বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের বিভাজন রয়েছে। এই বিভাজনটি আরও প্রকট হয়ে সামনে আসে নির্বাচন সামনে এলে। নির্বাচনের আগে অনেক কিছুই এখানে হবে। অনেক কিছুই ঘটবে। এগুলো নিয়ে চিন্তার কিছু দেখছি না। আমাদের রাজনীতিতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, মারমুখী অবস্থান স্বাভাবিক। বিদেশিরা আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নানা মন্তব্য করে। আমাদের দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের বিভাজনের কারণে তারা এ সুযোগটা পায়। কিন্তু বিদেশিরা নিজেদের স্বার্থ বেশি দেখে। তাদের নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য যদি ঠিক থাকে, তাহলে তারাও চুপ হয়ে থাকবে। তারা নিজেদের স্বার্থ ঠিক রেখে সম্পর্ক তৈরি করে। একটি দেশ যখন কথা বলবে, অন্য দেশ কেন মেনে নেবে? স্বাভাবিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র যখন বাংলাদেশের ইস্যুতে বক্তব্য দিচ্ছে; রাশিয়াও পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছে। কারণ, পৃথিবী আর আগের মতো নেই। এগুলো নতুন কিছু নয়। তবে দেশের অর্থনীতি, অর্থনীতির কাঠামো যদি ভালো হয়, বিদেশিরা এমন সুযোগ নিতে পারবে না।

এর মাঝে আমরা দেখলাম, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ঢাকায় এক বাসায় গেলেন মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রশ্নে 'মায়ের ডাক' নামে এক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে উপস্থিত হলো 'মায়ের কান্না' নামে আরেক সংগঠন। তারাও মানবাধিকার ইস্যুতে রাষ্ট্রদূতের কাছে স্মারকলিপি দিতে চাইল। 'মায়ের ডাক' আর 'মায়ের কান্না' আমাদের বিভাজিত রাজনীতিরই ধারক। সেটি ১৪ ডিসেম্বরের ঘটনা; ১৯৭১ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে যে দিনটি পালিত হয়। এমন দিনে 'মায়ের ডাক'-এর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত দেশের বিভাজনের রাজনীতিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছেন। ওই দিন যে ঘটনা ঘটেছে পিটার হাসকে নিয়ে, তার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে ঢুকে গেলেন। এ জন্য এমন একটি দিন বেছে নেওয়া হলো, যেদিন- ১৯৭১ সালে দেশের শত শত বুদ্ধিজীবীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ওই দিনে ও রকম একটা বাসায় যাওয়া। রাষ্ট্রদূত তো তাদের দূতাবাসেই ডাকতে পারতেন, যদি সত্যিই তিনি তাদের ইস্যুগুলো জানতে চাইতেন। তা না করে বাসায় গিয়ে আলোচনা করলেন। আবার সে জন্য ওই দিনটিকেই বেছে নিলেন! কেন নিলেন, তাও বোঝা গেল না। তাতে অন্য সংগঠনটি- যারা মনে করে, দেশে অন্য সরকারের আমলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক ঘটনা আছে, যে ব্যাপারে আমেরিকা নিশ্চুপ; তারা এই সুযোগটা নিল।
না-ও নিতে পারত। পরদিন তারা দূতাবাসে গিয়ে এটা করতে পারত।
এতে বোঝা গেল, পিটার হাস সরাসরি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঢোকার একটা চেষ্টা করলেন। এতে বিভাজনের রাজনীতি নতুন মাত্রা পেল। তাতে গণতন্ত্রের ভিত কতটা মজবুত হলো বা যে গণতান্ত্রিক চর্চার কথা বলা হয়, তার কতটা লাভ হলো, তা ভাবতে হবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া যে কথা বলেছে সে সম্পর্কে বলা যায়- এই বিশ্বায়নের যুগে রাশিয়াও শক্তিশালী একটা পক্ষ। তারা তো আর চোখ-কান বন্ধ করে থাকতে পারে না। তারা বলে দিল, এ বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন আছে- কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। তাদের ভাষ্য, যা পশ্চিমা বিশ্ব গণতন্ত্র রক্ষার নামে করছে, তা কতখানি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করছে; কতখানি মানবাধিকারের জন্য বা কতটা তাদের দেশের স্বার্থে- এটি ভাবতে হবে। তারা যদি সত্যিই মানবাধিকার নিয়ে চিন্তা করত, তাহলে তো আফগানিস্তানের ঘটনা ঘটার কথা নয়; সিরিয়া বা ইয়েমেনে যুদ্ধ হওয়ার কথা নয়। রাশিয়া যেহেতু নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য, তাই তারা তাদের অবস্থান পরিস্কার করল। কারণ চুপ থাকলে তো এই মেসেজও যায়- পশ্চিমারা যা করছে, তা হয়তো সঠিক, যা বিদ্যমান বিশ্ব বাস্তবতায় রাশিয়া হতে দিতে পারে না।

আসলে পশ্চিমা দেশ বা কোনো একটা দেশের ওপর যে নির্ভরতা, যা আমাদের দেশে সাধারণত বিরোধী দলে থাকলে থাকে; তার সুযোগটাই নিয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। মার্কিন রাষ্ট্রদূত যে 'মায়ের ডাক'-এর সঙ্গে দেখা করতে নাখালপাড়া গেলেন, কেউ না কেউ নিশ্চয় তাদের সেখানে যেতে বলেছে। আমাদের দেশের রাজনীতির বিভাজন যতদিন থাকবে, ততদিন এসব বিষয় থাকবে। কিন্তু এতে গণতন্ত্রের কী লাভ হবে, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

একবার আমরা একটি জরিপে জানতে চেয়েছিলাম, গণতন্ত্র বলতে তাঁরা আসলে কী বোঝেন? এতে দেখা গেছে, দেশের ৫২ শতাংশের মতো লোক মনে করেন- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের নিশ্চয়তাকে তাঁরা গণতন্ত্র বলতে চাইছেন। বিপরীতে মাত্র ১৮-১৯ শতাংশ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসকের পরিবর্তনকে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে বোঝেন। তাই পশ্চিমা ধারণার গণতন্ত্র এখানে জনমনে কীভাবে কাজ করছে, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে বলে মনে করি।

এখন বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিবৃতি দিচ্ছে। পাল্টা দিল রাশিয়া। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে বাংলাদেশের নির্বাচনের সময় এমনটি না হওয়াই বরং অস্বাভাবিক। আগে আরও বেশি হতো। চায়ের দাওয়াত, ডিনার। আজ এক রাষ্ট্রদূতের বাসায় তো কাল এক নেতার বাসায়। মিডিয়া ছুটে যেত। নির্বাচন ঘিরে এমন হয়। এখন হয়তো বিবৃতি দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। সরকারও এখন সচেতন। তবে কূটনীতিকরা এমনিতেই বিবৃতি দিচ্ছেন, তা মনে করি না। তাঁদের প্ল্যাটফর্ম দেওয়া হচ্ছে। অনেক লবি কাজ করে এসব ক্ষেত্রে। বর্তমান বিশ্বে বহুমুখী শক্তির উত্থান ঘটছে। এ কারণে আমেরিকা ভালো করে জানে, তার একতরফা খবরদারি খাটবে না। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ীই সরকার নানান ব্যবস্থা নিতে পারে। সরকারের পররাষ্ট্র বিভাগ যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে কিন্তু কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ কিছুটা কমেছে। যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের বিদেশিদের এমন আচরণ মেনে নেওয়ার কথা নয়।

একটি বিষয়ে পরিস্কার থাকতে হবে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা বিদেশিরা ঠিক করে দিয়েছে- এমন নজির নেই। যেটুকু গণতন্ত্র আমরা পেয়েছি, তা এখানকার মানুষের লড়াই-সংগ্রামের ফল। ভাষা আন্দোলন থেকে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এ দেশের মানুষের আন্দোলনের ফল। যাঁরা রাজনীতি করছেন, তাঁদের উচিত জনগণের ওপর ভরসা রাখা। জনগণের ওপর বিনিয়োগ করুন। নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হলে অনেক কিছুর পরিবর্তন দরকার। এটি নিয়ে তো দেশের মানুষকেই কথা বলতে হবে। এখানে নির্বাচন মানেই টাকার খেলা। টাকার প্রবাহ বন্ধ হলে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে।

ইমতিয়াজ আহমেদ :পরিচালক, সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ এবং অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়