আ'লীগের মনোনয়ন চান সাঈদ খোকন জালাল ও মুরাদ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

অমরেশ রায়

তফসিল ঘোষণা না হলেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ মাঠে নেমে পড়েছেন। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা তুলনামূলক বেশি। মেয়র পদের দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীরা প্রকাশ্যে প্রচারে না নামলেও ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে সম্ভাব্য প্রার্থী অনেকেই বিভিন্ন উপলক্ষে পোস্টার ও ব্যানারে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা

জানাচ্ছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদানের পাশাপাশি গণসংযোগের মাধ্যমে এলাকাবাসীর মধ্যে নিজেদের প্রার্থিতার কথা জানান দিতে শুরু করেছেন। দলের মনোনয়ন পেতে তদবিরও শুরু করেছেন কেউ কেউ।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণে মনোনয়ন দৌড়ে বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনের পাশাপাশি আছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি সাবেক এমপি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ।

অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দু'ভাগে বিভক্ত করার পর ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচন একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনও হয়। ওই নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ২ লাখ ৪১ হাজার ৫ ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন।

অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ খোকন ইলিশ প্রতীকে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৬ ভোট এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস মগ প্রতীকে ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৯ ভোট পান। যদিও বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস একাধিক মামলার আসামি হয়ে পলাতক থাকায় তার পক্ষে তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস ভোটের মাঠে ছিলেন। দুপুরের আগেই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণাও দেন আফরোজা আব্বাস ও বিএনপি নেতারা।

আগামী নির্বাচনে বর্তমান মেয়র ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য মোহাম্মদ সাঈদ খোকন আবারও দলের মনোনয়ন চাইবেন। তার সঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আরও দু'জন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তারা হচ্ছেন ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এবং শাহে আলম মুরাদ। দলীয় মনোনয়ন পেতে আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে না নামলেও তারা দু'জনই দলের শীর্ষমহলের নজরে আসার চেষ্টা করছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে প্রায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনকালে অনেকটাই সাফল্য দেখিয়েছেন মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফের ছেলে সাঈদ খোকন নগরবাসীর কল্যাণে নানা পদক্ষেপ নিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তার নেওয়া উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ সিটির ৯০ ভাগ রাস্তাঘাটকে সংস্কারের মাধ্যমে চলাচলের উপযোগী করা এবং রাস্তাঘাটে স্বচ্ছ এলইডি লাইট স্থাপনের মাধ্যমে 'আলোকিত নগর' বাস্তবায়ন। এর ফলে চুরি-ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধ করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো সম্ভব হয়েছে। গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ছয়টি কোম্পানির মাধ্যমে পরিবহন সর্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি, যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে ধানমণ্ডি থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত মডেল বিআরটিএর আওতায় বিআরটিসি বাস এবং বিভিন্ন এলাকায় চক্রাকার বাস সার্ভিসও চালু হয়েছে।

বর্তমান মেয়র বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের মাধ্যমে নগরীর পরিচ্ছন্নতা রক্ষা, বিশেষ করে কোরবানির বর্জ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশংসা কুড়িয়েছেন। গত বছরের ১৩ এপ্রিল তার উদ্যোগে আয়োজিত 'পরিচ্ছন্ন ঢাকা' কর্মসূচিতে একসঙ্গে ১৫ হাজার ৩১৩ জন মানুষ রাস্তা পরিস্কার করায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নাম গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে উঠেছে। 'জলসবুজে ঢাকা' প্রকল্পের আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির সব পার্ক ও খেলার মাঠ আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন সাঈদ খোকন। ইতিমধ্যে অনেক পার্ক ও খেলার মাঠ আধুনিকায়ন শেষ হয়েছে, বাকিগুলো তার মেয়াদকালেই আধুনিকরূপে গড়ে তোলা যাবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এছাড়া নগরীর সব অবৈধ বিলবোর্ড ও ব্যানার-ফেস্টুন উচ্ছেদ করে ডিজিটাল বিলবোর্ড স্থাপন, রাস্তাঘাটে ময়লা-আবর্জনা ফেলার 'ওয়েস্ট বিন' বসানো, শান্তিনগর ও মালিবাগ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন, ভেজাল খাদ্য রোধে নিয়মিত ভেজালবিরোধী অভিযান এবং সিটি করপোরেশন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাজিরা ডিজিটালাইজড করে দুর্নীতি রোধের পদক্ষেপ তার সময়েই ঘটেছে।

অবশ্য এই সময়ে কিছু কার্যক্রমে সমালোচনার মুখেও পড়েছেন সাঈদ খোকন। বিশেষ করে সম্প্রতি ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তার ব্যর্থতা জনমনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। আবার নগর দক্ষিণ অংশের কিছু এলাকা বিশেষ করে গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করতে গিয়েও বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।

আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে মোহাম্মদ সাঈদ খোকন সমকালকে বলেছেন, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে দলের কাছে আবারও মনোনয়ন চাইবেন তিনি। তবে নির্বাচনের যেহেতু অনেকটা সময় বাকি আছে, সেহেতু এখনই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না তিনি।

ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদে আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন একজন স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগের সাবেক এই স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসনের এমপি নির্বাচিত হন। তবে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় নির্বাচনে নিজ দলের বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাজী মোহাম্মদ সেলিমের কাছে হেরে যান। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চেয়েও পাননি। এর আগে ১৯৮৬ ও ১৯৯১-এর নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন তিনি। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জালাল বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও ছিলেন। পর্যায়ক্রমে দলের কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার সম্পাদক এবং স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তবে ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী বিতর্কিত ভূমিকার কারণে ২০০৯ সালের জাতীয় সম্মেলনে দলীয় পদ হারান। ২০১২ ও ২০১৬ সালের জাতীয় সম্মেলনেও কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাননি তিনি। তবে ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেলের হয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন চিকিৎসক এই নেতা।

ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন তিনি। মনোনয়ন পেলে নির্বাচনও করবেন। তবে সব সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর। প্রধানমন্ত্রী যাকে ভালো মনে করবেন, তাকেই প্রার্থী করবেন। আর দলীয় মনোনয়ন না পেলেও শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত মেনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করবেন তিনি।

ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা আওয়ামী রাজনীতির আরেক পরিচিত মুখ শাহে আল মুরাদও ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী। অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিএনপি-জামায়াত সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা গ্রেফতার হওয়ার পর তার মুক্তি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মুরাদ। এ কারণে দলের মহানগর কমিটি পুনর্গঠনকালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ অংশের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাকেই বেছে নিয়েছেন দলীয় নীতিনির্ধারকরা। অবশ্য দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে মেয়র সাঈদ খোকন ও তার সমর্থকসহ নগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়ানোর কারণে কিছুটা সমালোচনার মুখেও পড়েন তিনি। নগরীর রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার এবং নগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সৃষ্ট এই দ্বন্দ্বের জের ধরে দু'পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘাত-সংঘর্ষসহ অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। তবে গত জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সমঝোতা বৈঠকের মাধ্যমে দুই পক্ষকে মিলিয়ে দিয়েছেন।

শাহে আলম মুরাদ বলেন, তার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। নেত্রী (শেখ হাসিনা) ও দলের নীতিনির্ধারণী মহল ভালো মনে করলে তাকে যে দায়িত্ব দেবেন, সেটাই সর্বাত্মকভাবে পালনের চেষ্টা করবেন তিনি।