ছাত্রদলের কাউন্সিল

হোঁচট খেলেও আশা ছাড়েনি বিএনপি

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

কামরুল হাসান

ছাত্রদলের কাউন্সিলে আদালতের অস্থায়ী স্থগিতাদেশে হতভম্ব পুরো বিএনপি। সহযোগী ছাত্র সংগঠনটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করার প্রথম উদ্যোগেই হোঁচট খেতে হয়েছে অভিভাবক দলটিকে। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও চলছে। ছাত্রদলের কাউন্সিল-সংশ্নিষ্ট বিএনপির শীর্ষ নেতারা আশা করছেন, আইনি লড়াই হবে। আদালতের রায়ের মাধ্যমেই কাউন্সিল সফল হবে।

অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে দীর্ঘ ২৭ বছর পর ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিল ও কেন্দ্রীয় নেতা নির্বাচনের বিষয়টি একেবারে হাতে ধরেই এগিয়ে নিচ্ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। গত ৩ জুন ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দিয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু করে বিএনপির হাইকমান্ড। গঠন করা হয় তিনটি কমিটি। এর মধ্যে নির্বাচন পরিচালনার জন্য ছাত্রদলের সাবেক নেতা খায়রুল কবির খোকনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি, ফজলুল হক মিলনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি এবং শামসুজ্জামান দুদুর নেতৃত্বে তিন সদস্যের আপিল কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই শেষে আপিল কমিটির চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা শেষে প্রার্থীদের প্রচারণাও গত বৃহস্পতিবার শেষ করা হয়। ভোটাভুটিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সারাদেশের ১১৭ ইউনিটের উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মীরা ঢাকায়  আসেন। শনিবার হওয়ার কথা ছিল সেই কাঙ্ক্ষিত কাউন্সিল। এদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সারাদেশের ৫৩৩ ভোটার তাদের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্ধারণ করতেন। কেন্দ্রীয় সভাপতি পদে ৯ জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ১৯ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তবে ভোটের দু'দিন আগে মামলার কারণে তাদের সেই উৎসবে ভাটা পড়ে।

বিলুপ্ত কমিটির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান কাউন্সিলের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের ওপর স্থগিতাদেশ দেন ঢাকা জেলা জজকোর্টের ৪ নম্বর আদালত। আদালতের স্থগিতাদেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের দশজনকে সাত দিনের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।

এ ঘটনায় কাউন্সিলের অনিশ্চয়তায় হতাশ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। আদালতের স্থগিতাদেশের ঘটনাকে সরকারের কারসাজি হিসেবে বিএনপি অভিযোগ করলেও দলের অভ্যন্তরীণ সংকটকেও দোষারোপ করছেন অনেকে। বিএনপির পক্ষ থেকে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও বেশিরভাগ নেতাকর্মী কাউন্সিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকারে। তাদের আশঙ্কা- যেহেতু আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা শুরু হয়েছে, সেহেতু এটা খুব সহজে এর নিষ্পত্তি হবে না। আর হলেও কাউন্সিলের প্রক্রিয়া আবারও শুরু করতে হতে পারে। এক্ষেত্রে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে তাদের মাধ্যমেই কাউন্সিল কার্যক্রম সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ফলে কাউন্সিল আরও কয়েক মাস পিছিয়ে যেতে পারে।

নেতাকর্মীদের মধ্যে এমন হতাশা থাকলেও আশাবাদী বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা রোববার (আজ) উচ্চ আদালতে যাবেন। স্থগিতাদেশ উঠে গেলে খুব শিগগিরই কাউন্সিল হবে। প্রার্থী ও ভোটার তালিকা চূড়ান্ত আছে, ভোটগ্রহণই কেবল বাকি। ফলে কাউন্সিল সম্পন্ন করতে অসুবিধা হবে না।

ছাত্রদলের সাবেক নেতা ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, তারা আদালতে যাবেন। এটা সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্থগিতাদেশের বিষয়টি ফয়সালা হলেই কাউন্সিলের দিন-তারিখ হয়ে যাবে।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ- ছাত্রদলের সংক্ষুব্ধ একটি অংশ কাউন্সিলের বিরোধিতা করে আদালতে যেতে পারে বলে শঙ্কা থাকলেও বিএনপির হাইকমান্ড তেমন সতর্ক ছিলেন না। ছাত্রদলের বিভিন্ন বলয়ভিত্তিক কোন্দল নিরসন করারও কোনো উদ্যোগ ছিল না। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। নির্বাচন পরিচালনাকারী সিনিয়র নেতারা এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেননি বলে তৃতীয় কোনো পক্ষ তার সুযোগ নিয়েছে।

নেতাকর্মীরা জানান, কাউন্সিল স্থগিত চেয়ে আবেদনকারী আমানউল্লাহ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা হলেও গত পাঁচ বছর নিষ্ফ্ক্রিয় ছিলেন। তাকে তেমন কেউ চেনেনও না। এবার কাউন্সিলে কোনো পদে প্রার্থিতার জন্য মনোনয়ন ফরমও সংগ্রহ করেননি কুমিল্লার বাসিন্দা এই ছাত্রদল নেতা।

কাউন্সিল স্থগিতের পর আমানউল্লাহ আমানকে নিয়েও দলের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে। তিনি কোন গ্রুপের রাজনীতি করতেন, কার ছত্রছায়ায় ছিলেন, কার ইন্ধনে মামলা করা হয়েছে- তা নিয়ে চলছে দোষারোপের রাজনীতি। এক পক্ষ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর দিকে আঙুল তুলছে, আরেক অংশ সাবেক সভাপতি আব্দুল কাদির ভুইয়া জুয়েলের দিকে ইঙ্গিত করছে। এর মধ্যে টুকু গ্রুপের নেতা সাবেক বৃত্তি ও ছাত্রকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ এবার সভাপতি পদে হেভিওয়েট প্রার্থী। ভোটের মাঠে তাকে দমানোর জন্যই আমানকে দিয়ে এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। আবার জুয়েলের পছন্দের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ায় তার দিকে দোষারোপের তীর ছুড়ে রহস্যকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। তারা বলেন, মূলত আমানউল্লাহ আমান কোনো গ্রুপেই সরাসরি সক্রিয় ছিলেন না। গ্রুপের মধ্যম সারির নেতাদের সঙ্গে সেলফি তুলে ফেসবুকে দেওয়া পর্যন্ত ছিল তার রাজনীতি।

নেতাকর্মীরা বলেন, আদালতে মামলা করার পর থেকেই লাপাত্তা আমান উল্লাহ। তার ব্যবহূত মোবাইল নাম্বারটিও বন্ধ রয়েছে। ফলে মামলার কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কেউ কিছু জানতে পারছেন না। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজনের নাম্বারও বন্ধ পাওয়া গেছে। এ কারণে অনেকে তৃতীয় পক্ষের বিষয়ে সন্দেহ করছেন।