খুনের মামলার আসামিও আওয়ামী লীগে

ফরিদপুর শরীয়তপুর গোপালগঞ্জ রাজবাড়ীতে যোগ দেওয়া নেতাকর্মীদের নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

শাহেদ চৌধুরী

খুনের মামলার আসামিও আওয়ামী লীগে ঠিকানা খুঁজে পেয়েছেন। অনেক দাগি আসামিই মামলা থেকে রেহাই পেতে কিংবা পুলিশের ধরপাকড় থেকে বাঁচতে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। ফরিদপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও রাজবাড়ী জেলায় আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া নেতাকর্মীদের তালিকায় এ চিত্র পাওয়া গেছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৈরি করা এ তালিকা ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও সাংগঠনিক সম্পাদক শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে দেওয়া হয়েছে। এই দুই নেতা ঢাকা বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বে রয়েছেন।

ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বড় গোপালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়েছেন মাহবুবুর রহমান লিটু সরদার। অথচ তিনি জাজিরা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি। অবশ্য সমকালের সঙ্গে আলাপকালে লিটু সরদার এ তথ্য অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বিএনপি ঘরানার রাজনীতি করলেও তিনি কখনই কোনো কমিটিতে ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে জাজিরা থানায় দুটি মামলা ছিল। এর মধ্যে একটি হত্যা মামলা। তবে ২০১৬ সালে তিনি সেই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তালিকায় আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া নেতাকর্মীদের নাম ও তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। এ তালিকা আলোচিত চার জেলার নেতাদের কাছে পাঠানো হচ্ছে, যাতে তারাই তালিকায় থাকা বিতর্কিতদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। তালিকা অনুযায়ী আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া নেতাকর্মীদের অতীত রাজনৈতিক কার্যক্রম সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পূর্বের দলে তাদের পদ-পদবি এবং পূর্বসূরিদের রাজনৈতিক তথ্য সম্পর্কেও অনসুন্ধান চলছে। তাদের সবার মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার তথ্যও রয়েছে এ তালিকায়। সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর তাদের সম্পৃক্ততার তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। মামলা সংক্রান্ত তথ্যাবলিও রয়েছে ওই তালিকায়।

ফরিদপুর : এ জেলার আওতাধীন সালথা বিএনপির সহসভাপতি ওহিদুজ্জামান, মোস্তাফিজুর রহমান সাহিন, কাইয়ুম মোল্লা, হুমায়ুন মাতুব্বর ও বেলাল হোসেন টুকুর বিরুদ্ধে মামলা থাকার পরেও তাদের আওয়ামী লীগে নেওয়া হয়েছে। তারা ইউসুফদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তাদের মতো এই থানায় একই মামলার আসামি বিএনপির চার নেতা আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। তারা হচ্ছেন- লক্ষনদিয়ার হাবিবুর রহমান লাভলু, সিংহপ্রতাপের টিটুল খালাসী, ভাওয়ালের কালাম বিশ্বাস ও ইসরাফিল মাতুব্বর। এ ছাড়াও মামলার পর আওয়ামী লীগে এসেছেন থানা বিএনপির জয়নাল আবেদীন, মওলানা মিজবাহ, শহিদুল ইসলাম খান সোহাগ, টিটুল চৌধুরী ও জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক রেজোয়ানুর রহমান রিজু।

এদিকে সালথার হাবিবুর রহমান লাভলু বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে এসেই ৩ নম্বর গট্টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। একইভাবে থানা যুবদলের সভাপতি আরুয়াকান্দির নুরু মাতুব্বর এই ইউনিয়নের মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন। ৮ নম্বর বল্লভদী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন থানা ছাত্রশিবির নেতা নুর ইসলাম। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। থানা বিএনপি নেতা শহিদুল ইসলাম খান সোহাগ ৬ নম্বর আটঘর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

সালথা বিএনপির সহসভাপতি ফজলুল মতিন বাদশা যোগ দিয়েই থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হয়েছেন। সালথা জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি হয়েছেন থানা বিএনপির নেতা শাহিন খন্দকার। থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হয়েছেন থানা বিএনপি নেতা সহিদুল ইসলাম সাহিদ। থানা ছাত্রশিবির নেতা নুর ইসলাম হয়েছেন থানা আওয়ামী লীগের শিল্পবিষয়ক সম্পাদক। তিনি বিভিন্ন সময়ে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে অবস্থান করেছেন। সালথা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন থানা বিএনপি নেতা শহিদুল ইসলাম খান সোহাগ। মামলা থাকার পরেও ৩ নম্বর গট্টি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার আলী। সালথা বিএনপির নেতা টিটুল চৌধুরীকে স্থানীয় জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। মধুখালী যুবদলের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির হোসেন হয়েছেন থানা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা।

যোগ দেওয়ার তালিকায় রয়েছেন- জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক গোলাম আজাদ, সালথার গট্টি বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইব্রাহিম মোল্লা, ভাওয়াল বিএনপির সভাপতি মোকা মাতুব্বর, সালথা বিএনপির কুদ্দুছ মোল্লা, রফিক মাতুব্বর, হোসনেয়ারা ইকবাল মাতু, মধুখালী যুবদলের অর্থবিষয়ক সম্পাদক আনিচুর রহমান লিটন, থানা বিএনপির নাজমা বেগম, কোতোয়ালি বিএনপির বিপ্লব মিয়া, নাসির খান দুলাল, মান্না কমিশনার, আবু সাঈদ চৌধুরী, ৮ নম্বর পৌর বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর খান বাবুল, ঈশান গোপালপুর বিএনপির সহসভাপতি আবদুল আজিজ শেখ, ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ডা. মাইনুদ্দিন, ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি জহুরুল হক মুন্সী, গোন্দারদিয়ার আজিজার রহমান মোল্লা এবং কোতোয়ালি বিএনপির সাদেকুজ্জামান মিলন।

শরীয়তপুর : এ জেলায় আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া পালং শাখা বিএনপির মঞ্জুর হোসেন মন্টু তালুকদারের বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। আর মামলার পর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন ভেদরগঞ্জ বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আবুল কালাম আবু হাওলাদার ও পালং বিএনপির আশিক মাহমুদ।

পালংয়ের শান্তিনগর এলাকার সাইফুর রহমান রাজ্জাক মোল্লা বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে এসেই পৌর কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। আবার যোগ দেওয়ার পর অনেকেই আওয়ামী লীগের নেতা হয়েছেন। তাদের মধ্যে জাজিরা বিএনপির সভাপতি ফজলু আকন হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়াও ভেদরগঞ্জ বিএনপির নেতা জব্বার হোসেন রাড়ীকে থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভেদরগঞ্জ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হয়েছেন থানা বিএনপির নিজাম সরদার। নারায়ণপুর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম শিকদারকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগে অন্য দল থেকে আসা নেতাদের তালিকায় রয়েছেন- ভেদরগঞ্জের স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসাধারণ সম্পাদক বাদল রাড়ী, থানা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক ইসহাক বেপারীসহ সিরাজ হাওলাদার, আসাদ ছৈয়াল, রহিম সরদার, পালং বিএনপির মতিউর রহমান মতি, আবদুল জলিল সরদার, সরোয়ার হোসেন বাবুল, মোসারফ হোসেন তালুকদার এবং জাজিরা বিএনপির কাজী আমিনুল ইসলাম।

গোপালগঞ্জ : এ জেলায় আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া বিএনপি নেতাকর্মীদের তালিকায় রয়েছেন- চন্দ্রদিঘলিয়ার সবেদ আলী ভূঁইয়া, থানা পাড়ার সাইফুল ইসলাম, নতুন বাজার রোডের ইমরান খান, বেদগ্রামের ফকির সেলিম রেজা, জাহাঙ্গীর শিকদার, অহেদুল হক, শফিকুল হক লিংকন ও চরনারায়ণদিয়ার বাবলু কাজী। যোগদানকারীদের মধ্যে জেলা বিএনপি নেতা বেদগ্রামের আশরাফুল হক লিটুকে সদর থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। থানা আওয়ামী লীগের সদস্য হয়েছেন জেলা বিএনপির আরেক নেতা সাতপাড়ের ধনীন্দ্রনাথ। জেলা বিএনপি নেতা পাটকেলবাড়ীর বিনয় কুমার সরকার অনাদীকে থানা আওয়ামী লীগের সদস্য করা হয়েছে।

রাজবাড়ী : এ জেলায় মামলার পর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন বালিয়াকান্দি বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মোফাজ্জেল হোসেন মিঠু ও সদস্য তোফাজ্জেল হোসেন টিটু। এই দুই সহোদর মামলার অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি পেয়েছন। আর বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে এসেই বহরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়েছেন বালিয়াকান্দি বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল করিম। আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার তালিকায় রয়েছেন- কালুখালী বিএনপির নাসির মোল্লা, মোহাম্মদ তারেক, এরশাদ নাজমুল, মোহাম্মদ আকরাক, সিদ্দিকুর রহমান, তারিকুল ইসলাম, কালুখালী ওলামা দলের সভাপতি মৌলভী সাদেকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক বাহারুল আলম সরদার।