ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

আন্দোলন-ভোট, জামায়াত নেতাদের দুটোতেই চোখ

আন্দোলন-ভোট, জামায়াত নেতাদের দুটোতেই চোখ

কামরুল হাসান

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারা দ্বাদশ জাতীয় সংসদের ভোটযুদ্ধে নামার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশাপাশি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে নামারও অঙ্ক কষছে তাঁরা। এ প্রেক্ষাপটে সারাদেশে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে ধর্মভিত্তিক এ দলটি।

সূত্র জানায়, বিএনপির সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যেও দলটির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের প্রস্তুতি রয়েছে জামায়াতের। একইসঙ্গে সংসদের ভোট নিয়ে দলটির নেতাদের মাথায় এবার নতুন চিন্তা। নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি আর হবে না জামায়াত।

জামায়াতে ইসলামী 'দাঁড়িপাল্লা' প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারায় ২০১৭ সালে। এরপর অনেক নির্বাচনেই জামায়াত নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়েছেন। স্থানীয় কিছু নির্বাচনে কোনো কোনো নেতা বিজয়ী হলেও শেষ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ভোটের লড়াইয়ে নেমে একটিতেও জয়ের দেখা পাননি।

এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১২০ আসনে ভোটের মাঠে থাকার প্রত্যয় নিয়ে এগোচ্ছেন জামায়াত নেতারা। 'বিএনপির দুর্গ' হিসেবে পরিচিত বগুড়ার সাত আসনের পাঁচটিতে এরই মধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। অন্য দুটিতেও নেতা বাছাইয়ের প্রস্তুতি চলছে। যশোরের পাঁচটি আসনেও প্রার্থী চূড়ান্ত। তবে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছে জামায়াত।

ভোটের প্রস্তুতি: সংসদীয় আসন টার্গেট করে দলের একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি তৈরি করেছে জামায়াত। পাঁচ সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মুহাম্মাদ ইজ্জত উল্লাহ। আরও রয়েছেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ ও ইয়াসিন আরাফাত।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের এক থানা আমির নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কেন্দ্র থেকে নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি জেলাকে চিঠি দিয়ে আসন এবং প্রার্থীদের নাম জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেসব এলাকায় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সেসব আসন টার্গেট করা হচ্ছে। বিষয়টি জামায়াতের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শেয়ার করছেন। প্রার্থীদের বিষয়ে জনমত তৈরিরও চেষ্টা করা হচ্ছে।

দলটির সূত্র জানায়, ১২০ আসনে লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বেশ কিছু প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দীন, বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) সাবেক এমপি শাহাদাতুজ্জামান, বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মাওলানা তায়েব আলী, বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান দবিবুর রহমান ও বগুড়া-৬ (সদর) বগুড়া শহর আমির ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবিদুর রহমান সোহেল।

যশোর-১ (শার্শা) কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আজীজুর রহমান, যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা আরশাদুল আলম, যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) অধ্যাপক গোলাম রসুল, যশোর-৫ (মনিরামপুর) গাজী এনামুল হক ও যশোর-৬ (কেশবপুর) অধ্যাপক মোক্তার আলী।

এছাড়া ঠাকুরগাঁও-২ আসনে আব্দুল হাকিম, দিনাজপুর-৪ (খানসামা-চিরিরবন্দর) মাওলানা আফতাব উদ্দিন মোল্লা, দিনাজপুর-৬ (নবাবগঞ্জ, বিরামপুর, হাকিমপুর এবং ঘোড়াঘাট) আনোয়ারুল ইসলাম, নীলফামারী-২ মনিরুজ্জামান মন্টু, নীলফামারী-৩ আজিজুল ইসলাম, রংপুর-৫ গোলাম রব্বানী, গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্যাপুর-পলাশবাড়ী) মাওলানা নজরুল ইসলাম, গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) ডা. আবদুর রহীম, জয়পুরহাট-১ (সদর-পাঁচবিবি) ডা. ফজলুর রহমান সাঈদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) ড. কেরামত আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ নুরুল ইসলাম বুলবুল, রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সিরাজগঞ্জ-৪ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালি) অধ্যক্ষ আলী আলম, পাবনা-১ ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, পাবনা-৫ ইকবাল হোসেন, পটুয়াখালী-২ ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, পিরোজপুর-১ শামীম সাঈদী, কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট-সদর দক্ষিণ-লালমাই) মোহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত, কুমিল্লা-১১ সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, ফেনী-৩ (সোনাগাজী-দাগনভুঞা) ডা. ফখরুদ্দিন মানিকসহ খুলনা, বাগেরহাট, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরার প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ঢাকা-১৫ আসনে দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচন করেছিলেন। আগামী নির্বাচনে দুটি আসনে ভোট করতে চান তিনি। তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জ হওয়ায় সেখানের একটি আসনের পাশাপাশি ঢাকা-১৫ আসনে নির্বাচন করবেন।

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া জামায়াত নেতা ও গুনাহার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ জানান, গত সোমবার কেন্দ্রীয় জামায়াতের পক্ষ থেকে বগুড়ার পাঁচটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি দুটি আসনেও প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি। তবে জামায়াত ঠিক কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে, আগামী নির্বাচনে প্রমাণিত হবে। আমি বলছি না, সব আসনে জিতে যাবে জামায়াত; তবে সব আসনে বিস্ময়কর ফল দেখবেন।

বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব :একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে তৈরি করা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মতো এবারও জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বিএনপি। এক্ষেত্রে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায়ে যুগপৎ আন্দোলনের কথা বলছে দলটি। অন্য দলগুলোও তাতে সায় দিয়েছে। বিএনপি ওই জাতীয় ঐক্য গঠনে প্রায় ৩০টি দলের সঙ্গে এরই মধ্যে বৈঠক করেছে। তবে দলটির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো বৈঠক হয়নি। এ বিষয়ে জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ রয়েছে।

জামায়াতের এক নেতা জানান, গত মার্চে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠক হয়। সেখানে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে দুই দলের খোলামেলা আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সব রাজনৈতিক দলের সংলাপ শেষে জামায়াতের সঙ্গেও বসবে বিএনপি। তবে দিন যত যাচ্ছে ততই ওই বৈঠকের বিষয়ে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। বিএনপির এ কৌশলকে জামায়াত নেতারা এড়িয়ে যাওয়ার ফন্দি মনে করছেন।

অন্যদিকে জামায়াত নেতাদের দাবি, ২০ দলীয় জোটের কার্যকারিতা এখনও রয়েছে কিনা তা খোলাসা করছে না জোটের শীর্ষ দল বিএনপি। জোট ভাঙছে না, আবার জোটকে সক্রিয়ও করা হচ্ছে না। জোটের শরিকদের সঙ্গে আলাদা-আলাদা বৈঠক করা হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের মতো এবারও বিএনপি শেষ পর্যন্ত তালগোল পাকিয়ে ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন জামায়াত নেতারা। তাঁদের এ শঙ্কা থেকে বিভিন্ন উপায়ে আন্দোলনের জন্য বিএনপিকে ২০ দলীয় জোটকে সক্রিয় করার কথা বলেছেন। তবে বিএনপি নেতারা তা কানে তোলেননি। এর মধ্যে জামায়াত নিয়ে বিএনপির অস্বস্তির কথা প্রকাশ পেয়েছে তাদের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্যে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াত নেতারা মনে করছেন, এভাবে আসলে একসঙ্গে পথচলা যায় না। তবে বিএনপি যতক্ষণ জোট ভাঙার ঘোষণা না দিচ্ছে ততক্ষণ তারাও জোটের শরিক আছেন বলে মনে করছেন। জোটের প্রধান শরিক যেভাবে আন্দোলনের ফর্মুলা বানাবে তাতেও তারা সায় দেবে। তবে নির্বাচনে তারা এক পথে হাঁটবে না। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনে তাদের দল নিবন্ধিত না থাকায় স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি তারা নিচ্ছে।

জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, জামায়াত সব সময়ই নির্বাচনমুখী ও গণতান্ত্রিক। ফলে নির্বাচনের প্রস্তুতি অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। তবে এ সরকারের অধীনে আমরা কোনো নির্বাচনে যাব না। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি। এ অন্দোলনকে সফল করার পর নির্বাচনের প্রসঙ্গটি আসবে।

২০ দলীয় জোটের বিষয়ে তিনি বলেন, জোট তো এখনও আছে। তাই তাঁরা এখনও এই জোটে আছেন। বিএনপির সঙ্গে তাঁদের আগের মতো সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি যোগ করেন।

আরও পড়ুন

×