আমার অত্যন্ত প্রিয় বন্ধুকে ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যার চেষ্টা করতে দেখার পর থেকে আত্মহত্যা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আরও একজন প্রতিভাবান লেখক ফেসবুকে আত্মহত্যার ঘোষণা দিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলেন এই কয়েক দিন আগে। এরই মধ্যে বাবার বকা খেয়ে অভিমানে আত্মহত্যা করল আমার এক ভাইপো। একা থাকতেই পছন্দ করত ছেলেটা। জানুয়ারি মাসে আত্মহত্যা করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী অনিক চাকমা। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার আগে একটি চিরকুটে লিখে গেছে- 'আমি যদি বন্ধুদের সঙ্গে ভালোভাবে মিশতে পারতাম, তাহলে এটা হতো না। এখন আমি অধঃপতিত হলাম। আমি আপনাদের কাছে একদম ক্ষমার অযোগ্য, তবুও সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।' আত্মহত্যার প্রবণতা কি কেবলই সঙ্গহীনতা, একাকিত্ব, ব্যক্তিগত বিষণ্ণতা আর হতাশা থেকে জন্ম নেয়? নাকি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট একজন মানুষের বেঁচে থাকার আকর্ষণ ধ্বংস করে দেয় বলেই সে হয়ে ওঠে আত্মহত্যাপ্রবণ?

সব সময় প্রথম স্থান অধিকার করা হলি ক্রস স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী পারমিতা ফাইহা দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় গণিত, উচ্চতর গণিত আর জীববিজ্ঞানে ফেল করার কারণে আত্মহত্যা করেছে আগস্টে। পত্রিকা মারফত জানা যায়, তাদের বন্ধু অনেকেই ফেল করেছিল উচ্চতর গণিতে। এই অভিভাবক সবাই মনে করেন, শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়ার কারণেই এ রকম ফেল করানো হয়। হলি ক্রসের ফেল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল- ফেল করাদের মা-বাবাকে ডেকে এনে অপমান করা হচ্ছে! স্কুলে শিক্ষকদের কাছে অপমানিত হয়ে মা-বাবা পারমিতাকেও হয়তো বকা দিত, যেমনটা সাধারণভাবে করে থাকেন বাংলাদেশের অভিভাবকরা। বন্ধুরা ওকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'এখন বাসা কীভাবে ম্যানেজ করবি?' পারমিতা বলেছিল, 'দেখিস, কীভাবে করি।' এর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১০ তলার ছাদ থেকে স্কুল ড্রেস পরা অবস্থায় পারমিতার লাফিয়ে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে।

গত বছর আত্মহত্যা করেছে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা সাদাত মাহমুদ। করোনা মহামারির সময় টিউশন ফি ৫০ শতাংশ মওকুফ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগ ওঠে এবং আরও দুই শিক্ষার্থীসহ তাকে বহিস্কার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এ ঘটনার কিছুদিন আগেই বেইলি রোডের দেয়ালে ধর্ষণবিরোধী গ্রাফিতি আঁকার সময় ছাত্র ইউনিয়নের আরও দুই নেতাসহ সাদাতকে গ্রেপ্তার করেছিল রমনা থানা পুলিশ। ইউল্যাব থেকে বহিস্কার হওয়ার পর সে আর অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। শিক্ষালয়, সমাজ, রাষ্ট্র কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি। পরিবারও নিশ্চয় তার প্রতিবাদী মনোভাবকে প্রশ্রয় দেয়নি। এতটা মানসিক চাপ সে হয়তো নিতে পারেনি। জীবনের প্রতি সব আগ্রহই সে হারিয়ে ফেলেছিল।

বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপ অনুসারে গত বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে আত্মহত্যা করেছে ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ৫০ জন। ৯৪ জন স্কুলের শিক্ষার্থী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশে প্রতি বছর গড়ে ১৩ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে এবং করোনা মহামারি-পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। অনেকেই পুলিশের ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে আত্মহত্যা করার কথা জানায়!

আত্মহত্যার ঘটনা বিশ্বব্যাপী। উনিশ শতকের ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন, প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে এক থেকে তিনজন আত্মহত্যা করে। আজকে এ রকম গবেষণা হলে দেখা যেত যে, ডুরখেইমের হিসাবের চেয়ে বাংলাদেশে চার গুণ মানুষ আত্মহত্যা করে। আর এ দেশে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে আত্মঘাতী প্রবণতা ভয়ানক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেন এমন হচ্ছে? মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হতাশা থেকেই জন্ম নেয় আত্মহত্যার প্রবণতা। কভিডকালে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) গবেষণায় উঠে এসেছে, এ দেশের ৪৬ শতাংশ মানুষ বিষণ্ণ আর ৩৩ শতাংশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হলে মানুষ হতাশা বোধ করে।

একদিকে আলগা হয়ে পড়া সমাজ কাঠামো, আরেক দিকে একমাত্র অর্থনৈতিক মানদণ্ডে মানুষের সাফল্য ও মর্যাদা নির্ধারণের অমানবিক ব্যবস্থার বিকাশ। ধনতান্ত্রিক এই ব্যবস্থায় প্রত্যেকে একা একা বড় হতে চায়। ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজন সবাই সবার প্রতিযোগী! প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া সবাই ছোট হতে থাকে, হতাশ হতে থাকে। আফসোসে আবর্তিত হয়! অর্থ-সম্পদ ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ মানুষে মানুষে দেয়াল তৈরি করে। এতে বৃদ্ধি পেতে থাকে মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা। পরিবার, সমাজ, শিক্ষালয়, কর্মক্ষেত্র, বাজার, রাষ্ট্র- প্রতিটি ক্ষেত্রই হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্ন মানুষের বিচরণক্ষেত্র। যে সেরা নয়, যে ব্যর্থ; সে সামাজিক উপেক্ষার শিকার। ফলে সে একা ও বিষণ্ণ। পরীক্ষায় ২ নম্বর কম পেলেই সমাজে আর তার জায়গা হয় না। পরিবারে তার আদর কমে যায়। নম্বর কম পাওয়া কিংবা লটারিতে নাম না ওঠায় 'ভালো' স্কুলে ভর্তি না হতে পারার কারণে শিক্ষার্থী যতটা না, তার চেয়ে বেশি আফসোসের অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকেন অভিভাবকরা।

বড়ই পরিতাপের বিষয়, শ্রেষ্ঠ হওয়ার পথকেই মানুষ আনন্দে বাঁচার একমাত্র পথ ধরে নিয়েছে। অথচ জগতে জীবন বৈচিত্র্যময়। শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রতিযোগিতার বাইরেও জীবনের বহু ক্ষেত্র আনন্দের আকর্ষণে ভরপুর। জীবনের বিচিত্র রূপের প্রতি সংবেদনশীলতা তৈরি হলে মানুষ মানুষের পাশেই থাকবে। মানুষে মানুষে সম্মিলনেই ফুটে ওঠে জীবনের সৌন্দর্য। অন্তত নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই বোধ বিকশিত করার ব্যবস্থা রাষ্ট্রে থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চয় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

নূরুননবী শান্ত: কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক