ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জারি করা অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করতে সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়েছে। রোববার মুজিববর্ষ উপলক্ষে সংসদের বিশেষ অধিবেশনের প্রথম দিন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল-২০০০' সংসদে উত্থাপন করেন।

পরে বিলটি পরীক্ষা করে ৭ দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে কোনো অধ্যাদেশ জারির পর সংসদের প্রথম বৈঠকে তা উপস্থাপনের বিধান রয়েছে। এর আগে সংসদের বৈঠকে এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংসদে তোলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

গত ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরদিন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০০০' জারি করেন। দেশজুড়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনবিরোধী আন্দোলন এবং ধর্ষণকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবির মধ্যে সরকার এ পদক্ষেপ নেয়। সংসদ অধিবেশন না থাকায় তখন আইন সংশোধনের পর তা অধ্যাদেশ আকারে জারি হয়।

২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) উপধারায় বলা হয়, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন। সংশোধিত আইনের খসড়ায় ৯(১) উপধারায় 'যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড' শব্দগুলোর পরিবর্তে 'মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড' শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। আইনের ৯(৪) (ক) উপধারায় ছিল- 'যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করিয়া মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।

এই উপধারা সংশোধন করে খসড়ায় 'যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড'-এর পরিবর্তে 'মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড' শব্দগুলো যোগ করা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ধর্ষণ ছাড়া সাধারণ জখমের ক্ষেত্রে অপরাধ আপসযোগ্য হবে। এ ছাড়া আগের আইনে ১৯৭৪ সালের শিশু আইনের রেফারেন্স ছিল। এখন সেখানে হবে 'শিশু আইন-২০১৩'।

২০০০ সালের আইনের ৩২ ধারায় বলা ছিল, 'এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধের শিকার ব্যক্তির সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া মেডিকেল পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে কিংবা সরকার কর্তৃক এতদুদ্দেশ্যে স্বীকৃত কোনো বেসরকারি হাসপাতালে সম্পন্ন করা যাইবে।'

বিলে অপরাধের শিকার ব্যক্তির পাশাপাশি 'অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির' মেডিকেল পরীক্ষা করার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩২ ধারার সঙ্গে ৩২ (ক) শিরোনামে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে বিলে। সেখানে বলা হয়েছে, 'এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির ধারা ৩২-এর অধীন মেডিকেল পরীক্ষা ছাড়াও উক্ত ব্যক্তির সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, ২০১৪ সালের ডিঅপিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইনের বিধান অনুযায়ী তার ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে।'

খসড়া আইনটির উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেন, 'সামাজিক উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের প্রাগ্রসরমান ধারা আজ বিশ্বব্যাপী নন্দিত ও প্রশংসিত। বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের ঊর্ধ্বগামী পরিক্রমণের মধ্যে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটন, সামাজিক গতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব রাখাসহ সার্বিক সামাজিক উন্নয়নের ধারাকে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এইরূপ হীন অপরাধ দমনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণার্থে দণ্ডারোপের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা গ্রহণ সময় ও পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় অত্যাবশ্যক।'

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বিল সংসদে: সামরিক সরকারের সময়ে প্রণীত মাদ্রাসা শিক্ষা অধ্যাদেশকে নতুন করে আইন করতে 'বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বিল-২০২০' সংসদে তোলা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি গতকাল বিলটি সংসদে উত্থাপন করলে এটি পরীক্ষা করে ৭ দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।

এত দিন ১৯৭৮ সালের অধ্যাদেশ অনুসারে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড চলছিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সামরিক শাসন আমলে প্রণীত যেসব আইন বা অধ্যাদেশের এখনও প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো পরিমার্জন করে বাংলায় রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

মাদক আইনের সংশোধনী বিল উত্থাপন: মাদক মামলার বিচারে ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান বাদ দিতে 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল-২০২০' সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিলটি সংসদে তুললে তা পরীক্ষা করে ৭ দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংশ্নিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।

মহানবীকে (সা.) নিয়ে ফ্রান্সে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের দাবি বিএনপি এমপির: মহানবী হজরত মুহাম্মদকে (সা.) অবমাননা করে ফ্রান্সের পত্রিকায় ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করায় সংসদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের দাবি করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ। রোববারের বিশেষ অধিবেশনের শুরুর দিনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এ দাবি করেন তিনি।

বিএনপি দলীয় এমপি হারুন বলেন, নবীকুল শিরোমণি মুহাম্মদ (সা.) আমাদের কাছে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। ঘটনাটি আমাদের হৃদয়ে চরমভাবে আঘাত করেছে। বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশ। অবশ্যই এ ব্যাপারে সংসদ থেকে একটি নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নিন্দা প্রস্তাব আনার জন্য সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আহ্বান জানাচ্ছি।