রোজা শুরুর আগের দিন ঢাকার গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে গিয়েছিলাম খেজুর কিনতে। লাখোপতি আর কোটিপতিদের মার্কেট বলে সেখানে ভালো মানের খেজুর পাওয়া যায়। সেই লোভে পড়েই যাওয়া। কিন্তু খেজুরের যা দাম শুনলাম দোকানিদের কাছ থেকে, তাতে ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। আত্মার পানি শুকিয়ে গেলেও লোভের তো শেষ হয় না। তারপর আর কী? গতবার যে খেজুর– নাম তার মেডজুল বা মরিয়ম– কিনে এনেছিলাম ৫০০-৫৫০ টাকা দরে; সেই খেজুর এবার ৯০০ টাকায় কিনতে বাধ্য হলাম। ইফতারিতে সেই খেজুরের স্বাদও আগের মতো মনে হলো না।

ইফতারিতে খেজুর খাওয়ার রেওয়াজ আমাদের ছেলেবেলায়, ৫০-৬০ বছর আগে; এমন অনিবার্য ছিল না। ধনবানদের কেউ কেউ গাঁটের পয়সা বেশি খরচ করে খেজুর কিনতেন বটে; সাধারণ মানুষ না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শ্রমিক রপ্তানির সুবাদে ক্রমেই সাধারণের খাদ্য তালিকায় বিশেষত রমজান মাসে খেজুর যুক্ত হয়েছে। এটাও ঠিক, আমাদের আর্থিক সংগতি বেড়েছে। স্বাধীনতার পর কয়েকশ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট এ বছর ৯ লাখ কোটি পেরিয়ে গেছে।

লোকে বলে– আয় বুঝে ব্যয় করতে হয়। আমাদের আয়-রোজগার বেড়েছে, তাই ব্যয়ও বেড়েছে। বিদেশি খেজুর কেনার প্রবণতাও বেড়েছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ইরাকি জাহিদি খেজুরের চাহিদাই নাকি সবচেয়ে বেশি, জানিয়েছেন একজন খেজুর আমদানিকারক। ৬০ শতাংশ খেজুরই ইরাকি। সবচেয়ে দামি খেজুর মিসরের মেডজুলের। বাকি খেজুর আসে সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, সৌদি আরব, ইরান, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়াসহ ২০টি দেশ থেকে।

সমকালের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ‘সাধারণভাবে খেজুরের চাহিদা থাকে মাসে ৫-৬ হাজার টন। কিন্তু রমজান মাসে এর চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজার টনে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা খেজুর চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর হয়ে প্রবেশ করে দেশের বাজারে। অন্য কিছু খেজুর আসে বিমানে। চলতি অর্থবছরে প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১২ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে। সর্বশেষ আড়াই মাসে এসেছে আরও ১২ হাজার টন। পাইপলাইনে আছে আরও ১২ হাজার টন।’ (২৭ মার্চ, ২০২৩)

রমজানে ৫০ হাজার টন খেজুর আমরা খাই! কেন ইফতারিতে খেজুর অপরিহার্য হয়ে উঠল? খাদ্যটি ‘সুপারফুড’– তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নাকি একটি বা দুটি খেজুর খেয়ে রোজা রাখতেন। কিন্তু এই বয়ান শুনে রোজা শুরুর আগেই দুই থেকে পাঁচ কেজি খেজুর কিনে ফেলার যুক্তি কী? আমি যেদিন কিনেছি; কিছু মানুষ তিন-চার কার্টন কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের ভিড়ে আমাকে পাত্তাই দিচ্ছিলেন না দোকানি। আমি জানি না, খেজুর খেয়ে ইফতারি করলে বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে কিনা। তবে এটা নিশ্চিত– খেজুরের মতো সুপারফুডের কল্যাণে সুপার স্বাস্থ্যবান ও আর্থিকভাবে বলবানদের ব্লাড প্রেশার বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশে এখন গরিবের সংখ্যা নাকি আঙুলে গোনা যায়। এ কথা বলেন ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা। সরকার অবশ্য খাদ্য আমদানিকে প্রাধান্য দিয়ে প্রসাধনীসহ প্রায় অধিকাংশ বিলাস পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ডলার সংরক্ষণ করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, খেজুর কতখানি খাদ্য ও কতখানি বিলাস পণ্য? তারপরও এই ডলার সংকটের কালে ৫০ হাজার টন খেজুর আমদানির এলসি করতে দিতে হয়েছে সরকারকে।

রমজানের খেজুর আমদানিতে সরকারের নমনীয়তার সুযোগটি কীভাবে মুনাফালোভী আমদানিকাররা নিয়েছে, তার নমুনা রয়েছে সমকালের ওই প্রতিবেদনেই– ‘চট্টগ্রামকেন্দ্রিক আমদানিকারকরা ৮০ টাকা ১১ পয়সা দরে ৭৫ কোটি ৪২ লাখ টাকায় ৯ হাজার ৪১৪ টন খেজুর এনেছেন। আমদানি নথি বিশ্লেষণে এমন দর মিললেও দেশের বাজারে কোথাও ২৫০ টাকার নিচে খেজুর নেই। সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০০ টাকা দরেও বিক্রি হচ্ছে।’ (সমকাল, ২৭ মার্চ, ২০২৩)

সমকালের প্রতিবেদনের সত্যতা পেয়েছি গুলশানের ডিসিসি বাজারে; ওই রকম দামেই খেজুর বিক্রি হচ্ছে। মতিঝিলের ফুটপাতের ‘ভাসমান স্থায়ী’ দোকানের কম-বেশি ওই রকম দামেই খেজুর বিক্রি হচ্ছে। তবে কম দামের, মানে ২৫০ টাকা দামের কোনো খেজুর ডিসিসিতে দেখিনি। কথা হচ্ছে, যে খেজুর ১০০ টাকা কেজি দরে বা তার চেয়েও কম দামে আমদানি করা হয়েছে, সেই খেজুর কেন দ্বিগুণ, পাঁচ গুণ; ক্ষেত্রবিশেষ ১০ গুণ দামে বিক্রি করছেন দোকানি? আর যে খেজুর ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন, তার আমদানি খরচ তো ১০০ টাকা মাত্র। তাহলে আমদানিকারকের লাভ কত আর খুচরা দোকানির লাভ কত? সরকার শুল্ক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কত? এর প্রভাবে বাজারে উত্তাপ বাড়ছে কেমন?

মজার ব্যাপার, রমজান উপলক্ষে ২৮ ধরনের খেজুর আমদানি হলেও কাস্টমস শুল্কায়নে সব খেজুরের মান নিম্ন এবং দাম এক। কাস্টমসের যাঁরা খেজুরের শুল্কায়নের দায়িত্বে, তাঁরা কি জানেন না, আমদানিকারক সব ধরনের খেজুরকেই নিম্নমানের বলে কাগজপত্র তৈরি করে বা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছেন? আর আমরা যাঁরা ক্রেতা, কেন খেজুরের বাজারে হামলে পড়ছি? রোজার মূল শিক্ষাটা সংযমের। সবকিছু থেকে সংযম দেখানো। সেহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত যেমন ইমানদারের লোভ সংবরণের সময়কাল; তেমনি সেহরি ও ইফতারের ক্ষেত্রেও সংযমী হওয়াটাই প্রধান শিক্ষা। তাঁদের আচার-আচরণেও সেই সংযম দেখানো উচিত। কিন্তু আমরা এই শিক্ষায় শিক্ষিত নই। বরং অসংযমী হতেই ভালোবাসি।

আর তারা কারা, যারা খেজুরের মতো মূলত ইফতারে খাওয়া পণ্য নিয়েও অতি মুনাফার লোভ পরিত্যাগ করে না? এ প্রশ্ন শুধু খেজুর আমদানিকারকদের জন্য নয়; খাদ্যশস্যসহ সব পণ্য আমদানিকারকের উদ্দেশেই। ব্যবসা করুন, মুনাফা করুন, বাধা নেই। কিন্তু দোহাই লাগে, মানবতার স্বার্থে হলেও অতি লোভ ও অতি মুনাফা বর্জন করুন। খেজুরের বাজার নিয়ে আমার এই খাজুরে আলাপ কেউ কি শুনবেন?

ড. মাহবুব হাসান: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক