কী বার্তা পেল ছাত্রলীগ

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

অমরেশ রায় ও ইমাদ উদ্দিন মারুফ

ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে আকস্মিকভাবে সরিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনটিকে কী বার্তা দিলেন, এটা এখন দেশজুড়েই আলোচিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীর একযোগে নজিরবিহীনভাবে পদ হারানো ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। নেতাকর্মীরা কোনো ধরনের অপকর্ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিতই উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর এ পদক্ষেপে। বোঝাই যাচ্ছে যে, ভবিষ্যতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ালে আর ছাড় পাবেন না।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগেই ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে অপসারণ করা হয়েছে। তারা ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন। পাশাপাশি সরকারের ইমেজ কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী যা করেছেন, সেটাই করা উচিত ছিল। এতে এই বার্তা স্পষ্ট যে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোনো ধরনের অন্যায়ের স্থান নেই। কাজেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদেরও নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো রকম এদিক-সেদিক করার সুযোগ নেই। শোভন ও রাব্বানীর পরিণতি থেকে অন্যরা শিক্ষা নেবেন।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ এমপির বক্তব্যেও এমনটাই উঠে এসেছে। তিনি নিজেও এক সময় ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সমকালকে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের বিষয়ে একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার এই সিদ্ধান্তটা খুবই বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যে পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, সেটাকে থামিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা সঠিক কাজই করেছেন।

ডাকসুর সাবেক এই ভিপির মতে, ছাত্রলীগের সব নেতাকর্মীর জন্যই এটা একটা সতর্কবার্তা। কেউ অন্যায়-অপরাধ করলে কিছুতেই ছাড় পাবে না। এ ধরনের একটা সিদ্ধান্ত খুব জরুরি ছিল। সেই কাজটি প্রধানমন্ত্রী সঠিক সময়েই করেছেন।

ছাত্রলীগের আরেক সাবেক সভাপতি এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, ছাত্রলীগে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন নেতৃত্ব গড়ে তোলা ও এর সুনাম ধরে রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ অবশ্যই প্রয়োজনীয় ছিল।

প্রধানমন্ত্রী এত বছর কষ্ট করে দেশ ও দলকে যে অবস্থানে নিয়ে গেছেন, অপকর্ম করে সেই সুনাম ও মর্যাদা নষ্ট করতে দেওয়া যায় না। কাজেই ছাত্রলীগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যে কাজটি করেছেন, সংগঠনকে বাঁচানোর জন্য একটি ভালো  পদক্ষেপই নিয়েছেন। এখন এ ধরনের অন্য সংগঠনগুলোকেও দেখা দরকার।

তিনি বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানই ফুটে উঠেছে। সবাই এটাকে ভালো বলবে, অভিনন্দন জানাবে।

গত বছরের ৩১ জুলাই শোভন ও রাব্বানীকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রলীগের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বছর যেতে না-যেতেই একের পর এক অভিযোগ আসতে থাকে তাদের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের কাছে গিয়ে চাঁদা দাবির মতো গুরুতর অভিযোগ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা চলছিল। এই দুই নেতা উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশন আদায় করে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ছাত্রলীগের জেলা ও শাখা সম্মেলন করতে না পারা, দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা, বিতর্কিতদের দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের ফোন না ধরা, কর্মসূচিতে দেরি করে যাওয়া ও প্রধান অতিথিদের বসিয়ে রাখাসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সব মহলে বিতর্কিত হয়ে ওঠেন তারা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও তাদের ওপর বিরক্ত হয়ে পড়েন। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছালে তিনি সব দেখেশুনে শনিবার শোভন ও রাব্বানীকে বাদ দিয়ে নতুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আল নাহিয়ান খান জয় এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পদে লেখক ভট্টাচার্যের নাম ঘোষণা করেন।

ছাত্রলীগের গত কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার বাইরে গিয়ে ছাত্রলীগ করা যায় না। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে। একই কমিটির সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন বলেন, শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের একমাত্র অভিভাবক। তিনি ছাত্রলীগকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন। সন্তানের মতোই ছাত্রলীগকে তিনি আঁচলের ছায়ায় আগলে রাখেন। তাই ছাত্রলীগের খারাপ কিছু দেখলে তিনি খুব কষ্ট পান। ছাত্রলীগের জন্য যা ভালো মনে করেছেন, সেটিই তিনি করেছেন। আশা করি নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ভালোভাবে এগিয়ে যাবে।

ছাত্রলীগের নতুন কাণ্ডারি জয় ও লেখকও একই রকমের বার্তা দিয়েছেন। গতকাল রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেছেন, ছাত্রলীগ চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিসহ কোনো অপকর্মকেই প্রশ্রয় দেয় না। এ ধরনের অভিযোগ কারও বিরুদ্ধে পাওয়া গেলে এবং প্রমাণ হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর লবিং-তদবির না করে সঠিক রাজনীতিও করতে হবে। তাহলেই সংগঠনের কাছে সঠিক মূল্যায়ন পাওয়া যাবে।

তবে পদ হারানোর পর প্রতিক্রিয়া জানতে শোভনকে মুঠোফোনে বহুবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেনি। একইভাবে রাব্বানীর ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।

অনুসারীদের প্রতিক্রিয়া: শোভন ও রাব্বানীর বাদ পড়া এবং জয় ও লেখকের দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তাদের অনুসারীরা। তবে এখন খুব সামান্যসংখ্যক নেতাকর্মী শোভন ও রাব্বানীর পক্ষে কথা বলছেন।

শোভন ও রাব্বানীকে পদ থেকে সরানোর পেছনে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের ভূমিকাও রয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা। বলছেন, এর আগেও অনেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এর চেয়ে আরও বড় দুর্নীতি করে গেছেন। তাদের বিষয়ে আজ পর্যন্ত কিছুই হয়নি।

অন্যদিকে, এতদিন শোভন ও রাব্বানীর সঙ্গে থাকলেও বেশিরভাগ নেতাকর্মীই এখন নতুন নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। নতুন নেতৃত্ব আসায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তারা। এই অনুসারীদের মতে, নতুন এ নেতৃত্ব সাংগঠনিকভাবে অনেক দক্ষ। জয়-লেখকের নেতৃত্বেই ছাত্রলীগ আবার তার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবে, কালিমা মুছে ছাত্রলীগের সুনাম বয়ে আনবে। আর সে যাত্রায় তারাও সহযাত্রী হতে চান।

শোভনের সামনে জয়ের নামে স্লোগান: ছাত্রলীগের নতুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণার পর শনিবার রাতে শোভনের সামনে নতুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জয়ের নামে স্লোগান দিতে দেখা গেছে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের। শনিবার রাত দেড়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) পাশে অবস্থিত ডাচে এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতে ঢাকা মেডিকেলের দিক থেকে আলাদা মোটরসাইকেলে করে আসেন শোভন ও জয়। টিএসসির ডাচে নেতাকর্মীদের ভিড় দেখে সেখানে থামেন তারা। এ সময় শোভনের সামনেই নেতাকর্মীরা 'জয় ভাইয়ের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম' বলে স্লোগান দিতে থাকেন।

শোভন ও রাব্বানীর বিচার দাবিতে পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভ: শোভন ও রাব্বানীর বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন সংগঠনটির পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। শনিবার মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বিক্ষোভ করেন তারা। শোভন ও রাব্বানীকে অব্যাহতি দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও আনন্দ-উল্লাসও করেন তারা। এ সময় পদবঞ্চিতরা বলেন, যে অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার তদন্ত করে বিচার করতে হবে। কেবল পদ থেকে সরিয়ে দেওয়াই তাদের একমাত্র শাস্তি হতে পারে না।

ছাত্রলীগের গত কমিটির কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক এবং পদবঞ্চিতদের মুখপাত্র রাকিব হোসেন বলেন, সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ায় বহিষ্কৃতদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে।