়োগ করে নিজেদের প্রত্যাহার করেনি। আমরা বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপের সঙ্গে তা জনসমক্ষে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছি। আমাদের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, গ্রিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের অভাবে আদ্রিয়ানাকে দেখতে পাওয়া এবং তা ডুবে যাওয়ার মাঝের সময়টায় ফ্রন্টেক্সকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। বর্তমান ব্যবস্থায় এজেন্সি আদতে সমন্বয়কারী জাতীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ও আদেশ মানতে আইনিভাবে বাধ্য। 

আমার অফিসের তদন্তাধীন নথি অনুযায়ী, পোল্যান্ডের ওয়ারশভিত্তিক সংস্থা থেকে গ্রিসের উদ্ধারকারী কেন্দ্রে বারবার পাঠানো সহায়তা প্রস্তাব নীরবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ফ্রন্টেক্সের একটি ড্রোন আদ্রিয়ানাকে সহায়তার প্রস্তাব দিলে গ্রিক কর্তৃপক্ষ তা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়। শেষমেশ যখন আদ্রিয়ানার দিকে যেতে ফ্রন্টেক্সকে অনুমতি দেওয়া হলো, ইতোমধ্যে নৌকা ডুবে কয়েকশ লোক মারা যায়। 

প্রাথমিকভাবে আদ্রিয়ানা ‘তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে’ ছিল না– এ যুক্তিতে ফ্রন্টেক্স বিপৎসংকেত জারির মতো স্বায়ত্তশাসনসূত্রে প্রাপ্ত নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চায়নি। এজেন্সি আইনানুগ নির্দেশ ও প্রক্রিয়া অনুসারে কাজ করেছে। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জীবন বাঁচাতে ইইউর দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় নিয়মগুলো পুরোপুরি কাজে আসে না। অথচ তারা বারবার বলছে, জীবন বাঁচানোকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অগ্রাধিকার দিচ্ছে।  

অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে ফ্রন্টেক্সকে নিজের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার এখতিয়ার দিতে এবং ইইউ ও সদস্যরাষ্ট্রের দায়িত্বে ভারসাম্য রক্ষায় ইইউ পর্যায়ে আইনি পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ওই ট্র্যাজেডির পরপরই ইইউ সব ধরনের তথ্য খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছিল, যদিও কেউ এ ব্যাপারে একটি পদক্ষেপও নেয়নি। 
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমধ্যসাগরে অসংখ্য মৃত্যুর ঘটনা মাথায় রেখে আমি ইইউকে তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠনের আহ্বান জানাচ্ছি, যে এই মানবিক সংকটের পেছনের কারণগুলো খতিয়ে দেখবে।

এমিলি ওরেইলি, ইউরোপিয়ান ন্যায়পাল (অম্বুডসম্যান); 
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত

আরও পড়ুন

×