অতি পুরাতন, বহু ব্যবহারে জীর্ণ একটা বিষয় বাঙালি নতুন বউয়ের টিকলির মতো রচনার শিরোপরে জুড়ে দিয়ে নির্বোধ মনে হচ্ছে নিজেকে। এ বিষয়ে নতুন আর কী বলার থাকতে পারে, যা অতীতে বলা হয়নি? নিতান্ত অপ্রয়োজনীয়ই বটে। তবু বিষয়ের সপক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে বলতে হয়- স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের পঞ্চাশ বছর পূর্তির বছরে নিশ্চয়ই স্মরণ করা চাই যে, ১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মার্চ রাতে যে বাঙালি সন্তানটি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন, তিনিও আজ জীবনের পঞ্চাশ বছর উদযাপন করছেন। তার পরিবারের তিনি জবরদস্ত অভিভাবক। সমাজ, দেশ ও জাতির কোনো না কোনো ক্ষেত্রে তিনি দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্য বিবেচনায়, পঞ্চাশ বছর আগের বাংলাদেশ- ভিন্ন নামের, পরশাসিত স্বদেশ। পিতৃপুরুষের দেশ কিন্তু তার স্বদেশ নয়। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ তার নিজের মাতৃভূমি। তিনি দুটি দেশের জাতীয় সংগীত স্বকণ্ঠে ধারণ করেননি। খাঁটি বাংলাদেশি বাঙালি তিনি। দেশের প্রশ্নে তিনি দ্বিধাহীন, অদ্বৈত চেতনায় বলীয়ান।
যাদের কথা বলা হলো এই প্রজন্ম এবং তাদের সন্তানদের প্রজন্ম- মোট পঞ্চাশটি প্রজন্মের চেতনায় তাদের সমৃদ্ধ অতীত সংস্কৃতির প্রজ্বলিত মশাল কেউ উঁচিয়ে ধরেনি হয়তো। এ দেশের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রণীত পাঠ্যপুস্তকের কোথাও সৎ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টি; মানবিকতা, আত্মার সঙ্গে সংস্কৃতির সম্বন্ধ, ব্যক্তিগত ও সামাজিক নৈতিকতা ইত্যাদি স্বতন্ত্রভাবে গুরুত্বের সঙ্গে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা আছে বলে জানা নেই। এমতাবস্থায় আমি রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি করে 'সেকেন্ড হোম' বাসিন্দা হলে দোষের তো কিছু নেই। সামাজিক যত সমস্যায় জাতি আজ জর্জরিত সেগুলোর উৎপত্তির কারণ- সৎ ও যোগ্যতম নাগরিকের যথার্থ কোনো মানদণ্ড শিক্ষা ব্যবস্থায় না থাকা। নেই ইতিহাসের ধারায় বহমান আমার সংস্কৃতি কীভাবে এ জাতিসত্তার বিকাশ ঘটিয়েছে তার খতিয়ানও। যে-ইতিহাস প্রবল অবজ্ঞেয় বিষয় জেনে ইতিহাসের শিক্ষক প্রচণ্ড অনীহা সত্ত্বেও পড়ান, তা রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট সন-তারিখের খতিয়ানমাত্র। মোগল যুগের ইতিহাসে দেশের উৎপাদক শ্রমজীবী মানুষ সম্পূূর্ণ অনুপস্থিত। অনুপস্থিত তাদের জীবন ও যাপনের সংগ্রামশীল জীবনের ইতিবৃত্ত। টোলের পাশেই বাঙালি সন্তানের বিদ্যাশিক্ষার জন্য ছিল মক্তব। উৎপাদনমুখী শিক্ষা নয়; ধর্মীয় শিক্ষার ভিন্ন সম্প্রদায়ের একটি অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান। মুসলিম শাসনের ৫৬২ বছরের ইতিহাসের কোথাও একটি জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয়ের নামোল্লেখ আছে- এই তথ্যটি জানা খুব প্রয়োজন। আকবর দ্য গ্রেটের শাসনামলে মানুষ যে জ্ঞান আহরণ করতেন, সে জ্ঞানই তাদের দুর্ভাগ্য ও পতনের কারণ হয়েছিল। এমতাবস্থায় জ্ঞানের উচ্চতর বিকাশ ঘটা অসম্ভব; উৎপাদনমুখী শিক্ষার বিস্তার অকল্পনীয়। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা মূর্খশিক্ষিত সমাজ গড়ার যে পদ্ধতি আবিস্কার করেছি, সে বিষয়ে সচেতন অভিভাবকমাত্রেই অবগত।
দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের বৈশ্বিক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিকদের মহারণক্ষেত্রে যুদ্ধজয়ের যোগ্য সৈনিক করে গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা দরকার। তার জন্য আত্মজ্ঞান অত্যাবশ্যক- সাংস্কৃতিক জ্ঞান ব্যতীত সেই আত্মজ্ঞানও অর্জন করা অসম্ভব। জাতির পিতার উক্তিটিই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করছি- 'রাগ কইরেন না', যথার্থ ভাবনা, চালচিত্র, চরিত্রকথা, সমস্যার কথা মসৃণ হতে পারে না, বরাবর তা খসখসে হয়ে থাকে। আমার কথা ছিল, আত্মজ্ঞানের উৎস সংস্কৃতি। জাতির যাবতীয় জ্ঞান, কর্ম, আচার-সংস্কার, ভাষা, উৎপাদন, ভাবজগতের অবয়ব, সাহিত্য-চিত্র-সংগীত-নৃত্য-নাট্য, স্থাপত্য, বয়ন, চয়ন, বিনির্মাণ, রুচিবোধ ইত্যাদি এবং চৌষট্টি কলার অভিব্যক্তিস্বরূপ যে-সংস্কৃতি তার কথা বলছি। কী ছিল তা সঠিকভাবে জানার পর কী হওয়া উচিত তাই বিনির্মাণের জাতীয় প্রচেষ্টা দরকার।
আমরা বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদই বাঙালির স্বাধিকার চেতনা স্বাধীনতার চেতনার উৎস। যেদিন সে এই সত্য ভুলে যাবে, বাঙালির জাতীয় জীবনে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় দুর্দিন। বাংলাদেশের বীজমন্ত্র সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ; বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির যে সমন্বয় সংস্রব বাংলা নামক ভূখণ্ডে হাজার বছর থেকে বহমান, তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ। এ-জাতীয়তাবাদ বাঙালির মাতৃভাষা আন্দোলনের চেতনাজাত। অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আর্যভাষী, গ্রিক, আরবি, পার্সিভাষী এবং পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি, ইংরেজি ইত্যাদি ভাষাভাষী জাতির মানুষের শ্রম ও ঘামের সঙ্গে সামান্য হলেও সম্পর্ক আছে এর। ভারত উপমহাদেশের সংস্কৃতির এক আঞ্চলিক রূপ এই বাঙালি সংস্কৃতি।
বাংলার আর্য-পূর্ব ইতিহাসের পাঠ তৎকালের নরতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব সংবলিত জ্ঞান নিশ্চয়ই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সহায়ক হতে পারে। অনুরূপ আর্য-পূর্ব সংস্কৃতি ও আর্য সংস্কৃতির মিথস্ট্ক্রিয়ার সার্বিক ফল বাংলার অধিবাসীদের জীবনে প্রগতির কোনো তরঙ্গাভিঘাত সৃষ্টি করেছিল সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক উপনিষদ ও তৎকালের অন্য সাংস্কৃতিক উপকরণ অধ্যয়নের মাধ্যমে, আমরা তা অবগত হতে পারব। যাযাবর আর্যভাষী স্থানীয় দ্রাবিড়, অস্ট্রিকভাষীদের সংস্রবে স্থায়ী বসবাসের ধারণা লাভের পর উৎপাদন ব্যবস্থা বেগবান হয়- কালপ্রবাহে তারাও কর্ষণজীবী জাতিতে পরিণত হয়। খুবই সংগত যে, কোনো জাতি বা গোষ্ঠী অন্য জাতি বা গোষ্ঠীর সংস্পর্শে দীর্ঘকাল বসবাস করলে উভয়ের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন অনিবার্য। হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীদের, অস্ট্রিক এবং দ্রাবিড়ভাষীদের কৃত্যাদি, লোকাচার, ব্যবহারিক সংস্কৃতি এবং আর্য জাতির সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটা ইতিহাসের ও বস্তুধর্মের অনিবার্য পরিণতি। কেবল আর্যভাষাই যে সংস্কৃত হয়েছিল, তা যথার্থ নয়। সংস্কৃত হয়েছিল জীবনের সামগ্রিক অভিব্যক্তিই। আর্যধর্মের সঙ্গে লোকায়ত ধর্মের অন্বিত রূপ 'বৌদ্ধধর্ম' ভিন্ন মানস সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল খ্রিষ্ট-পূর্বকালেই। কালপ্রবাহে বৌদ্ধধর্মও অখণ্ড অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারেনি। আর্যধর্ম প্রচণ্ড রক্ষণশীল ও বিধিনির্দিষ্ট হবার পরও বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত নানা শাখায় বিভিক্ত হয়ে কৃত্যাদি, লোকাচার, খাদ্যাখাদ্য সম্পর্কিত বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছে। বৌদ্ধধর্ম তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম প্রগতিশীল দর্শন হওয়া সত্ত্বেও মানুষের পার্থিব জীবন সম্বন্ধে প্রবল অনীহা, উৎপাদনবিমুখতা এবং কৃচ্ছ্র সাধনের কারণে অখণ্ড অস্তিত্ব রক্ষায় সক্ষম হয়নি। হীনযান, মহাযানে প্রথম বিভক্তির কারণে অনুসারীদের মধ্যে দু'ধরনের সাংস্কৃতিক আচরণ লক্ষ্য করা যায়। মহাযান > সহজযান > কালচক্র যান > তন্ত্রযান >মন্ত্রযান এবং সবশেষে নাথধর্মে স্থিত হয়। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায় সাংস্কৃতিক বিবেচনায় সংখ্যায় কম হলেও বাঙালি সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছে। সুতরাং তারাও হালের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের অবশ্যপাঠ্য। বিভিন্ন ধর্ম-দর্শন থেকে উৎকৃষ্ট উপাদান সমন্বয়ে নতুন একটি দর্শনের জন্ম হতেই পারে, যা বিশ্ববাসীর কাছে নিশ্চয়ই ভিন্নতর ও নবতর উৎপাদন। বাউলদের বাবরি চুল-দাড়ি কেটে দিলে কিংবা মসজিদ ভাঙলে, মন্দির-গির্জা পোড়ালেই নিজ ধর্মের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় না। অন্যান্য ধর্মের মতো 'বাউল' একটি দার্শনিক মতাদর্শ। তান্ত্রিক বৌদ্ধকায়াসাধন, নাথধর্ম, সুফিতত্ত্ব, বৈষ্ণবতত্ত্বের সমন্বয়ে বাউল দর্শনের উদ্ভব- এ কথা বিশেষজ্ঞের রচনা পাঠে জানা যায়। জনজীবন এসবের ভেতর দিয়েই প্রবাহিত। অতএব, আত্মপরিচয়ের জন্য অতীতকে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। চলুন নতুন সূচনার জন্য উৎসে ফিরি। ভারতে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠার পর গোটা ভারতবর্ষের সংস্কৃতি হাজার বছর পর আবার প্রবল এক সাংস্কৃতিক অভিঘাতে বিবর্তিত হয়। ১২০৩-১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দব্যাপী চলে তার প্রবাহ। সমাজপদ্ধতি, প্রশাসনিক, বিচার ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রভাষা, ভাবাদর্শ, যাবতীয় সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিতে অর্থাৎ জীবনাচরণের সকল ক্ষেত্রেই একটি সমান্তরাল স্বতন্ত্র ও পরিবর্তিত যাপনপ্রণালি দৃশ্যযোগ্য হলো। বহিরাগত মুসলমান ও ধর্মান্তরিত মুসলমানদের ব্যবহারিক জীবনে কিছু বৈপরীত্য ছিলই। তা সত্ত্বেও ইসলামধর্ম, হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্মানুসারীদের সাংস্কৃতিক জীবন সমান্তরাল ধারায় বইতে থাকে। শুরুতে কর্মজীবনে, সামাজিক জীবনে ভিন্ন তিনটি সংস্কৃতির ধারক-বাহকদের বহুক্ষেত্রেই সমন্বয় সাধন করতে হয়েছে। তুর্কি শাসনের প্রথম পর্যায়ের অমুসলিমদের ওপর নির্যাতনের কথা স্মরণ রেখেও বলা যায়- হয়তো সে সমন্বয় উদ্যোগ ছিল স্বতঃস্টম্ফূর্ত। ধর্মের সঙ্গে একালের মতো রাজনীতি মারণাস্ত্রে পরিণত হয়নি বলেই সংঘাত সৃষ্টি হয়নি। মুসলমান শাসকরা বহুক্ষেত্রেই ভারতীয় অমুসলিম সেনানায়ক, পণ্ডিত শাস্ত্রজ্ঞ, কবি, সংগীত সাধক, নৃত্যশিল্পীদের ওপর নির্ভর করেছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। উল্লিখিত ৫৬২ বছরের ইতিহাস অধ্যয়ন করলে নিশ্চয়ই এ-দেশ, জাতি, সংস্কৃতির বন্ধ্যতার কারণ পরিস্কার হয়ে যাবে। স্পষ্ট হবে- ইংরেজ শাসনের ১৯০ বছর কেন যতটুকু আলোর, ততটুকুই অন্ধকারের। সংস্কৃতির উৎসগুলো এর জন্য আবার একবার দেখে যাক-
যাপনের প্রয়োজনে সৃষ্ট উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে অন্তর্ব্যাপ্ত মানুষের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, প্রকৌশল। আর পুরাতন পাথর যুগের যৌথ শ্রম থেকে বিবর্তনের ধারায় কম্পিউটার, রোবট সংস্কৃতি পর্যন্ত মানুষের বিকাশ মূলতই তার সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বিকাশ। আর উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে পরিবর্তিত হয়েছে জীবনযাপন পদ্ধতি। যাপনের উপকরণ প্রযুক্তি-প্রকৌশলের সূক্ষ্ণত্বের সঙ্গে উৎকর্ষমণ্ডিত হয়েছে; অনায়াসসাধ্য হয়েছে যাপনপ্রণালি। পূর্বতন সমাজের ব্যবহারিক সংস্কৃতির মধ্য থেকে উৎকৃষ্টতম উপকরণগুলো ঐতিহ্য হিসেবে পরবর্তী ও পরিবর্তিত সমাজে টিকে যায়। নব্যকালের মানুষের চেতনা, যুগরুচি প্রয়োজন বিবেচনায় আবিস্কার-উদ্ভাবন ঐতিহ্যের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে প্রগতিশীল সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটায়। বাড়ির নকশার মতো, শাড়ির পাড়ের মতো, জামার কাটিংয়ের মতো ভাষার শব্দেও পরিবর্তন ঘটে। বদলে যায় অর্থ, জীবনের অর্থও বদলে যায়। দু'দিন আগে যা ছিল প্রগতিশীল তা আজ পুরাতন, স্থবির, অনুপযোগী। পুরোনো, বহু ব্যবহারে জীর্ণ-শীর্ণ বলেই নৈমিত্তিক ব্যবহার্য বস্তু বদলে ফেলার চিন্তা সক্রিয় হয়। জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পুরাতনকে নিয়ে থাকে পরিতৃপ্ত। নতুন তাদের চেতনায় ভয় সঞ্চার করে- তারা প্রতিক্রিয়াশীল। অন্য অংশ 'সুদূরের পিয়াসী'। তাদের হাতেই থাকে প্রগতির লাল ঝান্ডা। উৎপাদন করণকৌশল, স্থাপত্য, প্রকৌশল, প্রযুক্তি, পণ্যের ব্যবহারিক উপযোগিতা, নকশা, আকৃতি, স্থায়িত্ব ও গুণাবলিতে নতুন কালের উৎপন্ন পূর্ববর্তী সময়ের উৎপন্ন দ্রব্যকে চ্যালেঞ্জ জানায়। পরস্পরের দ্বন্দ্বে আবার নবচেতনার উন্মেষ ঘটে। জীবন বদলের পালা রচনার সংগ্রাম চলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে। সময় বদলায়, সংস্কৃতি বদলায়। মোহনা থেকে নদীর উৎসের মতোই সময়সাপেক্ষে সংস্কৃতির উৎগুলো ক্রমাগত দূরে সরে যেতে যেতে বিলয় বিন্দুতে পরিণত হয়। তাই উন্নততর উৎকৃষ্টতম সংস্কৃতিসম্পন্ন জাতির সংস্কৃতির উৎস হাজার হাজার বছর পরের প্রজন্মের কাছে অন্ধকারের নাভিকণ্ডে ঝনাৎ শব্দে গড়িয়ে পড়া সচল ধাতব মুদ্রাস্বরূপ।
পেশাভিত্তিক সমাজ বাংলায় প্রাচীনকাল থেকেই অস্তিত্বশীল- কেউ চাইলে চর্যাপদের জনজীবন, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গলের জনজীবন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। চণ্ডীমঙ্গলের নায়ক কালকেতু যে গুজরাট নগর পত্তন করে, সে নগরে একবার ঘুরে এলে পেশাজীবী সমাজের চেহারা ও পরিকল্পিত নগরসৌন্দর্য আপনার চেতনাজুড়ে থাকবে। গাজন উৎসব, নবান্ন, পৌষসংক্রান্তি, বৈশাখী মেলা, গ্রামীণ লোকোৎসব, লোকসংগীত, উপজাতীয় বিচিত্র উৎসব, সংস্কার, লোকাচার, বিবিধ প্রথা সংস্কৃতির হাজারো অনুষঙ্গ সম্বন্ধে আমাদের দু-দশজনেরই রয়েছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। সাঁতার জানলেও নদীতে নামার অভিজ্ঞতা নেই দিনমান লগিঠেলা নৌকায় চড়ে জনপদের পর জনপদ পাড়ি দেননি অনেকেই। লাগাম ধরে ঘোড়ার পাছায় চাবুক কষেননি কখনও। ষাঁড়ের লড়াই, ছুটন্ত ষাঁড়ের হিংস্রতা দেখেননি। দেখেননি তীক্ষষ্ট শিংয়ের গুঁতোয় রক্তাক্ত হতে। রাতছোঁয়া সন্ধ্যার নদীতে পাল খাটানো মহাজনি নৌকায় মাঝির বিরহী কণ্ঠের ভাটিয়ালির উদাস সুরে উজান দেশে রেখে আসা তার প্রিয়জনের ছবিটি মানসচক্ষে একবারও ভেসে ওঠেনি। নাড়ার আগুনে পুড়িয়ে মটরশুঁটি খাননি চৈত্রের দাউদাউ শূন্য মাঠে মধ্যদুপুরে। চর দখলের রক্তাক্ত দৃশ্যের বিপরীতে পেশিবহুল লাঠিয়ালের চৌকস কসরত দেখেননি লাঠিখেলার আসরে। শ্রাবণ কিংবা চৈতালি রাতের জোছনার প্রদীপে সোনাভান, হানিফা কয়রাপরীর রোমান্স-মধুর পুথির সুরেলা শিল্পিত পাঠ শোনেননি। একালের বাঙালির তাই শিকড় নেই।
আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব উদযাপনকালে রচনার শিরোনাম বিষয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আত্মপরিচয় সম্বন্ধে আমাদের চেতনায় এক ধরনের ঔদাসীন্য রয়েছে বংশের চতুর্থ পূর্বপুরুষের নাম আমাদের জানা নেই। অতীত সম্বন্ধে শ্রদ্ধাশীল প্রগতিবাদী যথার্থ পরিবর্তনকামীও বটে। আত্মশক্তির উৎস আত্মসংস্কৃতি। সেই বস্তুটির অভাব রয়েছে বলেই বাঙালি অন্য সংস্কৃতির প্রতি দ্রুত আকৃষ্ট হয়। বাজার থেকে ফুল কিনে এনে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করাই পৃথিবীর মানুষের রীতি। ঘরের একটা নিজস্বতা না থাকলে ফুলের সৌন্দর্য বিসদৃশ দেখায়। অন্য সংস্কৃতির যে অংশটি আমাদের সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত তাই গ্রাহ্য; সব নয়। 'কাট' অতঃপর 'পেস্ট' যে-সময়ের সংস্কৃতির একটি করণ-কৌশল, সেই কালে আত্মবিসর্জন নয়, আত্মসমৃদ্ধির প্রয়োজনেই আমরা আহরণ করব- এটাই নীতি হওয়া বাঞ্ছনীয়। অথচ আমরা তা না করে প্রবহমান সংস্কৃতির উৎকৃষ্ট অনেক উপাদান ইতোমধ্যে ত্যাগ করেছি। অবশ্যই তা আত্মঘাতী।
স্মরণ করুন 'স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী' ও 'জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ' উদযাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি। রূপপিয়াসী শিল্পসুধারসিক যে-কোনো বাঙালির মনের চোখে বর্ণোজ্জ্বল যে-অংশটি গাঁথা আছে; আশা করি, সেটি বাঙালির কসরতমূলক নাট্য 'লাঠিখেলা', ঢাকিদের রক্ত চনমন করা বিস্ময়কর তালের অভিব্যক্তি 'ঢাকের বাদ্যি'। যদি তাতে যুক্ত হতো মণিপুরি মৃদঙ্গের লীলানাট্য 'নটপালা', তবে তা অস্তিত্বে ভিন্নতর আলোড়ন, গর্জন তুলত অনায়াসে। সেতার, দোতারা, একতারা, বাঁশি; মণিপুরি, সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, টিপরা, গারো নৃত্য অভিন্ন মঞ্চসময়ের ফ্রেমে, অভিন্ন আখ্যানশরীরে সহজিয়া নিয়মে স্বভাবজ অভিব্যক্তিরূপে উপস্থাপিত হলে যথার্থ বাংলাদেশ তাতে মূর্ত হতো। হতো দ্বৈতাদ্বৈত বাংলাদেশ, বাঙালি সংস্কৃতির উপস্থাপনা। বাংলাদেশি যে-বাঙালির জন্ম ১৯৭১ সালে, তাদের অনেকেই সংস্কৃতির উল্লিখিত উপকরণগুলোর সঙ্গে খুব পরিচিত নন- এ কথা সত্য। চেতনার ভূমিজুড়ে দিনমান এসব প্রবাহিত হলে সেই উৎক্ষিপ্ত সৌন্দর্যের সাগর-তরঙ্গে তারাও যে বিরক্তি বোধ করতেন, তা কিন্তু নয়! পুরোনো কথা তাই তো নতুন করে বলা।

লেখক : শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক

বিষয় : বাংলার সংস্কৃতির উৎসগুলো

মন্তব্য করুন