প্রতি বৎসরের ন্যায় এইবারও দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-টিআই তাহাদের বৈশ্বিক দুর্নীতির ধারণা সূচক সিপিআই প্রকাশ করিয়াছে। 'যথারীতি' এইবারও বাংলাদেশ উক্ত সূচকে উন্নতি ঘটাইতে ব্যর্থ হইয়াছে। শুধু তাহাই নহে, এক ধাপ নিল্ফেম্নও চলিয়া গিয়াছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে- সূচক অনুযায়ী শূন্য হইতে ১০০ স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর বিগত টানা চারি বৎসর ছিল ২৬; এইবার হইয়াছে ২৫। যাহার ফলস্বরূপ ১৮০টি দেশের মধ্যে গতবার নিম্ন হইতে ত্রয়োদশতম স্থানে থাকিলেও এইবারের অবস্থান দ্বাদশতম। উপরন্তু বাংলাদেশ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১ দেশের মধ্যে চতুর্থ সর্বোচ্চ এবং দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের কলঙ্কতিলক পরিধান করিয়াছে।

স্মরণ রাখিতে হইবে- দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ২০১২ সাল হইতে টিআইর দুর্নীতির ধারণা সূচকে এই বিব্রতকর অবস্থানে রহিয়াছে। এই আশঙ্কা অমূলক হইতে পারে না- দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গৃহীত না হইলে অন্তত দক্ষিণ এশিয়ায় উক্ত সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অচিরেই হয়তো একেবারে তলানিতে গিয়া ঠেকিবে। আমাদের ইহাও স্মরণে রহিয়াছে, চলতি শতাব্দীর সূচনায় একাদিক্রমে কয়েক বৎসর টিআইর দুর্নীতি ধারণা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সর্বনিল্ফেম্ন। স্বাভাবিকভাবেই ইহা লইয়া সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। সম্ভবত ইহারই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পূর্বে দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহারে বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'শূন্য সহনশীলতা'র নীতি ঘোষণা করিয়াছিল। একই ঘোষণা আমরা দলটার তরফ হইতে পরবর্তী নির্বাচনসমূহেও শুনিয়াছিলাম। অধিকন্তু খোদ প্রধানমন্ত্রী অদ্যাবধি একাধিকবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁহার সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা ব্যক্ত করিয়াছেন। সেই অনুসারে দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের তরফ হইতে কিছু পদক্ষেপও আমরা ইতোমধ্যে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। ইহার পরও আলোচ্য সূচকে দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটিতেছে না কেন- সুলুক সন্ধান জরুরি। দেশের ভাবমূর্তির জন্য এহেন পরিস্থিতি ইতিবাচক হইতে পারে না।

ভুলিয়া যাওয়া চলিবে না- বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশই আপন অভিলাষে চলিতে পারে না। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলির সহযোগিতা বাংলাদেশের ন্যায় যে কোনো উন্নতিকামী রাষ্ট্রের জন্যই অপরিহার্য। এই সকল বিষয়ের সহিত সংশ্নিষ্ট দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি অতি নিবিড়ভাবে সংশ্নিষ্ট। স্বীকার করিতে হইবে, সরকার বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনাও করিয়া থাকে। ২০১৯ সালের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে ক্ষমতাসীন দলেরই বিভিন্ন স্তরের বহু নেতাকে অবৈধ উপায়ে সম্পদ উপার্জনের দায়ে গ্রেপ্তার করা হইয়াছিল। উক্ত অভিযান দুর্নীতিবিরোধী মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ জাগাইলেও, রহস্যজনক কারণে একটা সময়ে তাহা থামিয়া যায়। এমনকি গ্রেপ্তারকৃত অনেকেই আইনের ফাঁক ব্যবহার করিয়া কিংবা মহলবিশেষের ঔদাসীন্য বা প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় জামিনে মুক্ত হইয়া ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত। বর্তমান সরকার দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদককে পূর্বের তুলনায় অনেক শক্তিশালী করিয়াছে- উহাও আমরা অস্বীকার করি না। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি অনুসন্ধানে দুদক যতটা উৎসাহী; সরকারদলীয় নেতাদের ব্যাপারে ততটাই অনুৎসাহী কিনা ভাবিয়া দেখা প্রয়োজন।
এই কথা সরকারের কর্তব্যক্তিরাও বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করিয়াছেন, একটা রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে দুর্নীতি সংঘটিত হওয়া মানে শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদেরই অপচয় নয়; প্রত্যাশিত সেবা হইতেও জনগণকে বঞ্চিত করা। দুর্নীতি যে একই সঙ্গে জনগণের বৃহত্তর অংশকে বঞ্চিত করিয়া ক্ষুদ্রতর অংশের হস্তে সম্পদের পুঞ্জীভবনে সহায়তার মাধ্যমে সমাজে বৈষম্যেরও বিস্তার ঘটায়, তাহাও সকলে জ্ঞাত। সেই হিসাবে এমন আশঙ্কা করা নিশ্চয়ই বাতুলতা হইবে না, রাষ্ট্রীয় অর্থে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চলিতেছে; দুর্নীতি বিদ্যমান ধারায় অপ্রতিরোধ্য থাকিলে উহাও ব্যর্থ হইয়া যাইতে পারে। অতএব, টিআইর আলোচ্য দুর্নীতি সূচককে জাগিয়া উঠিবার একটা আহ্বানস্বরূপ বিবেচনা করিয়া সরকার অবিলম্বে তাহার দুর্নীতি প্রতিরোধে তৎপর হইবে বলিয়া প্রত্যাশা।

বিষয় : সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন