কোনো অনাগত দূরভবিষ্যে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যদি বঙ্গভাষাভাষী জনগোষ্ঠী লোপ পায় এবং তখনকার কোনো পুরাতাত্ত্বিক-ইতিহাসবিদ লিখিত প্রমাণাদির ভিত্তিতে বাঙালির ইতিহাস রচনা করতে বসেন, তো তাকে একটি কথা বলতেই হবে যে :১৯৭১ সালে এই জনগোষ্ঠীর ভিন্নরাষ্ট্রভুক্ত একটি অংশ নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েছিল এবং নিজেদের জন্য পৃথক একটি রাষ্ট্র গঠন করেছিল। বিশদ ব্যাখ্যার জন্য তাকে আরও বলতে হবে যে, বঙ্গভাষাভাষী এই জনগোষ্ঠী ধর্মের দিক থেকে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দিক থেকে ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-শূদ্র-বৈষ্ণব-শিয়া-সুন্নি-কাদিয়ানী-বাউল-হীনযানী-মহাযানী-ক্যাথলিক প্রোটেস্ট্যান্ট ইত্যাদি বহুপন্থি হওয়া সত্ত্বেও একটি সুসংবদ্ধ ভৌগোলিক সীমানার অধিবাসী ছিল, কিন্তু ইতিহাস-বিপর্যয়ের পরবর্তীকালে প্রধান দুটি ধর্মের ভিত্তিতে দেশটি দুটি পৃথক রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যায় এবং এই দ্বিখণ্ডিত অংশেরই একটি ভাগ ধর্মের প্রশ্নটিকে উপেক্ষা করে ভাষা ও সংস্কৃতির ঐক্যবন্ধনকে প্রাধান্য দিয়ে ঐ যুদ্ধে লড়েছিল। সংঘটিত ঘটনাবলির ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ করে তিনি এ কথা বলবেন, এমন নয়। শুধু প্রকাশের জন্যই তাকে আবেগহীন পক্ষপাতশূন্য ও নির্বিকল্প এই সত্য লিপিবদ্ধ করতে হবে।
সংক্ষেপে কথাটা এই দাঁড়ায় যে : [১] পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় বঙ্গভাষাভাষী জনসাধারণ ১৯৭১ সালে তাদের 'বাঙালি' জাতিসত্তাকে রক্ষা করার জন্য ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির শাসকচক্র ও তার আজ্ঞাবাহী তাঁবেদার স্বজাতীয়দের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জয়ী হয় এবং নিজেদের জাতিসত্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করে ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে; [২] জয়লাভের পর তারা নিজেদের রাষ্ট্রিক পরিচয়ের প্রশ্নে তদবধি প্রচলিত নাম 'পূর্ব পাকিস্তান' পরিত্যাগ করে সুপ্রাচীন ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারগত নাম 'বাংলাদেশ' গ্রহণ করে।
বিবেচনায় আনা প্রয়োজন, 'বাংলাদেশ' নাম গ্রহণ জরুরি ছিল না। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন এবং এই সেদিন পর্যন্ত উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম পৃথিবীর মানচিত্রে একই জাতিসত্তার দ্বিখণ্ডিত রাষ্ট্ররূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। পাকিস্তান নামধারী একটি রাষ্ট্রের দুটি অংশ পশ্চিম-পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধে বা অনৈক্যে বা বাদবিসংবাদে পূর্ব পাকিস্তানি জনগণ যদি পৃথক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেই বসে, তা হলে সে রাষ্ট্রের নাম পূর্ব পাকিস্তানই যদি বহাল থাকে, তবে নামে কিই-বা যায় আসে? কিছুই যে এসে যায় না তার প্রমাণ পূর্ববর্তী উদাহরণগুলো। তবু, সত্য ঘটনাটা এই যে, পূর্ব 'পাকিস্তান' নামটি সেই ভূখণ্ডের অধিবাসীরাই নাকচ করেছিল। শুধু ঘৃণা ও ক্রোধ নয়; কারণ এটাই যে, সে বুঝতে পেরেছিল তার পরিচয় 'পাকিস্তানি' নয়, তার পরিচয় 'বাঙালি'। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল বাঙালিরা, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল বাঙালিদের আবাসভূমি- যে ভূমি আবহমানকাল থেকেই 'বাংলা' নামে বিশ্বসভ্যতায় পরিচিত। ইতিহাসধারার এই অন্তর্নিহিত ফল্কগ্দুশক্তির বহিঃপ্রকাশ একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে ঘটেছিল বলেই বিজয়লাভের পরে নতুন রাষ্ট্রের নাম 'বাংলাদেশ' হওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। ঐ যুদ্ধ ছিল জাতিসত্তার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, শুধু ভৌগোলিক বা আঞ্চলিক স্বাধীনতার সংগ্রাম নয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি শক্তির মেরুকরণ প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল। একটি শক্তি বলছে যে, যে-ঐক্যচেতনায় ১৯৭১ সালে এদেশের জনগণ একতাবদ্ধ হয়ে ভিন্নভাষী এ বিজাতীয় শাসন-শোষণ ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাঙালিদের জন্য রাষ্ট্রিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, সেই চেতনাই দেশের ইতিহাসনির্ধারিত ভবিতব্য এবং অন্তর্নিহিত প্রাণবায়ু। আরেকটি শক্তি বলছে যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ঘটনা হিসেবে সত্য হলেও তা ইতিহাসের ভ্রান্তি এবং মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জনগোষ্ঠীর কোনো ঐক্যচেতনার ফসল নয়, বরং রাজনৈতিক চক্রান্তের সাময়িক বিজয় মাত্র, ফলে ঐতিহাসিক ত্রুটি সংশোধন করা দরকার। যারা এই কথা বলছে, তারা এই অর্থে সত্যনিষ্ঠ যে, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তারা পাকিস্তানি শত্রুশিবিরে যোগ দিয়েছিল এবং দেশ থেকে শত্রু বিতাড়িত হলেও ধারণার ও বিশ্বাসের জগতে তারা এখনও শত্রুশিবিরেরই বাসিন্দা। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে শত্রুশিবিরের অন্তর্গত করা নৈয়ায়িক দৃষ্টিকোণে কুতর্ক, পক্ষপাতমূলক, একদেশদর্শী ও যুক্তিহীন। অবস্থার এই ভিন্নতা অন্য এক যৌক্তিক সিদ্ধান্ত এগিয়ে দিচ্ছে এবং তা এই যে, একদা শত্রুশিবিরের সদস্যের বর্তমানে শত্রুহীন দেশে কোনো শিবিরভুক্ত থাকছে না, তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকেই সরাসরি শত্রু হিসেবে বিবেচনা করার যুক্তিসিদ্ধ অবস্থানে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। সেই যুক্তিসঙ্গত অধিকার তারা পেয়ে গেছে এ জন্যই যে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বী শক্তির মতো তাদেরও মাতৃভাষা বাংলা, এবং এই দেশেরই অধিবাসী তারা।
বাংলাদেশে এই মুহূর্তে এই দুই যুযুধান শক্তি পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এবং একই জন্মভূমির প্রাকৃতিক আবহাওয়া, সামাজিক পরিবেশ, ইতিহাসের উত্তরাধিকার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের লালনপালনে বর্ধিত হয়ে তারা একে অন্যকে 'জাতির শত্রু' রূপে চিহ্নিত করছে। আজকের সমাজবাস্তবতা এটাই। কিন্তু, যুক্তিশাস্ত্রে যার নূ্যনতম জ্ঞান আছে তিনিও মানবেন যে, পরস্পরবিরোধী দুটি বিষয় বা ঘটনা বা প্রত্যয় একই সঙ্গে যুগপৎভাবে 'সত্য' হতে পারে না, একটি 'সত্য' হলে অন্যটি 'মিথ্যা' হতে বাধ্য। 'জাতির শত্রু' তাই একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষীয় শক্তি এবং বিরুদ্ধ শক্তি- দুটোই হওয়া সম্ভব নয়। আমাদেরই দায়িত্ব শনাক্ত করার যে, এর মধ্যে জাতির শত্রু কে এবং মিত্রই-বা কে। মুক্তিযুদ্ধকে শত্রু-মিত্র যাচাইয়ের চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে মেনে নিলে বিচারের রায় মুহূর্তের মধ্যে বেরিয়ে আসে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অভ্যন্তরীণ যুক্তিপারস্পর্য ও অনিবার্যতা এবং সুফলের প্রশ্নে এক পক্ষ সন্দিহান ও অবিশ্বাসী বলেই, আমরা, নিরপেক্ষতার লক্ষ্যে, সেই তুলাদণ্ড গ্রহণ করব না। অথচ, বাঙালি জনগোষ্ঠী তার সহস্রাধিক বছরের ইতিহাসে এই একটি বারই মাত্র ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-বৃত্তি ও আর্থসামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকলে সম্মিলিতভাবে নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করেছে এবং তা লক্ষ লক্ষ প্রাণের মূল্যে এবং অশ্রু আর্তনাদ হাহাকার ও রক্তস্রোতের ভেতর দিয়ে যেতে-যেতে। বাস্তব ও প্রত্যক্ষ এই কষ্টিপাথরটি সঙ্গতভাবেই সত্য-মিথ্যা শনাক্তকরণের হাতিয়ার। একে পরিত্যাগ করছি বলেই এখন আমাদের অপ্রত্যক্ষ কিছু ধারণা বা কনসেপ্ট নিয়ে শাস্ত্রালোচনায় অবতীর্ণ হতে হবে।
ধারণাটি জাতিসত্তা ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে। আমরা, বাংলাদেশের বঙ্গভাষাভাষী জনগোষ্ঠী, কি একটি 'জাতি'?! 'জাতি' হলে এই জাতিসত্তার স্বরূপ কী? জাতিসত্তার গুণগত বৈশিষ্ট্যকে জাতীয়তাবাদ নামে শনাক্ত করলে বাঙালির জাতীয়তাবাদের চারিত্র্য কী? জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে সংস্কৃতির স্বরূপ এবং সংস্কৃতিকাঠামোতে মানুষজনের আচরিত ধর্মবিশ্বাসের অবস্থান ও ভূমিকা কী, কোথায় ও কতখানি? নির্মোহ দৃষ্টিতে ও মানবসভ্যতার ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে ইত্যাকার পরস্পরসম্পৃক্ত বিষয়াদি বিবেচনা বিচার-বিশ্নেষণ প্রয়োজন।
প্রয়োজন, কারণ 'বাঙালি' হওয়ার অর্থ যতদিন না আমাদের হৃদয় ও মেধায় স্পষ্ট স্বচ্ছ রূপ পরিগ্রহ করছে, ততদিন এই জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা ও অস্তিত্ব বিপন্ন হতে বাধ্য।
লেখক
শিক্ষাবিদ
প্রাবন্ধিক

বিষয় : বাঙালি জাতীয়তাবাদ

মন্তব্য করুন