গণতন্ত্র চাই, কিন্তু আসবে কি? আমাদের নিজেদের কথা থাক, ও-প্রসঙ্গ ওঠাতে গেলে গভীর দুঃখ উথলে ওঠে, অন্য দেশের কথাটাই ভাবতে হয়। ভারতে নির্বাচনে যে গেরুয়াধারী রামভক্তরা ক্ষমতায় এসেছেন তাঁদের ভাবসাব কিন্তু মোটেই গণতন্ত্রীদের মতো নয়। সেখানে আবারও নির্বাচন হবে, তাতে বুর্জোয়া দলগুলো যে রামভক্তদের হটিয়ে সর্বভারতীয় রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নিতে পারবে- এমন ভরসা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। বামপন্থিরা মোটামুটি ছত্রভঙ্গ দশাতে রয়েছেন। বড় রকমের পরিবর্তন প্রত্যাশা করা মোটেই ন্যায়সংগত নয়।
থাইল্যান্ডে যে নির্বাচন হয় না তা নয়, মাঝে মাঝেই হয়ে থাকে, কিন্তু দেখা যায় যারাই জিতুক, ঘুরেফিরে সেনাবাহিনীর কর্তারাই ক্ষমতায় আসা-যাওয়া করছে। কিন্তু ঘটেছে ভিন্ন রকমের ঘটনাও। ছাত্ররা নেমে পড়েছিল রাস্তায়। ছাত্ররা আগেও একবার প্রবলভাবে নেমেছিল। সেই বিক্ষোভ দমন করেই সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসে। থাইল্যান্ডে যে বিক্ষোভ কার্যকর হয়নি, সেটা অন্যত্রও সত্য, বিশ্বব্যাপী এখন যে লড়াইটা দেখা দিয়েছে সেটা আর বুর্জোয়াদের গৃহবিবাদ মাত্র নয়; বুর্জোয়া রাজত্বের চরম প্রকাশের সময়ে যা অনিবার্য তারই আভাস ফুটে উঠছে সর্বত্র।

মিয়ানমারেও নির্বাচন হয়েছিল। নির্বাচনে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি আগের চেয়েও ভালো ফল করেছিল। তাতেই ঘটেছে তাদের এবং ভোটদাতা জনগণের বিপদ। আসল ক্ষমতা সেখানে সেনাবাহিনীর হাতে, ক্ষমতা তারাই দখল করে রেখেছে, এবং জবাবদিহিতার দায়বিহীন ক্ষমতায় থাকলে যা যা করা সম্ভব সেসব তারা করেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি সবকিছুতেই অবাধ লুণ্ঠনের রাজত্ব বসিয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর গণনির্যাতন, তাদের গৃহে অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, হত্যাসহ যত রকমের জুলুম কল্পনা করা সম্ভব সব চালিয়েও শান্ত থাকেনি, ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে অস্ত্রের মুখে দেশছাড়া করেছে, দুর্ভাগা মানুষের জায়গাজমি, ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাট, যা ছিল সব দখল করে নিয়েছে। একদা বিশ্ববরেণ্য নেত্রী সু চি; তিনি প্রতিবাদ করবেন কী, উল্টো সহযোগিতাই করেছেন। অথচ ওই সেনাবাহিনী তাঁকে বছরের পর বছর আটক করে রেখেছিল, পারলে মেরেই ফেলত। আপসের ফর্মুলায় ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেবেন এবং নির্বাচনের পথে সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেবেন, এই ছিল তাঁর আশা। তা সেনাবাহিনী সেটা হতে দেবে কেন? তাদের হাতে বন্দুক আছে, সেটা ব্যবহার করে ফের তারা ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে। সু চিকে আবারও আটক করা হয়েছে। সু চির দল কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারেনি।


তারা না-পারুক, সাধারণ মানুষ ঠিকই পেরেছে। তারা ভোট দিয়েছে সামরিক বাহিনীর বিপক্ষে; দেখেছে তাতে কাজ হলো না, ভোটে কুলাল না, এবার তাই নেমে এসেছে রাজপথে। কেবল রাজধানীতে নয়, দেশের সকল শহরে। এসেছে ছাত্ররা। তারাই অধিক সংগঠিত। মিয়ানমারে ছাত্রবিদ্রোহ আগেও একবার হয়েছিল; সেবার সেনাবাহিনী ভয়াবহ রকমের রক্তপাত ঘটিয়ে তাদের দমন করেছিল। সে দেশের মানুষ আর সেনাশাসন সহ্য করতে সম্মত নয়। এমনটা যে ঘটতে পারে তা ছিল জেনারেলদের একেবারেই ধারণার বাইরে। কিন্তু অভ্যুত্থান না-ঘটিয়ে তাদের পক্ষে কোনো উপায়ও ছিল না; নির্বাচনে বিজয়ী বুর্জোয়ারা তাদের ক্ষমতা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার আয়োজন করেছিল। জেনারেলরা তাই একেবারে মরণকামড়ই বসিয়েছে। কিন্তু এটা তারা টের পাচ্ছে যে তাদের প্রতিপক্ষ এখন আর ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি নামের একটি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল নয়, প্রতিপক্ষ মিয়ানমারের জনসাধারণ। অস্ত্র হাতে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে বিপদের শঙ্কা আছে। কে জানে শেষ পর্যন্ত পুলিশ হয়তো হুকুম শুনবে না, সেনাসদস্যরাও হয়তো আপনজনদের ওপর ট্যাঙ্ক-কামান-বন্দুক ইত্যাদি নিয়ে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে রাজি হবে না। রোহিঙ্গা দমনের সময় যে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা লাখ লাখ অসহায় মানুষের মরণকান্নায় সাড়া তো দেয়ইনি, উল্টো সেনাবাহিনী ঠিক কাজ করছে বলে রাস্তায় বের হয়ে জেনারেলদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছিল, তারাও দেখা গেল এবার জেনারেলদের প্রতি সমর্থন জানাতে নারাজ। সু চি এবং তাঁর বুর্জোয়া সাথিরা না বুঝুক, বিক্ষোভরতরা নিশ্চয়ই টের পাচ্ছে, সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের হত্যা ও উচ্ছেদকাণ্ড সমাপ্ত করে এখন কতটা যে হাত পাকিয়েছে, তারই একটা পরীক্ষা নিজের দেশের মানুষের ওপর চালানোর পাঁয়তারায় আছে। ছবিতে তো দেখাও গেল হাতে ধরা প্ল্যাকার্ডগুলোর একটিতে লেখা রয়েছে- 'রোহিঙ্গা সংকটের জন্য আমরা সত্যি দুঃখিত'। উগ্র জাতীয়তাবাদীদের মৌতাত ভেঙে মানবিকতার এই নাড়াচাড়া দেওয়াটা দৃশ্য হিসেবে সুখকর, ঘটনা হিসেবে আশাপ্রদ। নব্য-পুঁজিবাদী চীনের এবং পাকাপোক্ত পুঁজিবাদী রাশিয়ার যে কতটা অধঃপতন ঘটে গেছে সেটাও সামরিক জান্তার প্রতি ওই দুই দেশের শাসকদের নীরব সমর্থন দেখে মিয়ানমারবাসীর বিলক্ষণ টের পাবার কথা।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, কেজেবির সাবেক কর্মচারী ভদ্মাদিমির পুতিনও বেশ 'গণতন্ত্রমনা' দেখা গিয়েছিল। তিনি নির্বাচন দিয়ে থাকেন; তবে নির্বাচন ব্যবস্থাকে এতটাই নিখুঁত করে ফেলেছেন যে তাঁর আমৃত্যু নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট থাকতে অসুবিধা হবার কথা নয়। কমিউনিস্টদের উপস্থিতি যাতে শক্তিশালী না হয় তার ব্যবস্থা অবশ্য আগেই করে রাখা হয়েছে। বুর্জোয়ারা যে দল গঠন করবে, এমন সম্ভাবনাও তার গোয়েন্দাবাহিনী প্রায় নির্মূল করে ফেলেছে। তবুও প্রতিবাদ কিন্তু হচ্ছে। এক ব্যক্তি, তাঁর কোনো গোছানো দল নেই, সাহস করে যেই বলেছেন যে আগামী নির্বাচনে তিনি পুতিন সাহেবের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, অমনি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দারা তৎপর হয়ে উঠেছিল; বলা তো যায় না লোকেরা না আবার ওই প্রায়-অচেনা ব্যক্তিটির পেছনেই দাঁড়িয়ে যায় কিনা। গোয়েন্দারা কোনো ঝুঁকি নেয়নি, লোকটিকে তারা ইহজগৎ থেকেই সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। খাবারে নয়, তার অন্তর্বাসের ভেতরে বিষ মাখিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। লোকটির টিকবার কথা ছিল না। হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে ছিলেন; জার্মান দূতাবাসের লোকেরা বললেন চিকিৎসার জন্য তাঁকে আমরা আমাদের দেশের হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাই। লোকটি জার্মানির হাসপাতালে গেলেন, এবং কী কঠিন তাঁর প্রাণশক্তি ও অবিচল দক্ষতা জার্মান চিকিৎসকদের সে চিকিৎসায় তিনি সেরে উঠলেন।

তবে ফেরত আসার সঙ্গে সঙ্গে, বিমানবন্দরেই তাঁকে আটক করা হলো। যথারীতি মামলা দেওয়া হলো, এবং যথাপ্রত্যাশিত স্বাধীন আদালতের সুবিবেচিত রায়ে তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে গেলেন। অনেক লোক প্রতিবাদ করল। শত শত নয়, হাজারে হাজার। এক দিন নয়, অনেক দিন ধরে। কিন্তু তাতে কী হবে? অদম্য ব্যক্তিটি জেলেই আছেন। কারণ, তিনি তাঁর এই ঘোষণায় অনড় রয়েছেন যে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়বেনই। কাজেই তাঁর জন্য আরও অনেক দুর্ভোগ যে অপেক্ষা করছে- এটা নিশ্চিতরূপেই বলা যায়। শেষ পর্যন্ত অবশ্য পুতিনই জয়ী হয়েছেন। তবে এটা লোকে বুঝবে যেমনটা অন্য দেশের মানুষও বুঝতে পারছেন যে, স্বৈরশাসকদের হটাতে গেলে নির্বাচনে আর কুলাবে না, অনিবার্য হচ্ছে অভ্যুত্থান, যার অপর নাম গৃহযুদ্ধ। সেই যুদ্ধেও কিন্তু কাজ হবে না, যুদ্ধটা যদি কেবল ব্যক্তিকে সরানোর জন্যই হয়। প্রয়োজন হবে সামাজিক বিপ্লবের, যে-বিপ্লব লেনিন ঘটিয়েছিলেন রাশিয়াতে, মাও সে তুং চীনে। কিন্তু সে-বিপ্লবের অর্জনও স্থায়ী হবে না যদি না বিপ্লব বিশ্বময় ঘটে। এর বাইরে যা সেসব কেবলই সংঘর্ষ, অরাজকতা ও মেরূকরণ-বৃদ্ধি।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়