ইসির সঙ্গে বিএনপির বৈঠক

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার না করে ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদাকে চিঠি দিয়েছে বিএনপি। মঙ্গলবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সই করা চিঠিতে ব্যালটে ভোট গ্রহণের এ দাবি জানানো হয়।

নির্বাচন ভবনে সিইসির সভাকক্ষে কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিএনপির চার সদস্যের প্রতিনিধি দল। এ সময় সিইসির কাছে ফখরুলের চিঠি পৌঁছে দেয় প্রতিনিধি দল। চিঠিতে মির্জা ফখরুল লিখেছেন, গত ১৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনের বিস্তারিত তথ্যসহ চিত্র দেশের সকল গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই চিত্র ইভিএম, নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার সম্পর্কে বিএনপিসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবিকে পাকাপোক্ত করেছে। চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচনের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে বলতে হচ্ছে- একটি স্বচ্ছ ও শুদ্ধ নির্বাচন ব্যবস্থা ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অর্থহীন। গণতন্ত্র কার্যকর করার জন্যই ওই ভোট ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংবিধান নির্বাচন কমিশনের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে।

ফখরুল ইসলাম বলেন, ইভিএম প্রকল্পের মতো একটি সর্বজনবিতর্কিত উদ্যোগ সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ইভিএমের যান্ত্রিক অকার্যকারিতা যেমন প্রমাণিত হয়েছে, তেমনি নির্বাচন কমিশনকে সহযোগী অথবা নিষ্ফ্ক্রিয় রেখে কাগজের ব্যালট ছিনতাই বা ডাকাতির মতোই ইভিএমের ওপরেও সরকারদলীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইভিএমেও ভোটারদের দেদার সরকারদলীয় বাহিনীরা দখল করেছে। চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচন যার সর্বশেষ প্রমাণ।

চিঠিতে আরও বলা হয়, গত ৭ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তাদের বিশেষজ্ঞরা সাংবাদিকদের ইভিএম মেশিনের কার্যকারিতা প্রমাণে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) দুটি ইউনিট। একটি কন্ট্রোল ইউনিট, অন্যটি ব্যালট ইউনিট। এর মধ্যে ব্যালট ইউনিটটি অরক্ষিত। কন্ট্রোল ইউনিটে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিংয়ের পর ব্যালট ইউনিটে গিয়ে একজনের ভোট দিতে পারেন অন্যজন। কেননা, কন্ট্রোল ইউনিটে ফিঙ্গারের ব্যবস্থা থাকলেও ব্যালট ইউনিটে তা নেই। চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে তা প্রমাণিত। নির্বাচন কমিশন যতক্ষণ একটি স্বচ্ছ, শুদ্ধ ও ভোটারের গোপনীয়তাসহ ভোটাধিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করতে পারবেন ততক্ষণই ভোটাধিকার চর্চা থেকে ভোটের মালিক তথা রাষ্ট্রের মালিক জনগণ বঞ্চিত থাকবেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কমিশনের হাতে এখনও সুযোগ আছে নিরপেক্ষতা প্রমাণের চেষ্টা করা। সেই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে উন্মোচিত ইভিএমের অকার্যকারিতাকে বিবেচনায় নিয়ে ইভিএম ব্যবস্থা বাতিল করে প্রচলিত ব্যালট ব্যবস্থাতেই ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করা হোক। চট্টগ্রামের উপনির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ মৃত, প্রবাসী এবং জেলখানায় বন্দি ভোটাররাও চট্টগ্রাম-৮ আসনে ভোট দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। সিইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ইভিএমে ভোট ডাকাতি হয়, চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে তা প্রমাণিত হয়েছে। তার দল এ আসনের ভোট বাতিল করে ব্যালট পেপারে পুনর্নির্বাচন চায়।

চট্টগ্রামে সব কেন্দ্রের দখলের অভিযোগ করে আমীর খসরু বলেন, ১৭০ পোলিং স্টেশনের মধ্যে সবই দখল করে নিয়েছিল ক্ষমতাসীনরা। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী কেন্দ্রের বাইরে কেউ থাকতে পারবেন না, গাড়ি-মোটরসাইকেল চলবে না। কিন্তু সেখানে চট্টগ্রাম বিভাগের সব মেয়র, কাউন্সিলর, আওয়ামী লীগ নেতার অবস্থান দৃশ্যমান ছিল। সবাই সরাসরি কেন্দ্র দখল করেছে, মিছিল করেছে। মৃত মানুষ, প্রবাসী এবং জেলে বন্দি থাকাদের ভোট দেওয়ার বিষয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোনো ভোটারের ফিঙ্গার ম্যাচিং না হলে ১ শতাংশ ফিঙ্গার ম্যাচিংয়ের দায়িত্ব ছিল সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের। সেই ১ শতাংশে মৃত এবং প্রবাসীদের ভোট দেখানো হয়েছে। তাছাড়া ইসির আইটি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিটের পাসওয়ার্ড নিয়ে আরও ১০ শতাংশ (মৃত, প্রবাসী ও জেলে বন্দিদের) ভোট দিয়েছে দলখলদার সন্ত্রাসীরা।

আমীর খসরু বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনের ভোটে ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে দেওয়া হয়নি। যারা যেতে পেরেছেন তারা আঙুলের ছাপ দিয়েছেন, ভোটের ব্যালট ইউনিটে ভোটের কাজ তারা সেরে ফেলেছেন। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও যেখানে ইভিএমে ভোট হয়েছে সেখানেও এমন হয়েছে, চট্টগ্রামে তার চেয়েও খারাপ হয়েছে। তাই কমিশনকে অনুরোধ করেছি চট্টগ্রামের নির্বাচনটি বাতিল করে দিন। তিনি বলেন, ভারতের চেয়ে ১১ গুণ বেশি টাকায় ইভিএম মেশিন কেনা হয়েছে। সেখানে অডিট ট্রেইল ও পেপার ট্রেইল নেই। ভারতের মেশিনে তা আছে। পাঁচ-ছয়টি দেশে ইভিএম ব্যবহার হচ্ছে। সেখানে কমিশন বা সরকার প্রশ্নবিদ্ধ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের কমিশন এবং সরকার প্রশ্নবিদ্ধ।

কমিশন কী বলেছে- সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এ নীতিনির্ধারক বলেন, 'তারা (কমিশন) বলছে, সবঠিক আছে। আগে ৩০ ডিসেম্বরেও বলেছিল, সব ঠিক আছে, এখনও তাই বলছে।'

বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর বলেন, 'ইভিএমে মৃত ভোটার ভোট দিতে পারে না। অথবা বিদেশে আছেন, তারা কীভাবে ভোট দিলেন। একজন মৃত ভোটার কিংবা বিদেশে থেকে তো ইভিএমে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। এ জন্য তাদের একটা লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। তারা দিয়েও গেছেন। যদি দেখা যায় মৃত এবং তার পক্ষে কেউ ভোট দিয়ে গেছে, তাহলে অবশ্যই বুঝতে হবে, সিস্টেমের কোথাও একটা সমস্যা আছে। ইভিএম তো দোষ করতে পারে না, তাহলে এই দোষের সঙ্গে জড়িত কারা। সত্য বের করতে হবে। কমিশন বলেছে, এটার সত্যতা তারা বের করবেন।' ইসি সচিব বলেন, কমিশন বলেছে সাধারণ অভিযোগ গেজেট হয়ে গেলে কমিশনের হাতে আর থাকে না, এ বিষয়ে আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। বিশেষ অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত করে অভিযোগ প্রমাণ পেলে কমিশন ব্যবস্থা নেবে।

ঢাকা উত্তর সিটির বিএনপি প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের ওপর হামলার বিষয়ে আমীর খসরু বলেন, তাবিথের ওপর হামলা হয়েছে। সাবেক এমপি এ্যানীসহ ১৫ জন হামলায় আহত হয়েছেন। ঢাকার নির্বাচনে তারা রাস্তার ওপর অফিস করেছেন, পোস্টার লাগিয়েছেন। কিন্তু বিএনপি প্রার্থীকে বাধা দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ওপর সরকার খবরদারি চালাচ্ছে। কমিশনের ওপর জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাবিথের ওপর হামলার বিষয়ে ইসি সচিব বলেন, তাবিথের ওপর হামলার বিষয়ে কমিশনের কাছে বিএনপি তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ করেছে। কমিশন সেটি শুনেছে। সঙ্গে সঙ্গে রিটার্নিং অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তদন্ত করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য।

বৈঠকে সিইসি কে এম নূরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদাত হোসেন চৌধুরী, ইসি সচিব মো. আলমগীর উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি প্রতিনিধি দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও চট্টগ্রাম দক্ষিণের বিএনপি আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান।