ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

পশ্চিমারা কি পুতিনের বার্তা বুঝতে পারছে?

আন্তর্জাতিক

পশ্চিমারা কি পুতিনের বার্তা বুঝতে পারছে?

ছবি: এএফপি

এম কে ভদ্রকুমার

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৪ | ০৪:১১ | আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৪ | ০৯:৪৯

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বৃহস্পতিবার তাঁর স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে আবারও পারমাণবিক হামলার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পুতিনের এই হুমকি পশ্চিমাদের হালকাভাবে বিচারের ঝুঁকি আছে। তারা হয়তো ভাবছে– পুতিন ভয় দেখাচ্ছেন।

তাই প্রথমেই তিনটি বিষয় বোঝা দরকার। প্রথমত, পুতিন এতে কোনো রাখঢাক করেননি। তিনি আগাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়ার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে তিনি পারমাণবিক হাতিয়ার ব্যবহারে বাধ্য। এটি পুতিনের যুগান্তর ঘটানোর মতো ঘোষণা। দ্বিতীয়ত, পুতিন রাশিয়ান এলিটদের সেরা অংশের সামনে ফেডারেল অ্যাসেমব্লিতে ভাষণ দিচ্ছিলেন এবং গোটা জাতিকে এটি বোঝাতে চেয়েছেন– দেশ আত্মরক্ষায় হয়তো একটা পারমাণবিক যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য হতে পারে। তৃতীয়ত, এমন একটা দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছে যেখানে বোকা ও গোঁড়া মনোভাবাপন্ন পশ্চিমারা ইউক্রেন যুদ্ধে পরাজয় রোধে মরিয়া। রাশিয়ার অর্থনীতি ধ্বংস এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে ক্রেমলিনে সরকার পরিবর্তন করতে তারাই এ যুদ্ধ শুরু করেছিল। 

বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে কংগ্রেসের শুনানিতে মার্কিন সেক্রেটারি লয়েড অস্টিন বলেছেন, ইউক্রেন পরাজিত হলে ন্যাটো রাশিয়ার সঙ্গে লড়াই করবে। বস্তুত এ উক্তি বাইডেন প্রশাসন ইউরোপকে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়ে কোন পরিস্থিতিতে পড়েছে, তা-ই তুলে ধরে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ধাক্কার কারণে ইউরোপের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং শিল্প খাতে এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মোটকথা, লয়েড অস্টিন বোঝাতে চেয়েছেন, ইউক্রেন হারলে ন্যাটোকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে হবে। অন্যথায় বিশ্বে পশ্চিমা জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়বে। অর্থাৎ এটি মহাদেশীয় যুদ্ধের জন্য ইউরোপের প্রতি আহ্বান।

গত সপ্তাহে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁও ইউক্রেনে সৈন্য পাঠানোর সম্ভাবনার কথা বলে একই ইঙ্গিত দিয়েছেন। মাখোঁ প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউরোপের ২০টি দেশের সম্মেলনে কথা বলছিলেন। স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকোর বক্তব্য অনুসারে, ন্যাটো ও ইইউর বেশ কিছু সদস্য ইউক্রেনে সৈন্যবাহিনী পাঠাচ্ছে। 

এ মুহূর্তটি রাশিয়াকে একটা পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছে। দেশটি ইউক্রেনে পশ্চিমাদের পাঠানো অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র– যেখানে এখন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান যুক্ত হচ্ছে, মোকাবিলার কৌশল জেনে গেছে। ক্রিমিয়া বা রাশিয়ার ভূখণ্ডে যে কোনো আক্রমণ গুরুতর পরিণাম বয়ে আনবে– এমন হুঁশিয়ারি পশ্চিমারা অগ্রাহ্য করার পরও রাশিয়া চুপ থেকেছে; যুদ্ধকে রাশিয়ার ভূখণ্ডে ঠেলে দিতে ইঙ্গ-মার্কিন ষড়যন্ত্রও রাশিয়া এড়িয়ে গেছে। তাই মাখোঁর বক্তব্য ক্রেমলিনের জন্য দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি করেছে।

বৃহস্পতিবার পুতিনের বক্তব্যের প্রায় পুরোটা ছিল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়ার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চালু রাখা তথা দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানে ভবিষ্যৎমুখী ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় পূর্ণ। এর মধ্যেই পুতিন পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি সামনে এনে পুরো পশ্চিমা বিশ্বকে সতর্ক করে দিয়েছেন। পুতিন গুরুত্বের সঙ্গে বলেছেন, যুদ্ধের প্রচলিত রীতিনীতির লঙ্ঘন তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে দিক। যতক্ষণ তারা রাশিয়ার মাটিতে আক্রমণ করছে না কিংবা সরাসরি যুদ্ধে জড়িত হচ্ছে না, ততক্ষণ রাশিয়া প্রচলিত অস্ত্রের ব্যবহার চালিয়ে যাবে।

মোদ্দা কথা, পশ্চিমারা রাশিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করতে চাইলে তিনি তা মানবেন না। এর মানে বোঝা আদৌ কঠিন নয়। সহজ করে বললে, অত্যাধুনিক অস্ত্র ও স্যাটেলাইট সক্ষমতাসমৃদ্ধ ন্যাটোর সামরিক বাহিনী ব্যবহারের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের রাশিয়ার সীমানা পাল্টে দেওয়ার কোনো সুযোগ রাশিয়া দেবে না। পুতিন বেশ দৃঢ়ভাবেই বল পশ্চিমাদের কোর্টে ঠেলে দিয়ে তাদেরই বলছেন– বিকল্পটা তোমরাই বেছে নাও। অর্থাৎ পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নেবে কি, নেবে না– পশ্চিমারাই ঠিক করুক। এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার সামনে কোনো বিকল্প নেই।

যে পরিস্থিতিতে পুতিনের এ হুমকি এসেছে, তা বেশ চালাকির সঙ্গে হলেও তুলে ধরেছেন ন্যাটোর এক নেতা হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান। তিনি সম্প্রতি তুরস্কে শীর্ষ কূটনীতিকদের একটি ফোরামে ভাষণ দেওয়ার সময় জোর দিয়ে বলেন, ‘ইউক্রেনীয়দের পাশাপাশি ইউরোপীয়রাও যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে এবং এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই।’ তাঁর ভাষায়, ‘আমরা ইউরোপীয়রা একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আছি।’ ইউরোপীয় দেশগুলো ‘নিজেদের যুদ্ধ’ বলে ইউক্রেনকে যুদ্ধ এনেছে এবং অনেক দেরিতে তারা উপলব্ধি করছে। এতে ইউক্রেন সুবিধা করতে পারছে না। ‘সময় এখন রাশিয়ার পক্ষে। এ কারণে এখনই শত্রুতার অবসান ঘটানো প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘আপনারা যদি মনে করেন, এটি আপনাদের যুদ্ধ, তবে স্বীকার করুন– শত্রু আপনাদের চেয়েও শক্তিশালী এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। সে জন্যই আপনারা পরাজিতদের দলে এবং এ পরিস্থিতির উত্তরণ সহজ নয়। এখন ইউক্রেনবাসীসহ ইউরোপীয়রা যুদ্ধে হারছে এবং এখান থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। এটি খুবই গুরুতর এক সমস্যা।’

আসলে এটাই মূল কথা। এ অবস্থায় পশ্চিমা নেতৃত্ব ও জনমত যদি পুতিনের বার্তা বুঝতে অক্ষম হয়, তা তাদের জন্য এক প্রলয়ঙ্করী পরিণাম বয়ে আনবে। পুতিন বলেছেন, ন্যাটো ইউক্রেনে সেনা মোতায়েন করলে তা রাশিয়ার কাছে যুদ্ধে পশ্চিমাদের সরাসরি অংশগ্রহণ বলেই বিবেচিত হবে। এটা নিশ্চিত, যদি রাশিয়া ন্যাটো বাহিনীর হাতে ইউক্রেনে সামরিক পরাজয়ের ঝুঁকিতে পড়ে এবং দনবাস ও নভোরসিয়া অঞ্চল আবারও হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়, সেটি রাশিয়ার স্থিতিশীলতা ও অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। এতে ক্রেমলিনের নেতৃত্বের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে; সে জন্যই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে।

বিষয়টা পরিষ্কার করার স্বার্থে আরও বলা যায়, পুতিন রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতার হিসাবটাই জানিয়ে দিয়েছেন, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্রের দিক থেকে রাশিয়াই শ্রেষ্ঠ; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে রাশিয়াকে টেক্কা দিতে পারবে না। তিনি আরও কিছু গোপনীয় তথ্য তুলে ধরেছেন: ‘অন্য বেশ কয়েকটি নতুন অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং আমরা আমাদের গবেষক ও অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে এর চেয়েও বেশি কিছু শোনার প্রত্যাশা করি।’

এম কে ভদ্রকুমার: ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ইন্ডিয়ান পাঞ্চলাইন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×