রাজনীতি

উপকমিটিতে বিতর্কিতদের ঠেকাতে সতর্ক আ'লীগ

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অমরেশ রায়

দলের উপকমিটি গঠন নিয়ে সতর্ক আওয়ামী লীগ। শীর্ষ নেতাদের শঙ্কা, বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীরা বিভাগীয় উপকমিটিগুলোতে ঢুকে পড়তে পারেন। সেজন্য সংশ্নিষ্টদের কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশাল আকারের উপকমিটি গঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে সদস্য সংখ্যা। চলতি মাসের মধ্যেই স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের নিয়ে সব উপকমিটি পূর্ণাঙ্গ করার প্রচেষ্টাও চলছে জোরেশোরে। সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকেও উপকমিটি গঠন নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে উপকমিটির সদস্য পরিচয় দিয়ে কারও কারও দুর্নীতি-অপকর্মে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সমালোচনামুখর হয়ে ওঠেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপকমিটির সদস্য পরিচয় দিয়ে নানা অপকর্মে যুক্ত ও গ্রেপ্তার হওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদের প্রসঙ্গে তুমুল সমালোচনা হয়। এর পরই প্রতিটি সম্পাদকীয় বিভাগের জন্য পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের নিয়ে এবং সর্বোচ্চ ৩৫ সদস্য মনোনয়ন দিয়ে চলতি মাসের মধ্যেই সব উপকমিটি পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ওই বৈঠক থেকেই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সবা উপকমিটি পূর্ণাঙ্গ করে কেন্দ্রে জমা দেওয়ার জন্য বিভাগীয় সম্পাদকদের নির্দেশ দেন। বিভাগীয় সম্পাদকদের জমা দেওয়া উপকমিটিগুলো যাচাই-বাছাই শেষে এবং দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে চলতি মাসের মধ্যে এসব উপকমিটি ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছেন ওবায়দুল কাদের।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে বর্তমানে ১৯টি বিভাগীয় সম্পাদকের পদ রয়েছে। এ ছাড়া এবার থেকে আটজন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের জন্যও একটি করে উপকমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ হিসেবে এবার ২৭টি বিভাগীয় উপকমিটি গঠনের কথা রয়েছে। বেশ কয়েকজন সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিভাগীয় সম্পাদক জানিয়েছেন, কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী নিজ নিজ উপকমিটি গঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। বেঁধে দেওয়া সময় অর্থাৎ ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই উপকমিটিগুলো জমা দিতে পারবেন বলে আশা করছেন তারা। আর কোনো অবস্থায়ই বিতর্কিত ও অপকর্মে লিপ্ত অনুপ্রবেশকারীদের উপকমিটিতে ঠাঁই দেওয়া হবে না।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী সমকালকে বলেন, তার বিভাগের উপকমিটি আগেই তৈরি করা আছে। এখন যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট আকারে উপকমিটি পূর্ণাঙ্গ করে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই কেন্দ্রে জমা দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এবার বিতর্কমুক্ত ও স্বচ্ছ উপকমিটি গঠন প্রশ্নে সব বিভাগীয় সম্পাদকই ঐক্যবদ্ধ। বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারী কাউকেই উপকমিটিতে রাখা হবে না। নেত্রীর (শেখ হাসিনা) নির্দেশে ত্যাগী, দক্ষ, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী আদর্শবান এবং পরিশ্রমীদেরই উপকমিটিতে মূল্যায়ন করা হবে।
কয়েকজন নেতা বলেছেন, দলের উপকমিটি নিয়ে সম্প্রতি ও অতীতের চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতেই আওয়ামী লীগের পক্ষে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাস রোগীদের চিকিৎসা ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে নানা দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপকমিটির সদস্য পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিষয়টি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এমন প্রেক্ষাপটে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ক্ষুব্ধ হন। মূলত দলীয় প্রধানের নির্দেশেই উপকমিটির বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি।
নেতারা আরও বলেন, দলের ভেতরেও উপকমিটি গঠন প্রক্রিয়া এবং এর আকার নিয়ে নানা সমালোচনা ছিল। উপকমিটির সদস্য সংখ্যা নির্দিষ্ট না থাকার সুযোগে ঢালাওভাবে অবাঞ্ছিতরা ঢুকে পড়ায় নেতৃত্বের মান থাকছিল না। বিশাল আকারের উপকমিটির সদস্য হয়ে অনেক নেতা ও অবাঞ্ছিতরা সাংগঠনিক পরিচয়ের ভিজিটিং কার্ড বানিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তদবির, টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত হন। আবার আওয়ামী লীগের পুরো মেয়াদে দু-একটি উপকমিটি ছাড়া বেশিরভাগই সাংগঠনিক তেমন কোনো কর্মকাণ্ডেও যুক্ত থাকেন না। অথচ অনুপ্রবেশকারী কারও কারও অপকর্মের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।
গত বছরের ২০ ও ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলে সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের বিভাগীয় উপকমিটির সহসম্পাদক পদ বিলুপ্ত করে সবাইকে সদস্য হিসেবে রাখার বিধান চালু হয়। তবে একটি সম্পাদকীয় বিভাগের জন্য উপকমিটির সদস্য কতজন থাকবেন, সেটা সুনির্দিষ্ট করা নেই। এর আগে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ২০তম জাতীয় কাউন্সিলে প্রতিটি সম্পাদকীয় বিভাগের জন্য অনূর্ধ্ব পাঁচজন করে সহসম্পাদক মনোনয়নের বিধান করা হলেও বাস্তবে প্রতিটি বিভাগেই অসংখ্য সহসম্পাদক কিংবা সদস্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালে ঘোষিত ১৯টি সম্পাদকীয় বিভাগের ওইসব উপকমিটিতে বিএনপি-ছাত্রদল-শিবির, এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সদস্যরাও ঢুকে পড়েন। সন্ত্রাস-দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মে জড়িত, প্রভাবশালী নেতাদের বাড়ির কর্মচারী ও বাজার-সদাই করে দেওয়া ব্যক্তি এবং অখ্যাত ও অপরিচিতদেরও ঠাঁই দেওয়া হয়েছিল উপকমিটিগুলোতে। ফলে উপকমিটি থেকে বাদপড়া ত্যাগী ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা এ নিয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই সব উপকমিটি বাতিল করা হয়।
এর আগে ২০১২ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে উপকমিটির ৬৬ জন সহসম্পাদকের নাম অনুমোদন দেওয়া হয়। যদিও পরে দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা নানাভাবে কয়েকশ' জনকে সহসম্পাদক পদে অন্তর্ভুক্ত করে চিঠি দেন। এক সময় এই সংখ্যা পাঁচ শতাধিকে দাঁড়ায়। সে সময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা সহসম্পাদকের প্রকৃত সংখ্যা কত নিজেরাও বলতে পারতেন না। বিরক্ত হয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ধানমন্ডিতে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে এ বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন।
২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে দলটির গঠনতন্ত্রে প্রথমবারের মতো উপকমিটি রাখার সিদ্ধান্ত হয়। সে সময় উপকমিটিতে যারা অন্তর্ভুক্ত হন, তারা সবাই সহসম্পাদক পদধারী ছিলেন। তখন সাবেক ছাত্রনেতা ও দলের ত্যাগী নেতাদের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে ৬০-৭০ জনকে উপকমিটির সহসম্পাদক করা হতো। যাদের অনেকেই পরে কেন্দ্রীয় কমিটিতেও স্থান পেয়েছেন। পরের কমিটিতে কোনো সহসম্পাদক পদ ঘোষণা হয়নি।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, গত কয়েকটি উপকমিটিতে অনেক বেশি ও বিতর্কিতদের সদস্য হিসেবে যুক্ত করার ফলে দলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি ও সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে এবার সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও সতর্কতার সঙ্গে উপকমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে এ নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনো সমস্যা হবে না।

বিষয় : আ'লীগ