আসছে ভোট: ঢাকা-২

বিএনপির ভরসা আমান তৎপর আরও পাঁচজন

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ

কামরুল হাসান ও মোহাম্মদ রায়হান খান

ঢাকা-২ (কেরানীগঞ্জ আংশিক-কামরাঙ্গীরচর-সাভার আংশিক) আসনে আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান একক প্রার্থী হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছেন। তবে ২০০৮ সালের মতো এবারও আইনি জটিলতায় ডাকসুর সাবেক এই ভিপি প্রার্থী হতে না পারলে তার ছেলে ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমি নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আরও কয়েকজন নেতা তৎপরতা চালাচ্ছেন। আসনটি পুনরুদ্ধারের জন্য বিএনপির নেতাকর্মীরা একাট্টা হয়ে মাঠে নেমেছেন।


২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন। এর আগে ২০০৮ সালে বিএনপির চারবারের এমপি আমানউল্লাহ আমান নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ায় প্রার্থী সংকটে পড়ে বিএনপি। ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২২ মাস কারাভোগের পর আমান প্রার্থী হতে না পারায় বিএনপি থেকে তুলনামূলক কম পরিচিত স্থানীয় নেতা অধ্যক্ষ অধ্যাপক মতিউর রহমানকে প্রার্থী করা হয়। 


তিনি অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলে আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়। 


আগামী নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আমানউল্লাহ আমানই এগিয়ে রয়েছেন। সর্বস্তরের নেতাকর্মীর কাছে তার মতো গ্রহণযোগ্য আর কোনো প্রার্থী বিএনপিতে নেই বললেই চলে। আমানকে ঘিরেই স্থানীয় বিএনপি রাজনীতি আবর্তিত হয়। তার কল্যাণেই এই এলাকা বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টুকে হারিয়ে অবিভক্ত কেরানীগঞ্জের এই আসনে প্রথমবারের মতো এমপি হন আমান। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একদলীয় নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে তিনি পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আমানের কাছে পরাজিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী নসরুল হামিদ বিপু। বিএনপি সরকার আমলে আমান স্বাস্থ্য (১৯৯১-৯৬) ও শ্রম (২০০১-০৬) প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। 


তাকে ঘিরেই আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন নেতাকর্মীরা। অবশ্য সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর এ আসনের ভোটের হিসাব-নিকাশ আগের থেকে জটিল হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। ঢাকা জেলার তিন থানার কয়েকটি ইউনিয়ন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তিন ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ আসনে নির্বাচনী কর্মকা পরিচালনা করাও জটিল। এ আসনের কেরানীগঞ্জ অংশটি একসময়কার বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন ভোটের হিসাবে কামরাঙ্গীরচর থানাই মূল ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় দুই লাখ ভোটার অধ্যুষিত কামরাঙ্গীরচর এলাকাটিতে আওয়ামী লীগের প্রভাব বেশি। যদিও কামরুল ইসলাম ও শাহীন আহমেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে আগামী নির্বাচনে বিএনপি সুবিধা পাবে বলে আশাবাদী দলটির নেতাকর্মীরা। 


এদিকে, তত্ত্বাবধায়ক ও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অসংখ্য মামলার আসামি হয়ে আইনি জটিলতায় আগামী নির্বাচনেও আমান অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারাতে পারেন বলে শঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আমানের স্থলাভিষিক্ত হবেন তার ছেলে ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমি। এর জন্য প্রস্তুতিও রয়েছে তার। যদিও সমর্থকদের আশা, নবম জাতীয় নির্বাচনের মতো জটিলতার মুখোমুখি এবার আমানকে হতে হবে না। 


আমান পরিবারের বাইরেও নির্বাচনী মাঠে তৎপর রয়েছেন বিএনপির ঢাকা জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল করিম পল, কামরাঙ্গীরচর থানা সভাপতি মনির হোসেন চেয়ারম্যান, তানাকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিল্পপতি মহিউদ্দিন মাহীন এবং প্রয়াত বিএনপি নেতা সাবেক এমপি নাসির উদ্দিন পিন্টুর ছোট ভাই হাজি রিয়াজ উদ্দিন মনি।


সম্ভাব্য এসব প্রার্থীর মধ্যে মনির হোসেন চেয়ারম্যান ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। সেবার অধ্যক্ষ মতিউর রহমান মনোনয়ন পেলে সরে দাঁড়ান তিনি। অন্যদিকে শিল্পপতি মহিউদ্দিন মাহিন ও অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত হাজি রিয়াজ উদ্দিন মনির সঙ্গে লন্ডনপ্রবাসী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুসম্পর্ক রয়েছে বলে এলাকায় গুঞ্জন আছে। 


আমানউল্লাহ আমান সমকালকে বলেছেন, কেরানীগঞ্জে জন্মগ্রহণ করায় এখানকার মানুষের সঙ্গে তার হৃদ্যতা রয়েছে। চারবার এমপি ও দুইবার মন্ত্রী থেকে এলাকায় অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। অন্যায়ভাবে ২০০৮ সালের নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলে এ আসনের মানুষ তাকে আশাহত করবেন না বলেই তার বিশ্বাস। এই আসনটিকে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে অভিহিত করে আমান বলেন, মাঠপর্যায়ে এখনও বিএনপি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সুষ্ঠু ভোট হলে আগামী নির্বাচনে এই আসনে আবার ধানের শীষের পতাকা উড়বে। 


মনির হোসেন চেয়ারম্যান বলেন, গণতান্ত্রিক ও সরকারবিরোধী সব আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। দলকে সুসংগঠিত করার পাশাপাশি নেতাকর্মীদের আগলে রেখেছেন। তাই আগামী নির্বাচনে তাকেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। 


মহিউদ্দিন মাহিন বলেন, জনগণের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন তিনি। জনগণ এখন দুর্নীতি-সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত এবং জনসম্পৃক্ত লোক চায়। এসব বিবেচনায় তিনিই দলীয় মনোনয়ন পাবেন বলে আশাবাদী। 


হাজি রিয়াজ উদ্দিন মনি অস্ট্রেলিয়া থেকে মোবাইল ফোনে বলেন, দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন তিনি। তাই দলীয় মনোনয়ন পেলে অবশ্যই বিজয়ী হবেন। 


রেজাউল করিম পল আগামী নির্বাচনে নিজের অবস্থান নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 


অন্যান্য প্রার্থী : এ আসনে মাঠে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রার্থী দলটির কেরানীগঞ্জ মডেল থানার সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মাওলানা জহিরুল ইসলাম। ২০০৮ সালের নির্বাচন ছাড়াও আরও কয়েকটি নির্বাচনে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন এ দলটি অংশ নিয়েছে। হাফেজ মাওলানা জহিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, তাকে দলীয়ভাবে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হতে বলা হয়েছে। কেরানীগঞ্জে দলটি খুবই শক্তিশালী, অনেক ভোটার রয়েছে। 


এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জিনজিরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়ারেশ উদ্দিনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তিনি ঢাকা-২ ছাড়াও ঢাকা-৩ আসন থেকেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচনী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। ওয়ারেশ উদ্দিন বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে মানুষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে বর্জন করবে। তারা স্বতন্ত্র ও ভালো প্রার্থী খুঁজছেন। এই অবস্থায় তিনি নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়ায় ব্যাপক সাড়া মিলেছে।