দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন উপায়ে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে আসতে না পারলেও এরই মধ্যে উপনির্বাচন ঘিরে রাজনীতি জমে উঠেছে।
সরকারবিরোধী চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর গোলাপবাগে ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যরা পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ঘোষণাটি কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয় ১১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে। সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মো. আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ, বগুড়া-৪ আসনের মো. মোশাররফ হোসেন, বগুড়া-৬ আসনের গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের জাহিদুর রহমান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার ভুঁইয়া এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। বিএনপির সংসদ সদস্যদের পদত্যাগের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা কার্যকরও হয়ে গেছে। শূন্য হওয়া আসনগুলোয় উপনির্বাচন হতে যাচ্ছে ১ ফেব্রুয়ারি।

বিএনপির সংসদ সদস্যদের পদত্যাগের ফলে সৃষ্ট শূন্য আসনে দ্রুত উপনির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে যত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গেল, এর আগে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাজী সেলিম কিংবা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিতে যেন ততটাই উদাসীনতা ছিল। যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে- আইন ও বিধি মেনেই সবকিছু করা হচ্ছে।
বিএনপির পদত্যাগের ফলে শূন্য আসনে নির্বাচনে ইতোমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তাতে বগুড়া-৬ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী রাদিবুল হাসান রিপু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে মু. জিয়াউর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে মো. আব্দুল ওদুদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের ওয়ার্কার্স পাটির প্রার্থী এবং বগুড়া-৪ আসনে ১৪ দলীয় জোটের অপর দল জাসদের (ইনু) প্রার্থীর জন্য বরাদ্দ রাখা হলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
লক্ষণীয়- বিএনপির সংসদ সদস্য হিসেবে পদত্যাগ করলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার ভুঁঁইয়া আবারও সংসদ সদস্য হতে আগ্রহী হয়ে মনোনয়নপত্র তুলেছেন। এবার তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন। এর আগে অবশ্য তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি ইতোমধ্যে তাঁকে বহিস্কারও করেছে। উপজেলা বিএনপি উকিল আবদুস সাত্তার ও তাঁর ছেলে মাইনুল হাসানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।

উকিল আবদুস সাত্তার কুমিল্লা জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন দীর্ঘ ২৮ বছর। বিএনপির দলীয় নির্দেশনা মেনে আন্দোলন-সংগ্রামের অংশ হিসেবে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে আবার কেন তিনিই নির্বাচনে আগ্রহী হয়ে উঠলেন- এটাই প্রশ্ন। দ্রুত উপনির্বাচনে অবশিষ্ট আসনে প্রার্থী বাছাই করলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি কি উকিল আবদুস সাত্তারের সঙ্গে কোনো 'সমঝোতা' থেকে? সন্দেহ তৈরি হতে পারে বৈকি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি বিএনপির ঘাঁটি বলেই পরিচিত গত তিন দশকের ইতিহাসে। সেখানে উকিল সাত্তার ভুঁইয়ার ব্যক্তিগত ইমেজ তাঁকে বারবার জয়ী হওয়ার পেছনে কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা পরিস্কার হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকালে। ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত ওই আসন থেকে চারদলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন মহাসচিব মুফতি ফজলুল হক আমিনীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। ফজলুল হক আমিনী জয়লাভ করেছিলেন। দেখা যাচ্ছে, আসনটিতে ব্যক্তির চেয়ে দলীয় প্রতীক প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
সমকালে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, উকিল সাত্তার দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিকভাবে অসুস্থতার কারণে নির্বাচনী এলাকায় যেতেন না। তাঁর পক্ষে ছেলে এলাকায় লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। গত বছরতিনেক ধরে এই আসন ঘিরে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা জনসংযোগ চালাচ্ছেন। আগামী নির্বাচনে তিনি এখানে দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন- এমন গুঞ্জন রয়েছে। আবার উকিল সাত্তার নিশ্চয়তা চাচ্ছেন- তিনি বয়সের কারণে রাজনীতি থেকে অবসরে গেলে তাঁর সন্তান যাতে এই আসনে নির্বাচন করতে পারেন। তাঁর ছেলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের 'সুসম্পর্ক' নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্বাভাবিকভাবেই ফুরফুরে মেজাজে থাকার কথা। বিএনপির সাত সংসদ সদস্য পদত্যাগের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা বলে আসছিলেন- বিএনপি সংসদ থেকে চলে গেলে সংসদ অচল হয়ে যাবে না। সেখানে বিএনপির পদত্যাগী একজনকে আবার সংসদে ফিরিয়ে আনার ঘটনা দলটিকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে। তবে এই প্রশ্নের উত্তরও তখন আওয়ামী লীগকে দিতে হবে- এভাবে কৌশলের নির্বাচন দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র কতটা অর্থবহ হবে?

বিএনপিকেও আত্মজিজ্ঞাসা করতে হবে- তাঁদের একজন প্রবীণ নেতা এবং দলীয় মনোনয়নে বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া ব্যক্তি যদি এভাবে ব্যক্তিস্বার্থে দলের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেন, তাহলে সামনের দিনগুলোতে দলটি ভরসা করবে কাদের ওপর?
এহ্‌সান মাহমুদ :সহসম্পাদক, সমকাল