রাজনীতি

সিটি নির্বাচনকে কাজে লাগাতে চায় বিএনপি

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

কামরুল হাসান

শুধু সরকারি দলের ভোটকেন্দ্র 'দখল' ও 'জালিয়াতি' নয়, সাংগঠনিক দুর্বলতাও ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করছে বিএনপি। হাইকমান্ডের মতে, ঢাকা মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক স্থবিরতা, কোন্দল, নেতাকর্মীদের সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও ফল বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এসব দুর্বলতা দ্রুত কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ কমিটিকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিচ্ছে দলটি।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, মহানগর বিএনপির পরবর্তী কমিটির কার্যপরিকল্পনা, সাংগঠনিক তৎপরতা তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেনের নেতৃত্বে আবর্তিত হতে পারে। দলটির অনেক নেতাকর্মীই তরুণ এই দুই নেতাকে দলের মহানগর শাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনার পক্ষে। এতে দলের শীর্ষ নেতাদেরও মৌন সম্মতি রয়েছে।

বিএনপির সিনিয়র নেতা ও অভিজ্ঞ কর্মীরা মনে করছেন, মহানগর বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় সিটি নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে দাঁড়াতে পারেনি দল। নির্বাচনের আগে দলের প্রচার মিছিলে যে পরিমাণ মানুষের ঢল নেমেছিল, তাকে কাজে লাগাতে পারলে নির্বাচনী ফল ভিন্ন হতে পারত। মহানগর বিএনপি নেতা ও প্রতিটি থানা এবং  ওয়ার্ড বিএনপির নেতারা ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে কর্মীরাও উৎসাহিত হতেন। নেতাকর্মীদের পারিবারিক সদস্যরা ভোট দিতে গেলে আরও অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী জয়ী হতে পারতেন।

একাধিক ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীও একই রকম মনে করছেন। তারা সমকালকে বলেন, কেন্দ্রভিত্তিক এজেন্টদের বিষয়ে বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক সিনিয়র নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচনের দিন সকাল থেকে অনেক নেতার মোবাইল বন্ধ ছিল। এতে এজেন্টরা বিভ্রান্তিতে পড়ে যান। কারণ নির্বাচনে তাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে, হামলা করা হতে পারে- এমন আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু মহানগর বিএনপি নেতারা এমন পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কী করতে হবে, সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা দেননি; কর্মীদের পাশে দাঁড়াননি।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, যেসব নেতা নির্বাচনের আগে তাবিথ আউয়ালের আশপাশে থেকে দাপট দেখাতেন, যাদের কারণে অন্য নেতারা তাবিথের পাশে যেতেই পারতেন না, নির্বাচনের দিন তাদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এসব নেতা প্রতিটি ওয়ার্ডে এজেন্টদের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করলেও নির্বাচনের দিন তাদের কোনো খোঁজ ছিল না। উদাহরণ দিয়ে তারা বলেন, ঢাকা উত্তরের ৫১ ও ৫২ নম্বর ওয়ার্ডে ধানের শীষের প্রায় ১০০ জন এজেন্ট ঠিক করেন তুরাগ থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুস সালাম। তিনি শুধু নামের তালিকা দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করেছেন। কিন্তু ভোটের দিন এজেন্টদের কোনো তদারকি করেননি।

একইভাবে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের নেতৃত্বাধীন যুবদলকেও ভোটের দিন মাঠে দেখা যায়নি। ঢাকা উত্তর সিটির নবগঠিত কয়েকটি ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা মহানগর উত্তর যুবদলের বিরুদ্ধে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। গতকাল দেওয়া এ অভিযোগে তারা বলেন, নির্বাচনের আগে যুবদল নেতাকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বৈঠকের আয়োজন করা হলেও তারা আসেননি। তারা দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে অবস্থান না নিলেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। নির্বাচনের দিনও যুবদলের শীর্ষ নেতারা একই ভূমিকা রেখেছেন।

স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রমে ছিলেন অনুপস্থিত। নির্বাচনের দিন তাবিথ আউয়াল উত্তর সিটির ১ নম্বর ওয়ার্ডের নবাব হাবিবউল্লাহ কলেজ ও উত্তরা হাই স্কুলে কোনো এজেন্ট না পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য নেতাকর্মীদের এজেন্ট করে কেন্দ্রে নিয়ে যান। যদিও তারা এক ঘণ্টার বেশি কেন্দ্রে থাকতে পারেননি। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আহসানউল্লাহ হাসানও ভোটের দিন অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি কোথাও ভোটও দেননি। নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি কোনো উদ্যোগই নেননি। আরও অনেক নেতাই এভাবে গা বাঁচাতে ভোটকেন্দ্রমুখী হননি।

ঢাকা উত্তরের মতো দক্ষিণেও যেসব নেতার ওপর ভরসা করা হয়েছিল, তারা নিজেদের রক্ষায় ভোটকেন্দ্র এড়িয়ে গেছেন। দক্ষিণে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেনের গোপীবাগের শহীদ শাহজাহান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ৮টায় ভোট দেওয়ার কর্মসূচি ছিল। অথচ সেখানে তার নিজস্ব এজেন্ট ছিল না। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নির্ধারিত এজেন্ট ইশরাকের বাসায় গিয়ে অভিযোগ করেন, যে নেতাকে ওই কেন্দ্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সকাল থেকে তার মোবাইল বন্ধ রয়েছে। তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে না পারায় তিনি ইশরাকের বাসায় এসেছেন। পরে ইশরাক ওই কেন্দ্রে তাকে এজেন্ট হিসেবে নিয়ে যান।

নির্বাচনের দিন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশারসহ অন্য কোনো নেতাকে ভোটকেন্দ্রের আশপাশেও দেখা যায়নি বলে অভিযোগ কর্মীদের। তবে বিএনপির সিনিয়র নেতারা ভোটের দিন নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়িয়েছেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ, ক্রীড়া সম্পাদক আমিনুল হক প্রমুখ সারাদিন বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন, এজেন্টদের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং কোথাও সমস্যা হলে সমাধান করে দিয়েছেন। এর মধ্যে মির্জা আব্বাস তার এলাকার বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে এজেন্টদের খোঁজ নিয়েছেন, প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে তাদের নিরাপত্তার বিষয়ও নিশ্চিত করেছেন। আলালের গাড়িতে কয়েক দফা ককটেল হামলা হলেও তিনি নির্বাচনী মাঠ ছাড়েননি। আমিনুল হক পল্লবী এলাকায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ছুটেছেন।

তাবিথ আউয়ালের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল জানান, দল থেকে তাকে দেওয়া দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। দলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী মাঠে নামতে পারলে অবশ্যই চিত্র ভিন্ন হতো। তাদের সঙ্গে সাধারণ জনগণও নেমে আসত।