সংসদে না বুঝে 'না' ভোট, পরে সংশোধন

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

ফাইল ছবি

সংসদে না বুঝে 'না' ভোট দিলেন সরকারি দলের সদস্যরা। সংসদে বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব প্রত্যাহারের বিষয়টি স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ভোটে দিলে সরকারি দলের সদস্যরা 'হ্যাঁ' ভোট দেওয়ার পরিবর্তে 'না' ভোট দেন। পরক্ষণেই স্পিকার দ্বিতীয় দফায় প্রস্তাবটি ভোটে দেন। তখন বেশিরভাগ সদস্য 'হ্যাঁ' ভোট দেন।

বৃহস্পতিবার বেসরকারি দিবসে জাতীয় সংসদে এ অভিনব ঘটনা ঘটে। তামাকজাত দ্রব্যের ওপর প্রচলিত অ্যাডভেলারাম (স্তরভিত্তিক মূল্যের শতকরা হার) পদ্ধতির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট করারোপ করার দাবি জানিয়ে বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব এনেছিলেন সাবের হোসেন চৌধুরী। কণ্ঠভোটে তার এই প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। তবে সংশোধনী দিয়ে তার এই প্রস্তাবে সমর্থন জানান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননসহ ১০ সদস্য।

সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সাধারণত সংসদের ভোটাভুটির ক্ষেত্রে বেশিরভাগ এমপিই হুইপদের নির্দেশনার দিকে তাকিয়ে থাকেন। সে অনুযায়ী তারা হাত তোলেন এবং 'হ্যাঁ' বা 'না' ধ্বনি তুলে নিজেদের অবস্থান জানান। বিল পাস বা অন্য কোনো বিষয়ে তাদের ভোট দেওয়ার বিষয়ে নিজেরা সচেতন না হয়ে দলীয় হুইপিং অনুসরণ করেন। এ কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার বেসরকারি দিবসটি সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার হিসেবে বিবেচিত। এই দিনে বেসরকারি বিল বা সিদ্ধান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়ে থাকে। যাতে মন্ত্রীদের সিদ্ধান্তের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয় থাকে না। এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন। এর আগেও মন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাসের নজির রয়েছে।

এদিন দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাবে আওয়ামী লীগের দলীয় এমপি সাবের হোসেন চৌধুরী উত্থাপিত প্রস্তাবটি ছিল 'সংসদের অভিমত এই যে, সকল প্রকার তামাকজাত দ্রব্যের ওপর প্রচলিত অ্যাড-ভেলোরাম পদ্ধতির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট করারোপ (স্পেসিফিক ট্যাপ) করা হোক'। তার এই প্রস্তাবের ওপর সংশোধনী দিয়ে সমর্থন জানান আরও ৯ এমপি।

সাবের হোসেন চৌধুরী তার প্রস্তাবের পক্ষে বলেন, বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারজনিত রোগে প্রতিবছর এক লাখ ৬১ হাজার মানুষ অকালে মারা যান। প্রায় ১৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। প্রায় ৬১ হাজার শিশু পরোক্ষ ধূমপানের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যা একই সময়ে তামাক খাত থেকে অর্জিত রাজস্ব আয়ের চেয়ে বেশি।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে তামাকের যে করকাঠামো তা অত্যন্ত জটিল, পুরনো ও অকার্যকর। বিশ্বের মাত্র ছয়টি দেশে এভাবে করারোপ করা হয়। অন্যদিকে ফিলিপাইন, নেপাল, শ্রীলংকা, অস্ট্রেলিয়াসহ বেশিরভাগ দেশে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি চালু আছে। এটি করা হলে রাজস্ব আয় বাড়বে। 

তিনি বলেন, তামাক কোম্পানির হাত অনেক লম্বা। আমরা যাই করি অদৃশ্য হাত এসে সব বন্ধ করে দেয়।

জবাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বর্তমান আইনে তামাকপণ্যে সুনির্দিষ্ট করারোপের সুযোগ নেই। চলমান বাজেটে স্তরভিত্তিক শুল্কারোপ করা হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এবং গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ক্রমান্বয়ে সুনির্দিষ্ট করারোপ পদ্ধতি চালু করার বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো একদিন এটি হবে। তাই তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের জন্য আহ্বান জানান।

তবে অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারেননি জানিয়ে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, জাতীয় স্বার্থে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির পথ সৃষ্টি হবে তার এই প্রস্তাবে। এটা অর্থমন্ত্রীর সানন্দে রাজি হওয়ার কথা। সেখানে তিনি কীভাবে বলেন, এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা।

এ পর্যায়ে স্পিকার প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের জন্য সংসদের বৈঠকের অভিমত জানতে চেয়ে ভোটাভুটিতে দেন। স্পিকার ভোটে বলেন, সাবের হোসেন চৌধুরীর এই প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করা হোক- যারা এর পক্ষে আছেন তারা 'হ্যাঁ' বলুন। খুব কম সংখ্যক সদস্য হ্যাঁ বলেন। স্পিকার বলেন, যারা এর বিপক্ষে আছেন তারা 'না' বলুন। বেশিরভাগ সদস্য 'না' বলেন। অর্থাৎ বেশিরভাগ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীর প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়ে দেন। এ সময় স্পিকার কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবটি গ্রহণে রাজি না হলেও প্রস্তাব প্রত্যাহারের বিপক্ষে ভোট পড়েছে। এ সময় স্পিকারকে সহায়তাকারী সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা তাকে কিছু একটা বলেন। এ পর্যায়ে স্পিকার মৃদু হেসে আবার সব সদস্যের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তিনি প্রস্তাবটি আবার পড়ে শোনান এবং দ্বিতীয় দফা ভোট দেন। দ্বিতীয় দফায় 'হ্যাঁ' ভোট জয়ী হয়। এতে সাবের হোসেন চৌধুরীর প্রস্তাবটি নাকচ হয়।

এ পর্যায়ে সাবের চৌধুরী দাঁড়িয়ে ফ্লোর চাইলে স্পিকার তাকে পরে ফ্লোর দেবেন জানিয়ে অন্য কার্যসূচিতে চলে যান। পরে আবারও সাবের চৌধুরী ফ্লোর নিয়ে বলেন, তার প্রস্তাবের নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি কথা বলতে চান। কারণ বিষয়টি প্রথম দফা ভোটেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। স্পিকার আবার দ্বিতীয় দফা কেন ভোট দিলেন এবং এমন নজির আছে বলেও তিনি মনে করেন না।

তিনি বলেন, কণ্ঠভোটের ফল নিয়ে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলে বিভক্তি ভোট দেওয়া যেত। এখানে সরকারি দলের ব্রিফিংয়ের কোনো বিষয় নেই বা হাত দেখিয়ে ভোল পাল্টানোর নজির সংসদে থাকা উচিত নয়। এই একটা ভোটে তো সরকারের পতন হয়ে যাবে না। এটা তো সরকারের বিপক্ষে ভোট না। এটা জনস্বার্থের পক্ষে একটা ভোট। এ সময় তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ভোটের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখেন। প্রসিডিংস দেখেন। যদি প্রমাণ হয় প্রথম ভোটটি স্পষ্ট ছিল সে হিসেবে আমার প্রস্তাবটি গ্রহণ করবেন। সেটাই সংসদের অভিমত হিসেবে গণ্য হবে।

সাবের চৌধুরীর এই অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাশেদ খান মেনন বলেন, বেসরকারি সদস্য দিবস সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার। সংসদে বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাসের নজির রয়েছে। সংসদ সদস্যরা জাতীয় স্বার্থে কথা বলতে না পারেন, এভাবে যদি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়, পদ্ধতিগত প্রশ্ন ওঠে- তাহলে লাভ কী। স্পিকার বিভক্তি ভোটে যেতে পারতেন। এই যে পদ্ধতিগত প্রশ্ন উঠল, এটা খারাপ দৃষ্টান্ত হলো।

এ পর্যায়ে স্পিকার তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, মন্ত্রী প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। তাই নিয়ম অনুযায়ী ভোটে দেওয়া হয়েছে। ভোটের ফল নিয়ে তিনি কিছুটা কনফিউজড ছিলেন। সংসদের অভিমত কী সে বিষয়টি তার কাছে স্পষ্ট ছিল না। যে কারণে তিনি পুনরায় ভোটে দেন। তখন একটা ভিন্ন ফল এসেছে। সংসদ সদস্যরা যেটা যথাযথ মনে করেছেন তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে কোনো পক্ষপাতিত্বের বিষয় নেই।