বছর শেষে বিভিন্ন খাত পর্যালোচনায় শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যুর বিষয়টিও এসেছে। এ সংক্রান্ত বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন প্রকাশ পায় সোমবার সমকালে। তাদের হিসাবে, দেশে গত এক বছরে ১ হাজার ১৩০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে পানিতে ডোবা অন্যতম। বিষয়টি নিয়ে প্রায় প্রতি বছর আলোচনা হলেও পরিস্থিতি যে হতাশাজনক, এবারের চিত্রই তার প্রমাণ।

পানিতে ডুবে মৃত্যু নতুন না হলেও, গত বছরের চিত্রে নতুন যে বিষয়টি দেখা যাচ্ছে, সেটি আরও হতাশাজনক। সমকালের প্রতিবেদন বলছে, ২০২২ সালে পানিতে ডুবে ৯ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার বেড়েছে। গত বছর পানিতে ডুবে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, এর মধ্যে অধিকাংশেরই বয়স এর কম ছিল। এ বয়সীরা কেন পানিতে ডুবে বেশি মারা যাচ্ছে, তা অনুধাবন করা কঠিন নয়। ২০১৯ সালের বিবিসি বাংলায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়, যার শিরোনাম : রোগে-শোকে নয়, শিশুরা বেশি মরছে পানিতে, ডুবে মরার ৮ কারণ। ওই প্রতিবেদনে এক গবেষণার তথ্য উঠে এসেছে। যেখানে বলা হয়, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০টি শিশুর প্রাণহানি ঘটে পানিতে পড়ে। সেখানে উল্লেখ করা আটটি কারণের মধ্যে দেখতে পাই, বিশেষত গ্রামে বসতঘরের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের জলাশয় তথা পুকুর, নদী, ডোবা, খাল-বিল থাকার কারণে শিশুরা সেখানে পড়ে যায়। তাদের দেখভাল করা মানুষের অভাব হেতু সংকট বেশি।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ৬০ শতাংশ অঘটন ঘটে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে। কারণ এই সময়ে মায়েরা যেমন ব্যস্ত থাকেন, তেমনি বাবা বিভিন্ন কাজে বাড়ির বাইরে যান কিংবা ভাইবোন বা অন্যরা যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এসব কারণেই এ সময়টা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া আমরা দেখছি, দরিদ্র পরিবারেই এ ধরনের মৃত্যু বেশি হয়। তবে যে বিষয়ে উদাসীনতা ধনী-দরিদ্র সব পরিবারের জন্য সমান সেটি হলো, শিশুদের সাঁতার না জানা। ৫ বছরের কোনো শিশু যদি সাঁতার না পারে, তার দায় পরিবার এড়াতে পারে না। পানির দেশে সাঁতারের এত ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও একটি শিশু নির্দিষ্ট বয়স পর সাঁতার না-জানা থাকবে কেন? গ্রাম এলাকায় পুকুরে এবং শহরে প্রয়োজনে সুইমিং পুলে গিয়েও সাঁতার শেখা উচিত। দেশের সব নাগরিকের জীবন পরিচালনার অপরিহার্য দক্ষতা হিসেবে সাঁতারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সাঁতারের পাশাপাশি শিশু পানিতে পড়ে গেলে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা জ্ঞান থাকাও জরুরি। পানি থেকে উঠিয়ে তাকে উপুড় করে পানি বের করে হৃদযন্ত্র ও শ্বাস-প্রশ্বাস চালুর চেষ্টা শুরুতেই করা উচিত। ৫ বছরের নিচের শিশুদের প্রতি কাউকে না কাউকে নজর রাখতেই হবে। হাসপাতালে পানিতে পড়া কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে শুরুতেই কী করতে হবে, সে বিষয়ে সংশ্নিষ্টদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা চাই।

পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যু নীরব ঘাতকের মতো। শিশুদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু প্রতিরোধ করতেই হবে। পারিবারিক সচেতনতার মাধ্যমেই মূলত এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। অসহায় শিশু এমন কষ্টের ভেতর দিয়ে প্রাণ হারাবে, তা মেনে নেওয়া কঠিন। যে মা-বাবা তাঁর আদরের সন্তান হারান, তাঁদের জন্য এবং তাঁদের পরিবারের জন্য এমন মৃত্যু কতটা দুঃখের তা অনুধাবন করা কঠিন নয়। তা ছাড়া আমাদের ভবিষ্যৎ শিশুর এমন করুণ মৃত্যু জাতীয়ভাবেও ক্ষতি। কোনো দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে সেখানে হয়তো প্রবোধ দেওয়ার ভাষা আছে। কিন্তু যেখানে একটু সচেতনতাই এমন মৃত্যু ঠেকাতে পারে, সেখানে এত ব্যর্থতা কেন?
স্বস্তির বিষয় হলো, জাতীয়ভাবে আমরা 'পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস' পালন করছি। তবে পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের বিষয়টি শুধু দিবসের ফ্রেমে আবদ্ধ না রেখে প্রতিনিয়ত মা-বাবা, পরিবার যেন তাঁদের সন্তান দেখেশুনে রাখেন এবং বর্ষাকালসহ নাজুক পরিস্থিতিতে শিশুরা যাতে নিরাপদে থাকে, সে জন্য যেমন জনসচেতনতা দরকার; তেমনি সারাদেশে ৫ বছরের ওপরের সবার জন্য সাঁতার বাধ্যতামূলক করার ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।

মাহফুজুর রহমান মানিক :জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
mahfuz.manik@gmail.com