বর্তমান সংসদের প্রথম এক বছরের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, জাতীয় সংসদ তার মৌলিক দায়িত্ব আইন প্রণয়ন, জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রত্যাশিত পর্যায়ে কার্যকর ছিল না। বেশিরভাগ সংসদীয় কমিটির পক্ষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যকর জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। এ ছাড়াও টিআইবি মনে করে, দেশে শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা রদবদলের সম্ভাবনা দূরীভূত হয়েছে।

বুধবার একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বছরের (২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর) পাঁচটি অধিবেশন নিয়ে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন 'পার্লামেন্ট ওয়াচ' প্রকাশ করা হয়। তাতে এসব পর্যবেক্ষণ ওঠে এসেছে। এক ওয়েবিনারে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোরশেদা আক্তার ও নিহার রঞ্জন রায়। এ সময় টিআইবির উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান উপস্থিত ছিলেন।

চলতি একাদশ সংসদের প্রথম বছরের পাঁচটি অধিবেশন পর্যবেক্ষণে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জমান বলেন, অষ্টম ও নবম সংসদে অধিবেশন বর্জনের অগ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি চালু ছিল। তা বন্ধ হয়েছে অনেক চড়া দামে। এত বেশি চড়া দামে যে মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মত হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত নির্বাচনের সংস্কৃতি আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। শান্তিপূর্ণ এবং স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা রদবদলের সম্ভাবনা দূরীভূত হয়েছে। তারই প্রভাব দেখা যাচ্ছে সংসদের মধ্যে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে সংসদে একদলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে সংসদীয় কার্যক্রমে একচ্ছত্র ক্ষমতার সুযোগ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ফলে সংসদের মৌলিক দায়িত্ব আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহিতা এবং জনপ্রতিনিধিত্ব এই তিনটি ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি সম্ভাবনাও ক্রমাগত বিলুপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে।

টিআইবির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, প্রশ্নবিদ্ধ একাদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারি দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ফলে সংসদীয় কার্যক্রমে বিশেষত আইন প্রণয়ন, বাজেট প্রণয়ন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে একচ্ছত্র ক্ষমতার চর্চা আরও জোরদার হয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচনকালীন মহাজোটের একটি দল নিয়ম রক্ষার প্রধান বিরোধী দল হওয়ায় সরকারের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় তাদের জোরালো ভূমিকার ঘাটতি দেখা গেছে।

সরকারের কার্যক্রম জবাবদিহির মধ্যে আনার একটি প্রক্রিয়া হলো মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংসদীয় কমিটি। সংসদীয় কমিটিগুলোর ভূমিকাও টিআইবির গবেষণায় পর্যালোচনা করা হয়।

কমিটির ভূমিকা প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদীয় কমিটিগুলো কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করেছে এ রকম দৃষ্টান্ত বিরল। সংসদীয় গণতন্ত্র, সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং শুদ্ধাচার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটিগুলোর যে অপরিহার্য ভূমিকা, তা কার্যকর হওয়ার কোনো দৃষ্টান্ত নেই। একইসঙ্গে সংসদীয় উম্মুক্ততার চর্চা কখনোই খুব একটা ছিল না, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, একাদশ সংসদের পাঁচটি অধিবেশনে আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে ৯ শতাংশ সময় ব্যয় হয়েছে। ২০১৯ সালে ভারতের ১৭তম লোকসভায় এই হার ছিল ৪৫ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচটি অধিবেশনে ১৬টি বিল (অর্থবিল বাদে) পাস হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বক্তব্যসহ প্রতিটি বিল পাসে গড়ে সময় লেগেছে ৩২ মিনিট। ২০১৯ সালে ভারতের ১৭তম লোকসভায় প্রতিটি বিল পাসে গড়ে প্রায় ১৮৬ মিনিট ব্যয় হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান সংসদের প্রথম পাঁচটি অধিবেশনে মোট কার্যদিবস ছিল ৬১টি। প্রতিদিন গড়ে ১৯ মিনিট ছিল কোরাম সংকট। মোট কোরাম সংকট ছিল ১৯ ঘণ্টা ২৬ মিনিট। কোরাম সংকটের এই সময়ের আর্থিক মূল্য ২২ কোটি ২৮ লাখ ৬৩ হাজার ৬২৭টাকা।

সংসদকে কার্যকর করতে সংসদ নির্বাচন বাস্তবিক অর্থে অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা; সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, কার্যকর বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা, এমপিদের দক্ষতা বাড়ানো, সংসদীয় কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং সংসদীয় কমিটির কার্যকরতা বাড়ানোসহ বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরে টিআইবি।