হঠাৎ সক্রিয় সাদ, জাপায় নানা প্রশ্ন

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাজীব আহাম্মদ

দলীয় রাজনীতিতে হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠেছেন রাহগির আলমাহি এরশাদ। যিনি সাদ এরশাদ হিসেবে অধিক পরিচিত। বাবা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে আসা সাদ শুরুতে নীরব থাকলেও সম্প্রতি তাকে ঘিরে বলয় তৈরি হয়েছে জাতীয় পার্টিতে। দলটিতে প্রায় দুই যুগ জিএম কাদেরবিরোধীদের নেতৃত্বে ছিলেন রওশন এরশাদ। মায়ের পর সাদকে দেখা যাচ্ছে এ ভূমিকায়।

জাপার নেতারা এবং দলটির বিভিন্ন সূত্র সমকালকে এসব কথা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে সাদ এরশাদের কাছ থেকে যে বক্তব্য পাওয়া গেছে, তা প্রায়ই রাজনীতিকদের মুখে শোনা যায়। তিনি সমকালকে বলেছেন, নেতা হতে চান না। কর্মী হতে চান। একজন ভাই হিসেবে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের পাশে থাকতে চান।

জাপার চেয়ারম্যান জিএম কাদেরবিরোধী হিসেবে পরিচিত নেতারা সাদের পাশে রয়েছেন। তবে সাদের দাবি, চাচা জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে তার অবস্থান নয়। আর দশ কর্মীর মতো তিনিও জিএম কাদেরের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যশীল। তবে তাকে ঘিরে যে বলয় তৈরি হয়েছে, তাতে থাকা নেতারা সমকালকে বলেছেন, গত সপ্তাহে জাপার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান সাদ এরশাদ। সেখানে তাকে স্বাগত জানান দলটির নবগঠিত কমিটি থেকে বাদ পড়া নেতারা। এরপর গত রোববার মোহাম্মদপুরে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলেন জিএম কাদেরবিরোধী হিসেবে পরিচিত নেতারা। গত বুধবার সাদ এরশাদ তার সৎভাই শাহাতা জারাব এরিকের জন্মদিনে যোগ দেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিককে পাশে নিয়ে ছোট ভাইয়ের জন্মদিনের কেক কাটেন তিনি। এরশাদের মৃত্যুর পর থেকে জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে সরব রয়েছেন বিদিশা। একের পর এক অভিযোগ তুলছেন জাপা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে।

এমন সময়ে বিদিশা সিদ্দিকের পাশে সাদ এরশাদের উপস্থিতিকে জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে তার অবস্থান হিসেবে দেখছেন জাপার নেতারা। এরিকের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সাদের সঙ্গে জাপার নয়জন সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য যোগ দেন। তাদের কেউ এখন দলের পদে নেই। গত জানুয়ারিতে কমিটি গঠনের সময় তাদের বাদ দেন জিএম কাদের। যাদের মধ্যে দু'জন জাপার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। যারা দলটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পাশে তিন দশক ছিলেন।

জাপার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য সাবেক মন্ত্রী এম এ ছাত্তার, দেলোয়ার হোসেন খান, সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী মামুনুর রশিদ, জাফর ইকবাল সিদ্দিকি, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, মেজর (অব.) খালেদ আখতার, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মৃধাসহ আরও কয়েকজন সাবেক এমপি সাদকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা নতুন বলয়ে রয়েছেন। তবে দলের বর্তমান ২৬ এমপির মাত্র তিনজন রয়েছেন এ বলয়ে।

সাদ-ঘনিষ্ঠ একজন সমকালকে বলেছেন, জাপায় কখন কী হবে, তা আগেভাগে বলা যায় না। এটাই জাপার চরিত্র। এরশাদ জাপার প্রতিষ্ঠাতা। সাদ তার ছেলে। জিএম কাদের এরশাদের ভাই। উত্তরাধিকারী হিসেবে সাদের অধিকার বেশি। তিনিই জাপার পরবর্তী 'কাণ্ডারি'। এই নেতার অভিযোগ, জিএম কাদের একক সিদ্ধান্তে দল চালাচ্ছেন। যাকে ইচ্ছা বাদ দিচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই প্রবীণ নেতার দাবি, তারা প্রতিকার পেতেই সাদকে সামনে রেখে এগোচ্ছেন।

এরশাদের উত্তরাধিকারী কে হবেন- এ বিরোধও বহু পুরোনো। জিএম কাদের ও রওশন এরশাদের বিরোধ প্রায় দুই যুগের। গত জুলাইয়ে এরশাদের মৃত্যুর পর দেবর-ভাবির বিরোধ একেবারে প্রকাশ্যে চলে আসে। মৃত্যুর আগে ছোট ভাই জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করে যান এরশাদ। তার মৃত্যুর চার দিনের মাথায় জিএম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান রওশন এরশাদ। এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া বিরোধী দলের নেতার পদে জিএম কাদের বসতে চাইলে দেবর-ভাবির বিরোধ চরমে পৌঁছে।

জাপার ভাঙন ঠেকাতে দুই পক্ষের সমঝোতা বৈঠকের পর রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতার পদ ছেড়ে দিয়ে উপনেতা হন জিএম কাদের। জিএম কাদের শুরুতে রাজি না হলেও শেষ পর্যন্ত সাদকেই এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনে জাপার প্রার্থী করা হয়।

গত ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে জাপার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জিএম কাদের। এর সপ্তাহ দুই আগে চেয়ারম্যান পদে নিজের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন রওশন এরশাদ। তবে তার জন্য আলংকারিক ক্ষমতাহীন 'প্রধান পৃষ্ঠপোষক' পদ দেন জিএম কাদের। বহু বছর ধরে যারা জাপায় রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত, তারা কাউন্সিলে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়ে জিএম কাদের শিবিরে ভিড়েছেন।

ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, মুজিবুল হক চুন্নু বরাবরই রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গত সেপ্টেম্বরে তারা রওশনের পক্ষ নিয়ে কাদেরপন্থিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকও করেন। তবে তারা তিনজনই কো-চেয়ারম্যান পদ পেয়েছেন। এখন তাদের নিয়মিত জিএম কাদেরের পাশে দলের অনুষ্ঠানে দেখা যায়, যা অতীতে কখনই দেখা যেত না।

কাউন্সিলের পর ফের শুরু হয় দেবর-ভাবির বিরোধ। জিএম কাদের যাদের কমিটি থেকে বাদ দিয়েছেন, তাদের দলীয় 'পদ দিয়ে' চিঠি দেন রওশন এরশাদ। সাদকে কো-চেয়ারম্যান পদে 'নিয়োগ' দেন তিনি। যদিও জিএম কাদের তার ভাতিজাকে দলের ১৬ যুগ্ম মহাসচিবের মধ্যে ১৪তম স্থান দিয়েছেন।

তিনি জাপার কো-চেয়ারম্যান না যুগ্ম মহাসচিব- এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গেছেন সাদ এরশাদ। তিনি সমকালকে বলেছেন, তিনি জাপার এমপি ও কর্মী। জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে কেমন করছেন- এ প্রশ্নে তিনি বলেছেন, 'শুধু জিএম কাদের নয়, মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁও ভালো করছেন। সবাই মিলেই তো দল।'

তার মায়ের সঙ্গে জিএম কাদেরের দীর্ঘদিনের বিরোধের ইতিহাস, তাকে দলীয় রাজনীতি থেকে একরকম অবসরে পাঠানো হয়েছে- এসব বিষয়ে সাদ এরশাদ বলেন, ঘৃণা নয়, নতুন রাজনীতি শুরু করেছি।