দুই জোটের শরিকরা কেমন আছে -৯

'অবমূল্যায়ন' ও 'অবহেলা'য় ক্ষোভ ১৪ দলে

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

অমরেশ রায়

'একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠনের' লক্ষ্যে জোট গড়লেও সব ক্ষেত্রে সেটা মানা হয়নি বলে মনে করছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বেশির ভাগ শরিক। এসব দলের মতে, বিশেষ করে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর গঠিত সরকারে শরিকদের ঠাঁই না দিয়ে উল্টো তাদের নানাভাবে 'অবহেলা' ও 'অবমূল্যায়ন' করা হয়েছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের এই 'একলা চলো' নীতি ও শরিকদের প্রতি 'উপেক্ষায়' জোটের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জোটের কার্যক্রমেও স্থবিরতা নেমে আসছে।

দু-একটি শরিক দল অবশ্য এই মতের বিরুদ্ধে। সরকারের প্রতি 'নিঃশর্ত সমর্থন নীতি'তে বিশ্বাসী এসব দল মনে করে, ১৪ দল একটি আদর্শিক জোট, যার লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা করা। মন্ত্রিত্ব পাওয়া কিংবা আসন ভাগাভাগির জন্য নয়- আদর্শের প্রশ্নে জোটে যুক্ত হয়েছে তারা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত ১৪ দলের প্রাসঙ্গিকতা থাকবে। তাই এই জোটকে তারা সহযোগিতাও করবে।

নামে '১৪ দল', শরিক ১৩টি :বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের লক্ষ্যে নিয়ে ২০০৩ সালের শেষভাগ থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাম প্রগতিশীল দলগুলোর সমন্বয়ে জোট গঠনের প্রচেষ্টা শুরু হয়। বেশ কিছুদিন আন্দোলনের যুগপৎ কর্মসূচি পালনের পর ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ২৩ দফার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ, ১১ দল, জাসদ ও ন্যাপকে নিয়ে ১৪ দলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। অবশ্য সে সময় বাম গণতান্ত্রিক দলগুলোর জোট ১১ দলের চার শরিক সিপিবি, বাসদ (খালেকুজ্জামান), বাসদ (মাহবুব) ও শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল এ জোটে যুক্ত হয়নি। এসব কারণে শুরুতেই ১৪ দলের শরিক সংখ্যা আসলে ১০টি ছিল। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ড. কামাল হোসেনের 'বিতর্কিত ভূমিকা' ইস্যুতে গণফোরামকে জোট থেকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে শরিক দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯টিতে।

এদিকে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আরও তিনটি দল জাতীয় পার্টি-জেপি, তরীকত ফেডারেশন এবং বাসদ (মাহবুব) থেকে বেরিয়ে আসা একটি ক্ষুদ্রাংশ বাসদ (রেজাউর) ১৪ দলে যুক্ত হয়। ২০১৬ সালে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ভেঙে গঠিত আলাদা দল বংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ) ১৪ দলে থেকে যাওয়ায় বর্তমানে শরিক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩টিতে।

১৪ দল শরিকদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ছাড়াও পাঁচটি দল ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বাংলাদেশ জাসদ, জাতীয় পার্টি-জেপি এবং তরীকত ফেডারেশনের সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন রয়েছে আওয়ামী লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, ন্যাপ, জাতীয় পার্টি-জেপি, তরীকত ফেডারেশন, গণতন্ত্রী পার্টি এবং সাম্যবাদী দলের। বাকি পাঁচ দল বাংলাদেশ জাসদ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি এবং বাসদ (রেজাউর)-এর নিবন্ধন নেই।

ক্ষুব্ধ বেশির ভাগ শরিক : টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনকালে ১৪ দলের কোনো শরিককে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি; বরং সরকারি দলের 'বৈরী আচরণে' বেশির ভাগ শরিক দলই অসন্তুষ্ট। রাজনীতির মাঠে কিছুটা অবস্থান আছে, এমন শরিক দলগুলো অবশ্য সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে কয়েকটি আসনে ছাড় পেয়েছে। তা ছাড়া এর সুবাদে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি কিংবা সদস্য পদ দিয়ে এসব দলের এমপিদের কিছুটা হলেও 'মর্যাদা' দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু বেশির ভাগ দলই টানা তৃতীয়বারের মতো সংসদের আসনপ্রাপ্তি থেকেও বঞ্চিত। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ের পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিজয় সমাবেশে শরিকদের ডাকাও হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে মাঝেমধ্যে কিছু কর্মসূচি পালন করেও ১৪ দলকে 'দৃশ্যমান' রাখা যাচ্ছে না।

সরকারের সমালোচনায় বাংলাদেশ জাসদ : জোট শরিক শরীফ নূরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে। বর্তমান সরকারকে ১৪ দল নয়, 'আওয়ামী লীগ সরকার' আখ্যা দিয়ে রাজপথে সভা-সমাবেশে প্রকাশ্যেই সরকারের নানা কর্মকাণ্ড এবং ব্যর্থতার সমালোচনাও করে আসছে এ দল। সম্প্রতি দলের জাতীয় কমিটির সভায়ও এ নিয়ে 'রেজ্যুলেশন' নিয়েছে এ দল।

আগের তুলনায় একাদশ সংসদে বাংলাদেশ জাসদের আসন সংখ্যা কমেছে। আগের দুটি সংসদে অভিন্ন জাসদের হয়ে দুটি করে আসনে থাকলেও এবার এ দলে একমাত্র সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন দলের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদল। নিবন্ধন না থাকায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ও নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়তে হয় বাদলকে। অন্যদিকে, ২০০৮ সালের নবম ও ২০১৪ সালের দশম নির্বাচনে অবিভক্ত জাসদ থেকে নির্বাচিত এমপি বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধানকে সর্বশেষ নির্বাচনে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হলেও পরে বাতিল করা হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে দলটির সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়ার ক্ষেত্রেও।

২০১৬ সালে জাসদ ভেঙে বাংলাদেশ জাসদের জন্ম। ২০১৬ সালের ১১ মার্চ অবিভক্ত জাসদের জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধনের পর ১২ মার্চ কাউন্সিল অধিবেশনে পাল্টাপাল্টি কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ দলের জন্ম হয়। কাউন্সিল বর্জন করে বিক্ষুব্ধ এই অংশটি শরীফ নূরুল আম্বিয়াকে সভাপতি, নাজমুল হক প্রধানকে সাধারণ সম্পাদক এবং মইনউদ্দীন খান বাদলকে কার্যকরী সভাপতি ঘোষণা দিয়ে আলাদা দল গঠনের ঘোষণা দেয়। পরে দলীয় নিবন্ধন, নির্বাচনী প্রতীক 'মশাল' এবং দলের কার্যালয়ের দাবি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে পাল্টাপাল্টি অভিযোগসহ আদালতে মামলার মতো ঘটনাও ঘটে। অবশ্য নির্বাচন কমিশন থেকে দলীয় নিবন্ধন ও প্রতীক মশাল হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। উচ্চ আদালতেও সেটা বহাল থাকে। অন্যদিকে আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন অংশটি বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল তথা 'বাংলাদেশ জাসদ' নামে আলাদা দলের ব্যানারে ও আলাদা কার্যালয় নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের আবেদনও দিয়ে রেখেছে দলটি।

আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে দলের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়েও এগোচ্ছে বাংলাদেশ জাসদ। এর আগে দলের জেলা ও উপজেলা সম্মেলনগুলোও শেষ করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত দলকে সুসংগঠিত করতে চায় তারা। বর্তমানে দলটির ৪৫টি জেলা এবং প্রায় ১৫০টি উপজেলায় কমিটি রয়েছে।

বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া বলেন, তারা সরকারের বিরোধিতা নয়, গঠনমূলক সমালোচনা করছেন। সমাজের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়েও কথা বলছেন। এটাতে কারও মধ্যে কোনো অসন্তোষ বা ক্ষোভ দেখা দিলেও কিছু করার নেই। তার মতে, আসলে আওয়ামী লীগ ভুল কৌশলে ১৪ দল পরিচালনা ও নির্বাচন করেছে। এ কারণে গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ নিজে লাভবান ও শক্তিশালী হলেও অন্য শরিক দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত ও নিঃশেষই হয়েছে। তাই এখন শরিকদের উচিত নিজ নিজ দল পুনর্গঠনে উদ্যোগী হওয়া। বাংলাদেশ জাসদ সেই প্রচেষ্টাই নিয়েছে।

নিঃশর্ত সমর্থন নীতিতে জাতীয় পার্টি-জেপি : গত মহাজোট সরকারের মন্ত্রী এবং ২০১৩ সালে গঠিত নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার পদে থাকলেও এবার মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। আগের সংসদের নির্বাচিত এমপি রুহুল আমিন এবার জোটের মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন। এতে দলটির আসন সংখ্যা কমে একটিতে দাঁড়িয়েছে। দলের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জোটের মনোনয়ন পেলেও নিজ দলীয় প্রতীক 'বাইসাইকেল' নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এমপি হয়েছেন।

তবে মন্ত্রিসভায় না থাকা নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই বলেই জানিয়েছেন দলটির নেতারা। সরকার ও ১৪ দলীয় জোটকে নিঃশর্ত সমর্থনের মনোভাব নিয়ে জোটে সক্রিয় থাকার কথাও জানিয়েছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টি-জেপির মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম বলেছেন, আওয়ামী লীগ কিংবা সরকার থেকে তাদের যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। আর মন্ত্রিত্ব তো প্রধানমন্ত্রী যাকে যাকে প্রয়োজন মনে করবেন, তাকে তাকেই দেবেন। এ নিয়ে ক্ষোভের কী আছে? তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ে তুলতে ১৪ দলীয় জোটে সক্রিয় থেকে সরকারকে সহযোগিতা করে যাবেন তারা।

নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতেও মনোযোগী রয়েছে দলটি। আগামী ৩০ নভেম্বর দলের জাতীয় সম্মেলন এবং এর আগেই সব জেলা-উপজেলা সম্মেলন শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে এ দল। বর্তমানে সারাদেশের সবক'টি জেলা ছাড়াও ৩৬৮টি উপজেলায় কমিটি রয়েছে জাপার।

অন্য দলগুলোর অবস্থান :রাজনীতিতে কিছুটা অবস্থান ও পরিচিতি থাকলেও ১৪ দলীয় জোটে মূল্যায়ন নেই অন্যতম দুই দল ন্যাপ ও গণতন্ত্রী পার্টির। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর একজন করে সংরক্ষিত নারী এমপি পদে এ দল দুটির নেত্রীদের মনোনীত করা হয়। কিন্তু এবার সেটিও পায়নি এ দুই দল। ১৪ দলগতভাবে অংশ নেওয়া তিনটি জাতীয় নির্বাচনের কোনো আসনেও ছাড় পায়নি তারা।

ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, আগে ১৪ দল শরিকরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে ছিল, সরকারেও ছিল। কিন্তু এখন ১৪ দল কেবল আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে আছে, কিন্তু সরকারে নেই। এ অবস্থায় ন্যাপ নেতাকর্মীরা মনে করেন, শরিক দলগুলোর প্রতি এক ধরনের অবমূল্যায়নই করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জোট সম্পর্কে আওয়ামী লীগের অবস্থান পরিস্কার করতে হবে।

তবে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে তরীকত ফেডারেশন। ১৪ দলের মনোনয়নে আগের নির্বাচনে দুটি এবং এবারের নির্বাচনে একটি আসনে নির্বাচিত এমপি রয়েছে দলটির। তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে দলের মহাসচিব ও নির্বাচিত এমপি এম এ আওয়াল দল থেকে বহিস্কৃত হন। এম এ আওয়াল পরে আলাদা দল গঠন করে অন্য একটি জোটের শরিক হিসেবে কাজ করছেন। এতে তরীকত ফেডারেশনের খানিকটা সাংগঠনিক ক্ষতি হয়েছে।

১৪ দলের বাকি চার শরিক কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি এবং বাসদের (রেজাউর) রাজনৈতিক মাঠে তেমন কোনো অবস্থান নেই। গত তিনটি সংসদ নির্বাচনের একটিতেও কোনো আসনে ছাড় পায়নি নিবন্ধনহীন এ দলগুলো। ১৪ দলীয় জোটে তেমন কোনো মূল্যায়ন না থাকায় তারাও আওয়ামী লীগ ও সরকারের প্রতি খানিকটা ক্ষুব্ধ হয়ে আছে।