চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচন

মনোনয়ন প্রস্তাব গ্রহণ করেননি মোর্শেদ খান

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

লোটন একরাম

চট্টগ্রাম-৮ আসনের আসন্ন উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে এম মোর্শেদ খানকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছিল বিএনপি। তবে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেননি সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান। সম্প্রতি অবমূল্যায়নের অভিযোগে ক্ষুব্ধ মোর্শেদ খান পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তবে বিএনপির হাইকমান্ড তা গ্রহণ করেনি। তাকে দলের পতাকাতলে সক্রিয় রাখতেই উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র।

এ বিষয়ে বিএনপির পদত্যাগী ভাইস চেয়ারম্যান এম মোর্শেদ খান গতকাল মঙ্গলবার সমকালকে বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে তাকে বিএনপি মনোনয়ন দেবে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন। তবে তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করায় মনোনয়ন দেওয়ার বা নেওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।

দল থেকে পদত্যাগের ব্যাপারে মোর্শেদ খান বলেন, তিনি শুনেছেন, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি। তবে তিনি মনে করেন, পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করার সময় থেকেই সেটি কার্যকর হয়ে গেছে। এখানে গ্রহণ করা বা না করার কিছু নেই।

জাসদ নেতা মইনউদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে শূন্য চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে অতীতে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এম মোর্শেদ খান। অবশ্য গত একাদশ সংসদ নির্বাচনে তাকে আর মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এতে তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হন। দলের সিনিয়র নেতা হিসেবে তাকে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য না করায়ও অসন্তুষ্ট হন তিনি।

সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মোর্শেদ খানের যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতাকে দলে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। অবশ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যুতে দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে তার দ্বিমত দেখা দিয়েছিল। দল অবমূল্যায়ন করেছে এমন ধারণা থেকে এবং বয়স ও অসুস্থতাসহ নানা কারণে দলীয় কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন মোর্শেদ খান।

অবশ্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের শীর্ষ নেতা ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'বিএনপি সব নির্বাচনেই যাচ্ছে। চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কোনো সিদ্ধান্তও নেই।' এ সময় এম মোরশেদ খানকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, 'চট্টগ্রামের উপনির্বাচনে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তা নিয়ে দলীয় ফোরামে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি। তা ছাড়া এখনও নির্বাচনের তফসিলও ঘোষণা হয়নি। তফসিল ঘোষণা হলে মনোনয়নের জন্য কারা আবেদন করেন এবং কে যোগ্য প্রার্থী, এসব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু বলার নেই।'

চট্টগ্রাম-৮ আসনের (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য মোর্শেদ খান। এ আসন থেকে তিনি চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এখানে তিনি যতবার নির্বাচন করেছেন, ততবারই বিজয়ী হয়েছেন। ১৯৮৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুনে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনেও এমপি হন তিনি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মোর্শেদ খানকে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। প্রথমে তার মনোনয়নপত্র আইনি জটিলতায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) আটকে দেয়। পরে যখন ইসি প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে অনুমতি দেয়, তখন দল তাকে আর মনোনয়ন দেয়নি। তার বদলে মনোনয়ন দেওয়া হয় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি নেতা আবু সুফিয়ানকে। তবে সুফিয়ান নির্বাচনে পরাজিত হন। এবারও আবু সুফিয়ান এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী এরশাদ উল্যাহ এখানে মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বর্তমান প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও মোর্শেদ খানের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলে বিজয়ী হওয়ার আশা রয়েছে বিএনপির। একদিকে আসন উদ্ধার এবং অন্যদিকে মান ভাঙিয়ে দলে ফিরিয়ে আনার কৌশল থেকে মোর্শেদ খানকে নির্বাচন করার জন্য বিশেষ দূত মারফত প্রস্তাব পাঠিয়েছিল বিএনপি হাইকমান্ড।

সূত্রমতে, মোর্শেদ খান সরাসরি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী না হলে তাকে পরোক্ষভাবেই সমর্থন দেওয়ার ইতিবাচক চিন্তা রয়েছে বিএনপিতে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত তাকে রাজি করানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।

গত ৫ নভেম্বর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বরাবর পদত্যাগপত্র পাঠান মোর্শেদ খান। পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, 'আজ অনেকটা দুঃখ ও বেদনাক্লান্ত হৃদয়ে আমার এই পত্রের অবতারণা। মানুষের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হয়, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আমার বিবেচনায়, সে ক্ষণটি বর্তমানে উপস্থিত এবং উপযুক্তও বটে। বর্তমানে আমার দৃঢ়বিশ্বাস, দেশের রাজনীতি এবং দলের অগ্রগতিতে নতুন কিছু সংযোজন করার মতো সংগতি নেই।' মোর্শেদ খানের পদত্যাগের খবর প্রচার হওয়ার পর দলের ভেতরে ও বাইরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেউ কেউ তার কঠোর সমালোচনা করেন। আবার কেউ কেউ তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। অনেকে বলছেন, উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপ সামলাতে না পেরেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।