ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষার্থীর মাধ্যমে শিক্ষক মূল্যায়ন: সাবধানতার পরিসর

শিক্ষার্থীর মাধ্যমে শিক্ষক মূল্যায়ন: সাবধানতার পরিসর

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৪ | ০২:০৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সেমিস্টার থেকেই শুরু হচ্ছে পাঠদান শিক্ষা পদ্ধতির মূল্যায়ন। আপাত মনে হচ্ছে, খুবই ভালো উদ্যোগ। বিদেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশেও অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু রয়েছে। এত দিন ধরে স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ মূল্যায়ন পদ্ধতি না থাকায় শিক্ষকদের দায়িত্ব, শিক্ষা কৌশল ও শিখন পদ্ধতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত সম্পর্কে দাপ্তরিকভাবে তেমন কিছু জানা যেত না। এ উদ্যোগকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন।

কারণ, বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিংয়ে ভালো স্থান পেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য জ্ঞানতত্ত্বীয় বিষয়-আশয়ের পরিবর্তন, শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে শিক্ষার্থীবান্ধব এবং এর গুণগত মানের ইতিবাচক পরিবর্তনে এ মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষকরা তাদের খামতি ফিরে দেখা এবং তা মেরামতের সুযোগ পাবেন। শিক্ষার্থীদের কাছে আরও বেশি শিক্ষাবান্ধব কৌশল নিয়ে হাজির হতে পারবেন। শিক্ষার্থী-শিক্ষক ক্ষমতা-সম্পর্ক নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে। 

অবশ্য বলে রাখা প্রয়োজন, বতর্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের যে ছক করা হয়েছে, সেটি সব শিক্ষার্থী পূরণ করার সুযোগ পাবে না। শুধু ‘কলেজিয়েট’ শিক্ষার্থীরাই করতে পারবে। শ্রেণিকক্ষে অনিয়মিত শিক্ষার্থীরা এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারবে না।

এই জরুরি বিষয়ের সঙ্গে আরও কিছু আলাপ জারি রাখা প্রয়োজন। এখন বিদেশে যে ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা রয়েছে, তার অনেক কিছুই দেশের সঙ্গে মিলবে না। তাই এ মূল্যায়নের সঙ্গে কিছু সতর্কতা অচ্ছেদ্য। 

প্রথমে আসি শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে। বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষার্থীরা আসলে কী চায়? বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর মূল আগ্রহের জায়গা বিসিএস। তাই অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার চেয়ে সার্টিফিকেটকেই গুরুত্ব দেয়। যেনতেন প্রকারে একটি সার্টিফিকেট পেলেই খুশি। সবাই হয়তো নয়; কিন্তু বেশির ভাগই চায় কম পড়াশোনা, কম ক্লাস, কিন্তু বেশি নম্বর। শিক্ষকদের বেশি ক্লাস নেওয়াকেও অনেকে তাদের ভাষায় ‘প্যারা’ দেওয়া মনে করে। ফলে যে শিক্ষক কম পড়াবেন, ক্লাস কম নেবেন কিন্তু বেশি নম্বর দেবেন, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে সেই শিক্ষক হয়তো এগিয়ে থাকবেন। যার কারণে শিক্ষকদের মধ্যে হয়তো শিক্ষার্থীদের অযৌক্তিকভাবে ‘বেশি নম্বর’ দেওয়ার প্রতিযোগিতা থাকবে, যা ইতোমধ্যে অনেক বিভাগে শুরু হয়ে গেছে। 

বিপরীতে যেসব শিক্ষক ‘অপেক্ষাকৃত কম নম্বর’ দেবেন; শিক্ষার্থীরা তাদের ‘ভালো শিক্ষক’ বলে মূল্যায়ন হয়তো করতে চাইবে না। তাই যে করেই হোক, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ‘ভালো’ শিক্ষকের প্রশংসা নিতে ‘নম্বর’ নিয়েও ভাবতে হচ্ছে শিক্ষকদের। এ পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকরা বাড়তি চাপ বোধ করবেন এবং গুণগত মান কমে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। শুনেছি, কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এ ধরনের চাপ বোধ করেন। এমন চাপ থেকে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন কতটা যথার্থ হবে, সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার। 

এবার আসি শিক্ষক রাজনীতি বিষয়ে। এখানে ভয়ের জায়গা অনেকটাই। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক-নেতা শিক্ষক কমবেশি সব বিভাগেই রয়েছেন। তাদের দাপটেরও আছে রকমফের। শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের ক্ষমতা-দাপটের খোঁজখবর রাখে। যারা ক্ষমতাবান তাদের কাছে অনেকেই ভেড়ে। পাশাপাশি রাজনীতিতে মাঠের বিরোধী দল হিসেবে পরিচিত বিএনপি ও জামায়াতপন্থি শিক্ষকও রয়েছেন; আছেন বামপন্থি শিক্ষক। দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরেও প্রায় সব বিভাগেই শিক্ষকদের কমবেশি ঘরানা অথবা স্বার্থকেন্দ্রিক দলাদলি রয়েছে। সেই দলাদলির মূল জায়গায় থাকে অন্যকে হেয়, অপমান কিংবা চ্যালেঞ্জ করার রাজনীতি। সেসব ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের কমবেশি ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রেও অন্যকে ঘায়েল করতে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হবে না– এই নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। সেটিই সবচেয়ে ভাবনার বিষয়। শিক্ষার্থীরা এমনিতেই নানাভাবে শিক্ষক রাজনীতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদি শিক্ষক মূল্যায়নেও তারা ব্যবহৃত হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক আরও ভয়াবহ জায়গায় চলে যাবে। 

যখন এই শিক্ষক ও শিক্ষাদান মূল্যায়ন পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার মান বাড়ানো; আন্তর্জাতিক পরিসরে একই মানদণ্ডে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখা; তখন বিদ্যমান শঙ্কাকে আমলে নিয়ে কর্তৃপক্ষ কতটা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন আশা করছে, সেটি জানা খুবই প্রয়োজন। এসব সংকট মোকাবিলায় তারা কী ধরনের কৌশল ব্যবহার করবে, সেটিও খোলাসা করা জরুরি। বলা হতে পারে, আগে শুরু হোক, তারপর এ বিষয়ক জটিলতা ও সংকট মোকাবিলার উপায় ঠিক করা হবে। কিন্তু অনেক কিছু ফয়সালার আগেই শুরু করলে বেশ কিছু বিপদ হতে পারে। সে বিষয়ে আমাদের সাবধান হতে হবে। 

কিছু ছোট বিষয়কেও অনেক বেশি মুনশিয়ানার মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে। যেমন মূল্যায়নের রিপার্টটি যেন গোপন থাকে। কিন্তু আমাদের শিক্ষক রাজনীতি ও দলাদলির কারণে সেটি গোপন থাকবে বলে মনে হয় না। যেভাবেই মূল্যায়িত হোক না কেন, কোনো শিক্ষকের মূল্যায়ন খারাপ হলে তাঁকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগতভাবে কোণঠাসা করা হবে এবং তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন। 

এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ভয়টি হলো, শিক্ষক ও শিক্ষাদান মূল্যায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি শিক্ষক রাজনীতির আরও ধারালো অস্ত্র হিসেবে হাজির হবে না তো? শিক্ষার্থীদের কাছে টানতে কিংবা খুশি রাখতে শিক্ষকরা অযথা ‘বেশি নম্বরের ঝাঁপি’ খুলে শিক্ষার মতো বিষয়কে ‘অর্জন’ থেকে ‘দাতব্য’ পর্যায়ে নিয়ে যাবেন না তো?

শিক্ষক ও শিখন পদ্ধতির মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এবং এটি শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেবে, যদি এটিকে ঠিকমতো চর্চিত রাজনীতির বাইরে কার্যকর করা যায়। কিন্তু অন্য সব রাজনীতির দেনা-পাওনা না মিটিয়ে বরং চলমান বিভিন্ন অনুষঙ্গকে জারি রেখে এ মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর করলে সত্যিকারভাবে কতটা সুফল আমরা আনতে পারব, সে বিষয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। ধারণা করছি, প্রথম কয়েক সেমিস্টারে হয়তো বেশ কিছু সমস্যা হাজির হবে, কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রয়া হিসেবে নতুন তৈরি হওয়া শিক্ষার্থী-শিক্ষকের সম্পর্ক কতটা শিক্ষা পরিবেশবান্ধব হবে– সে বিষয়ে আমাদের অধিক মনোযোগী হতে হবে। 

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 
zobaaidanasreen@gmail.com

আরও পড়ুন

×