ব্যাংক খাতে লুটপাট চলছেই: বাম গণতান্ত্রিক জোট

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

বাম গণতান্ত্রিক জোটের উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা অভিযোগ করেছেন, জবাবদিহি না থাকায় ব্যাংক ও আর্থিক খাতে পরিকল্পিতভাবে লুটপাট চলছে। কারও একার দুর্বলতায় ব্যাংক খাতে খারাপ অবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নয়। সবাই বিপক্ষে মত দেওয়ার পরও নতুন নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বক্তারা।

সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে 'ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট-উত্তরণের পথ' শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভা থেকে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বাংলাদেশ এখন লাভজনক ব্যবসা ব্যাংক। এর চেয়েও বেশি লাভজনক এমপি হওয়া। এই দুটার একটা আরেকটার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজনীতি এখন বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানের ২২ পরিবার দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করত। আর এখন তার চেয়ে কমসংখ্যক পরিবারের হাতে বেশি সম্পদ চলে গেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশে অর্থনৈতিক মন্দার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, গড় আয় দিয়ে জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা নির্ধারণ করাটা প্রতারণামূলক প্রক্রিয়া। এখানকার অর্থনীতির মূল সমস্যা রাজনৈতিক। এ সরকার ধনীদের সরকার। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ছয় লাখ টাকার বেশি আয় হলে করের আওতায় আসে। আমাদের এখানে যা আড়াই লাখ টাকা। অথচ ভারতের কর জিডিপি রেশিও ২০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে যা ১০ শতাংশের নিচে। এর মানে আমাদের দেশের ধনীরা কর দিচ্ছে না। তিনি বলেন, আমাদের সরকার খেলাপিবান্ধব। যে কারণে ঋণখেলাপিদেরই নানা সুবিধা দেওয়া হয়। গরিবরা তো ঋণই পায় না, সুতরাং খেলাপিও হয় না।

ইব্রাহিম খালেদ আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর কথা বলা হলেও তার আদর্শ মানা হয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একজন কাঠখোট্টা বা শক্ত গভর্নর দরকার। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড থেকে শুরু করে সব জায়গায় শক্ত লোককে এই পদে বসানো হয়। বর্তমান গভর্নরের মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে। নতুন করে একজন শক্ত লোককে এখানে বসানো উচিত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের যেটুকু যা করার আছে, তাও করে না। তিনি জানান যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তিনি ডেপুটি গভর্নর ছিলেন। তখন ইউসিবির (ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংক) চেয়ারম্যান বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান বাবুদের পুরো বোর্ড বাতিল করা হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এখন কেন এ রকম হচ্ছে না। ফারমার্স ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের পদচ্যুত করা উচিত ছিল। কেন তাদের পদত্যাগের সুযোগ দেওয়া হলো।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে পরিকল্পিতভাবে লুটপাট চলছে। এটা কারও একার গাফিলতি বা না বোঝার কারণে হচ্ছে, তেমন নয়। রাজনৈতিক নেতা, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী সবার যোগসাজশে লুটপাট হচ্ছে। এসব যোগসাজশের সঙ্গে দেশের উন্নয়ন ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির সম্পর্ক আছে। তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকের টাকা মেরে আজ বেসরকারি ব্যাংকের মালিক হয়েছেন। গত দশ বছরে যেসব নতুন ব্যাংক দেওয়া হয়েছে, তার বিপক্ষে ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ ও অর্থনীতিবিদরা। এর পরও এসব ব্যাংক কেন দেওয়া হলো। এদেশে কালো টাকা যাদের আছে তাদের কর কম দিতে হয়। আবার খেলাপিদের সুদ কম দিতে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, সরকার ঋণখোলাপিদের শাস্তি না দিয়ে সুবিধা দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে খেলাপি ঋণ না কমে বাড়ছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল না করলে খেলাপি ঋণ দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়াত। এ ছাড়া এক অঙ্ক সুদহারের কারণে আমানতকারী সমস্যায় পড়বে। আর সুবিধা পাবে লুটেরা ধনী, ব্যাংক ডাকাত ও ঋণখেলাপিরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, একটা দুষ্টু চক্র সরকারকে সামনের দিকে এগোতে দিচ্ছে না। আর্থিক খাতের টালমাটাল অবস্থার পরও কেন নতুন ব্যাংক দেওয়া হচ্ছে। সরকার ফারমার্স ব্যাংক ফেলে দিতে পারত। তা না করে ক্রেতা হয়ে লুটপাটকারীদের রক্ষা করেছে। এই নীতি চলতে থাকলে অরাজকতা থেকে আর্থিক খাতকে রক্ষা করা যাবে না।

বাম জোটের সমন্বয়ক ও আলোচনা সভার সভাপতি বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ব্যাংক খাত অত্যন্ত নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংকট কাটাতে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাটের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আলোচনা শেষে তিনি ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট বন্ধের দাবিতে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ওই দিন সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের বাংলাদেশ ব্যাংক অভিমুখে ঘেরাও মিছিল করা হবে।

সিপিবি নেতা আব্দুল্লাহিল কাফী রতনের পরিচালনায় সভায় বক্তব্য আরও দেন বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, ক্রেডিট রেটিং কোম্পানি ক্রিসেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোজাফ্‌ফর আহমেদ এফসিএ, ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর জাহিদ ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম লালা।