দুই জোটের শরিকরা কেমন আছে -৮

সিদ্ধান্তহীনতায় জামায়াত

নতুন দল নাকি পুরনো ধারা, কমিটিতে মতপার্থক্য

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

রাজীব আহাম্মদ

নতুন নামে দল গঠন নাকি পুরনো ধারা অব্যাহত থাকবে- সাত মাসেও এ সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি যুদ্ধাপরাধের বিচারে কোণঠাসা জামায়াতে ইসলামী। নতুন দল গঠনে জামায়াত যে কমিটি করেছিল, তাদের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে। এ মতপার্থক্যের মধ্যেই শেষ হতে চলেছে জামায়াতের বর্তমান কমিটির মেয়াদ। শোনা যাচ্ছে, দলের আমির মকবুল আহমাদ দায়িত্ব ছাড়তে পারেন। জামায়াতের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ও বিভিন্ন সূত্র সমকালকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও নতুন নামে দল গঠনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটির প্রধান ডা. শফিকুর রহমান সমকালকে বলেছেন, 'যথাসময়েই এ ব্যাপারে জানতে পারবেন।' নতুন  দল উদারপন্থি হবে নাকি জামায়াতের বর্তমান নীতি-আদর্শে চলবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এ বিষয় যথাসময়ে মিডিয়াসহ দেশবাসীকে অবহিত করা হবে ইনশাআল্লাহ।' মকবুল আহমাদের আমির পদ ছাড়ার গুঞ্জন সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

দলে সংস্কার এবং একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে প্রস্তাব দিয়ে সাড়া না পেয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের পদ ছাড়েন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। এরপর তার সমর্থক হিসেবে পরিচিত মজলিশে শূরার সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জুকে বহিস্কার করা হয়। এ নিয়ে তুমুল আলোচনার মধ্যে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দলের নেতাকর্মীদের চিঠি দিয়ে জামায়াত নেতৃত্ব জানিয়েছিল, নতুন নামে দল গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডা. শফিকুর এ প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে সরাসরি জবাব না দিলেও দলটির একাধিক নেতা সমকালকে জানিয়েছেন, নতুন দল গঠনের উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়েছে। আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগ করার পর জামায়াত ভাঙনের মুখে ছিল। সংস্কারপন্থিরা তার সঙ্গে যোগ দেবেন- এমন ধারণা থেকে পরিবর্তনপ্রত্যাশীদের শান্ত রাখতে নতুন নামে দল গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

তারা বলেছেন, সাত মাসেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়া প্রমাণ করে জামায়াত নেতৃত্ব নতুন নামে দল গঠনে আগ্রহী নয়। একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ারও পরিকল্পনা নেই তাদের। জামায়াত নিষিদ্ধ না হলে নতুন দল গঠন হবে না। নিষিদ্ধ হলে, নতুন দল হবে। কিন্তু তা হবে জামায়াতের আদলে ও আদর্শে।

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক সমকালকে একাধিকবার জানিয়েছেন, তার প্রস্তাব ছিল জামায়াতের বিদ্যমান কাঠামোতে পরিবর্তন আনা। সব ধর্ম, শ্রেণি, পেশার মানুষের জন্য দলকে উন্মুক্ত করা। দলে নারীদের যেন কার্যকর অংশগ্রহণ থাকে। জামায়াত একাত্তরে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে যে ভুল করেছে, তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। এসব প্রস্তাব জামায়াত ১৯ বছরেও গ্রহণ না করায় দল ছাড়েন আবদুর রাজ্জাক। তিনি সমকালকে বলেছেন, সাবেক দল জামায়াত নিয়ে তিনি আর কথা বলতে চান না।

জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, নতুন দল গঠনে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ কমিটির মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান জামায়াতের রক্ষণশীল নীতিতে পরিবর্তন আনতে চান না। দলটির নির্বাহী পরিষদের সদস্যদের একটি বড় অংশ তাদের পক্ষে।

নির্বাহী পরিষদ সদস্য মুহম্মদ সেলিম উদ্দিন সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি হওয়া জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর একটি লেখা পোস্ট করেন। এ লেখার সারমর্ম হচ্ছে, অতীতে যেসব ধর্মভিত্তিক দল সমাজের সব শ্রেণির গ্রহণযোগ্যতা পেতে রক্ষণশীল অবস্থান থেকে সরে এসেছে, তারা রাজনীতি থেকে হারিয়ে গেছে। জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, সেলিম উদ্দিনের মতোই নির্বাহী পরিষদের ২১ সদস্যের অন্তত ১৫ জন সংস্কারের বিরোধী। নিজামীর লেখা প্রচার করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সংস্কারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছেন তারা।

জামায়াতের একাধিক নেতা জানান, ফেব্রুয়ারিতে নতুন নামে দল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হলেও তার সাংগঠনিক কাঠামো ও আদর্শিক অবস্থান চূড়ান্ত করতে পারেনি কমিটি। জামায়াতের সঙ্গে নতুন দলের সম্পর্ক কী হবে তাও নির্ধারণ করতে পারেনি। সংস্কারপন্থিরা চান, নতুন দল জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। আদর্শিক সম্পর্ক থাকলেও স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে থাকবে। নতুন দল ধর্মভিত্তিক হবে না। যারা জামায়াতের পদে রয়েছেন, তারা নতুন দলে থাকবেন না। তবে জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকাকে সঠিক মনে করা কট্টরপন্থিরা চান, নতুন দল হলে তা হবে জামায়াতের রাজনৈতিক শাখা মাত্র। যারা জামায়াতের পদে রয়েছেন, তারাই থাকবেন নতুন দলের নিয়ন্ত্রণে। কমিটির সদস্য ও জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের সম্প্রতি সমকালকে বলেছেন, অগ্রগতি হচ্ছে। আলোচনা চলছে। তবে নতুন দলের নাম, কর্মপন্থা-কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

জামায়াত থেকে বহিস্কার হওয়ার পর নতুন দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু। 'জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ' ব্যানারে তিনি ও তার অনুসারীরা বিভিন্ন জেলায় মতবিনিময় সভা করেছেন। এতে জামায়াতের 'বড় নেতারা' শামিল না হলেও, তৃণমূলের সংস্কারপন্থি নেতাকর্মীরা অংশ নিয়েছেন। দলের নেতাদের মঞ্জুর সংগঠন থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে জামায়াত। তবে শফিকুর রহমান বলেছেন, 'জামায়াতে সংস্কারপন্থি বলতে কিছু নেই। অতএব কাউকে ঠেকানোর প্রশ্নই আসে না।'

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন মঞ্জু। সেখান থেকে তিনি জানিয়েছেন, দল গঠনের কাজ এগিয়ে চলেছে। যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তার দেখা হতে পারে। আবদুর রাজ্জাককে দলের নেতৃত্ব গ্রহণে অনুরোধ করবেন কি-না- এ প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি। তবে আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, আর রাজনীতিতে ফিরবেন না তিনি।

নিজামী গ্রেফতার হওয়ার পর ২০১০ সালে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির হন মকবুল আহমাদ। ২০১৬ সালের অক্টোবরে তিনি নির্বাচিত আমির হিসেবে দায়িত্ব নেন। শফিকুর রহমান বলেছেন, আমির নির্বাচন এ বছরই হবে। নির্বাচন এখনও শুরু হয়নি। তবে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক প্রক্রিয়া চলছে।

নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও এবার জামায়াতের কাউন্সিল হচ্ছে না। একাদশ নির্বাচনের পর থেকে প্রকাশ্য রাজনীতিতে নেই জামায়াত। অবশ্য ডা. শফিকুরের দাবি, জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে আছে এবং থাকবে। সরকার শুধু জামায়াত নয়, অন্যান্য বিরোধী দলকেও কোণঠাসা করে রেখেছে। তারপরও জামায়াত মূলধারার রাজনীতিতে অটল।

ভোটের পর থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের অনুষ্ঠানেও দেখা যায়নি জামায়াতকে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বাকি শরিকরা গেলেও জামায়াত ছিল গরহাজির। তবে শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াত ২০ দলীয় জোটে আছে এবং থাকবে। বিএনপির অনুষ্ঠানে যাওয়া না যাওয়ার সঙ্গে জোটের সম্পর্ক নেই।