ভাঙছে গণফোরাম

এ মাসেই পাল্টা কমিটি

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

কামরুল হাসান

আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এবার ভাঙনের মুখে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। দলের পাল্টাপাল্টি বহিস্কার আর অস্থিরতা ঠেকাতে কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়েও সংকট দূর করতে পারছেন না দলটির শীর্ষ নেতারা। বরং নতুন আহ্বায়ক কমিটিকে কেন্দ্র করে তিক্ততা আরও বাড়ছে। এ কমিটির পদবঞ্চিতরা আগামীকাল শনিবার বর্ধিত সভা আহ্বান করেছেন। এ সভা থেকে কোনো সমাধান না এলে পাল্টা কমিটি গঠনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তারা।
দলের অভ্যন্তরে অস্থিরতা আর বিশৃঙ্খলায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ড. কামাল হোসেন গত ৪ মার্চ কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দুই সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। নতুন এ কমিটিতেও ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি এবং ড. রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার এটিকে ৭১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটিতে রূপ দেওয়া হয়। তবে এ কমিটিতে আগের কমিটির প্রভাবশালী নেতা এবং নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টুসহ আরও অনেককেই রাখা হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ পদবঞ্চিত নেতারা কমিটি ঘোষণার পরপরই দফায় দফায় বৈঠক করেন এবং আগামীকাল শনিবার গণফোরামের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিশেষ বর্ধিত সভা ডাকার সিদ্ধান্ত নেন। এখান থেকে দলের শীর্ষ নেতাদের একটি বার্তা দিতে চান বিক্ষুব্ধ নেতারা। তাদের ওই বার্তায় কোনো কাজ না হলে পরবর্তী সভা থেকে গণফোরামের পাল্টা কমিটি গঠনের প্রাথমিক সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এর আগে ড. কামাল হোসেনের ঘোষিত কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেন নেতারা। অবশ্য তারা ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে সমঝোতার পথও খোলা রেখেছেন। তারা তার কাছে সংগঠনের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করবেন বলে জানা গেছে।
গণফোরামের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পরপরই দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিক্ষুব্ধরা বৈঠক করেন। এতে মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, জগলুল হায়দার আফ্রিক, লতিফুল বারী হামিম, আতাউর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত বছরের ২৬ এপ্রিল গণফোরামের বিশেষ কাউন্সিল এবং পরবর্তী কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দলটির অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। নতুন কমিটিতে নির্বাচনের আগে যোগ দেওয়া ড. রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক এবং অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে নির্বাহী সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়। এতে দলের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়। তারা নীরবে রেজা কিবরিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে থাকেন। দলের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীর নেতৃত্বেও একটি বলয় সক্রিয় হয়ে ওঠে, যেটিতে পরে অধ্যাপক আবু সাইয়িদও যোগ দেন। দলে এসব বিভক্তির জের ধরে গত ২৮ জানুয়ারি ড. রেজা কিবরিয়া ও যুগ্ম সম্পাদক মোশতাক আহমদকে সাময়িক বহিস্কারের চিঠি দেয় বিক্ষুব্ধ অংশটি। গত ৪ ফেব্রুয়ারি সাময়িক বহিস্কারের চিঠি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে লাগিয়ে দেন তারা। এ ঘটনায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সাংগঠনিক সম্পাদক লতিফুল বারী হামীম, অ্যাডভোকেট হেলাল ও খান সিদ্দিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া। শোকজের কোনো উত্তর না দেওয়ায় গত ২ মার্চ তাদের চারজনকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। বহিস্কৃত নেতারা পরের দিন আবার চার কেন্দ্রীয় নেতাকে দল থেকে বহিস্কার করেন। তাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, উপদলীয় কোন্দল ও দলীয় অর্থ তছরুপের অভিযোগ আনা হয়।
গত শনিবার দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে না জানিয়েই গণফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, সুব্রত চৌধুরী ও মোস্তফা মহসিন মন্টু। বহিস্কৃত চারজন নেতাও এ সভার কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ উদ্যোগে চরম বিরক্তি প্রকাশ করেন ড. কামাল হোসেন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ওই হেভিওয়েট নেতা সবাইকে দলের নতুন আহ্বায়ক কমিটির বাইরে রাখেন।
গণফোরাম সূত্র জানায়, দলের সভাপতির নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কোনো ঘটনা ঘটলে ড. কামাল হোসেন আজীবনের জন্য বিক্ষুব্ধ নেতাদের বহিস্কার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ব্যাপারে পুরোপুরি কঠোর অবস্থানে রয়েছেন তিনি। অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ নেতারাও এর শেষ দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে তাদের মধ্যে বিভক্তি ও দূরত্ব অচিরেই আরও চরমে উঠবে বলে শঙ্কা নেতাকর্মীদের।
জানতে চাইলে সুব্রত চৌধুরী বলেন, 'গত ১০ মাস ধরে রেজা কিবরিয়া অগণতান্ত্রিকভাবে কাজ করছেন। আমিসহ অনেকেই এ কমিটিতে নেই। এ বিষয়ে আপাতত কোনো বক্তব্য দিতে চাই না। তবে খুব দ্রুতই সব জানতে পারবেন।' নতুন দল করবেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটি পরে দেখা যাবে।
পূর্ণাঙ্গ কমিটি :গণফোরামের সদ্য ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পূর্বঘোষিত দুই সদস্যের (সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া) পাশাপাশি আরও ৬৯ জনকে যুক্ত করা হয়েছে। ওই সদস্যরা হলেন মোকাব্বির খান, আ ও ম শফিক উল্লাহ, আব্দুল আজিজ, মহসিন রশীদ, এএইচএম খালেকুজ্জামান, শান্তিপদ ঘোষ, জানে আলম, সগির আনোয়ার, সুরাইয়া বেগম, সেলিম আকবর, মোশতাক আহমেদ, ড. মাহবুব হোসেন, ড. মো. শাহজাহান, আবদুর রহমান জাহাঙ্গীর, মেসবাহউদ্দীন আহমেদ, ডা. মিজানুর রহমান, এনামুল হক (যুক্তরাজ্য), ফরিদা ইয়াছমীন, মুজিবুল হক, মীর্জা হাসান, আইয়ুব করম আলী, হিরণ কুমার দাস মিঠু, আনসার খান, মোহাম্মদ ইসমাইল, এম শফিউর রহমান খান বাচ্চু, রবিউল ইসলাম তরফদার রবিন, আবুল কালাম আজাদ ছোটন, রতন ব্যানার্জী, আবুল হোসেন জীবন, হারুনুর রশিদ তালুকদার, এসএম শাফি মাহমুদ, লিংকন চৌধুরী, আমজাদ হোসেন চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন চুন্নু, আমিরুল ইসলাম, ডা. ইকরাম মো. ইসহাক, প্রিন্সিপাল আবদুল আজিজ, মোশারফ হোসেন তালুকদার, মিজানুর রহমান, ডা. খলিলুর রহমান, আনোয়ার হোসেন মহব্বত খান, নীলিমা বড়ূয়া, বাবুল কান্তি মজুমদার, মোহাম্মদ আলী লাল, ডা. জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুর রশিদ মাখন, মহিউদ্দিন মাস্টার, মোমেনা আহমেদ মুমু, গীতা সেন, সাগরিকা ভদ্র, মামুনুর রহমান, ময়নুল ইসলাম রাজা, মতিয়ার রহমান খান, আজিজুর রহমান মজনু, রোজিনা চৌধুরী, নিলুফার ইয়াছমিন, শাপলা সায়ফুল আলম, দুলাল আব্দুল ওয়াহাব, জাহাঙ্গীর হাসান, আবু কায়ছার, সিএ আলী নূর খান বাবুল, মাহফুজ আকরাম, লিয়াকত আলী, চৌধুরী আব্দুল হাকিম, মিয়া শাহ মো. নুরুজ্জামান, তওফিকুল ইসলাম পলাশ, শরিফুল ইসলাম সজল ও জহিরুল ইসলাম।

বিষয় : গণফোরাম