পাঁচ আসনে উপনির্বাচন

আন্দোলনের অংশ হিসেবেই ভোটে বিএনপি

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

লোটন একরাম

নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে আন্দোলনের অংশ হিসেবেই আসন্ন পাঁচ উপনির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারক নেতারা মনে করেন, এই নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বিজয়ী হলেও লাভ এবং হারলেও লাভ।

সূত্রমতে, বিশেষ করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করে অনিয়ম ও কারচুপির মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার প্রমাণাদি দেশি-বিদেশিদের দেখাতে চায় দলটি। আবার সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে দলীয় প্রার্থী বিজয়ী হলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমেছে- এটা প্রমাণ করা সহজ হবে। তা ছাড়া নির্বাচনে অংশ না নিলে রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিকভাবেও দল ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করেন সিনিয়র নেতারা। এসব হিসাব-নিকাশ কষেই বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েও এখন সরে এসেছে বিএনপি।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সমকালকে বলেন, আগামী দিনের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা  করেই আমরা কৌশল পরিবর্তন করেছি। এখন আমরা সব নির্বাচনেই অংশ নিচ্ছি এবং নেব। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আমাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস এবং গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়ার একদলীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণ আরও স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীরা সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবেন এবং দল চাঙ্গা হবে বলেও তারা মনে করেন।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানান, বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনমুখী দল। নির্বাচনের বাইরে থাকলে রাজনীতি ও সংগঠনের ক্ষতি হয়। এরই মধ্যে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে গেছে। পাঁচ বছর জাতীয় সংসদে সরকারের সমালোচনা করার মতো কার্যকর কোনো বিরোধী দল ছিল না। 'গৃহপালিত বিরোধী দল' দিয়ে সরকার যা খুশি তা-ই করেছে। ওই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় বিএনপির দেশি-বিদেশি শুভানুধ্যায়ীরাও 'ভুল' সিদ্ধান্ত বলে সমালোচনা করেছেন। যে দাবিতে তারা ওই নির্বাচন বর্জন করেছিলেন, সেই দাবি পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও দেশি-বিদেশিদের চাপের মুখে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। ওই নির্বাচনে অংশ নিয়েও তারা প্রমাণ করেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এতে বিএনপির  দাবি আরও জোরালো হয়েছে। আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে আরও যৌক্তিক প্রমাণ করতে এ উপনির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। এমনকি আগামী সোয়া তিন বছরও সংসদের উপনির্বাচনসহ সব স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও অংশ নেওয়ার কৌশল নিয়েছে বিএনপি।

অবশ্য উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যেও কিছুটা মতপার্থক্য ছিল। বেশির ভাগ নেতা এই নির্বাচন কমিশন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আরও 'স্পষ্ট' করতে এবং নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে সবাই একমত হন। তবে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস কম। এমনকি কোনো আসনে প্রার্থীদের মধ্যেও আগ্রহ কম। দল নির্বাচনে যাচ্ছে, তাই তারা অংশ নিচ্ছেন। আগামী নির্বাচনের জন্য আসন ধরে রাখার অংশ হিসেবে মাঠ দখলে রাখতে চাইছেন তারা। আবার বিজয়ী হয়ে গেলেও সংসদ সদস্য হিসেবে বাকি তিন বছর নানা সুযোগ-সুবিধাও পাবেন- এমনটি ভাবছেন প্রার্থীরা। এসব হিসাব-নিকাশ এখন প্রার্থীরা স্ব-স্ব আসনে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঠে নামাতে নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে মামলা-হামলা মাথায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত নেতাকর্মীরা কতটা সক্রিয় হবেন- তা নিয়ে সন্দিহান অনেক প্রার্থী।

পাবনা-৪ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব মনোনয়ন পেয়েছেন। বিগত নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ঢাকা-৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন দলের বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ। নওগাঁ-৬ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করবেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলাম। ঢাকা-১৮ এবং সিরাজগঞ্জ-১ আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর এই দুই আসনে দলীয় প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হবে।

অবশ্য গত শনিবার বিএনপির পার্লামেন্টারি বোর্ডে সাক্ষাৎকার দিতে আসা প্রার্থীদের সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়ান। ঢাকা-১৮ আসনের দুই মনোনয়নপ্রত্যাশী মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক এম কফিল উদ্দিন ও মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীরের সমর্থকদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে জড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এস এম জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে ঢাকা-১৮ আসনে বাকি মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। তাকে মনোনয়ন না দিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্যদের কাছে চিঠি দিয়েছেন তারা। জাহাঙ্গীরকে মনোনয়ন দিলে পদত্যাগ করার হুমকি দিয়েছেন তারা।

বিগত নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-১ আসনে কণ্ঠশিল্পী রোমানা মোর্শেদের (কনকচাঁপা) বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। এবার তিনি নির্বাচন করতে আগ্রহী নন। এ পরিস্থিতিতে এবার কাজীপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজার মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ ছাড়া অন্যতম মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি নাজমুল হাসান তালুকদার রানাও।

বিএনপির ঢাকা-৫, পাবনা-৪ ও নওগাঁ-৬ আসনের উপনির্বাচনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। ইতোমধ্যে পাবনা-৪ আসনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী করা হয়েছে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে। ইতোমধ্যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি এ আসনে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছে। ঢাকা-৫ আসনে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এখনও গঠন করা হয়নি। এ আসনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস অথবা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রধান সমন্বয়কারী করা হতে পারে। নওগাঁ-৬ আসনে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানর মিনু বা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুকে প্রধান সমন্বয়কারী করা হতে পারে। আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব না পেলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে এসব কেন্দ্রীয় নেতারা দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও পাবনা-৪ আসনের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সমকালকে জানান, ইতোমধ্যে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি একবার নির্বাচনী এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে আসছেন। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হলে বিএনপি প্রার্থী জয়ী হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর পাবনা-৪ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা-৫ এবং নওগাঁ-৬ আসনের উপনির্বাচন হবে ১৭ অক্টোবর। ঢাকা-১৮ এবং সিরাজগঞ্জ-১ আসনের উপনির্বাচনের দিনক্ষণ এখনও ঠিক হয়নি। গত শনিবার এই দুই আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেয় বিএনপির পার্লামেন্টারি বোর্ড।

প্রসঙ্গত, ঢাকা-৫ আসনের এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লা, ঢাকা-১৮ আসনের এমপি আডভোকেট সাহারা খাতুন, সিরাজগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোহাম্মদ নাসিম, নওগাঁ-৬ আসনের এমপি ইসরাফিল আলম ও পাবনা-৪ আসনের এমপি শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর মৃত্যুতে এই আসনগুলো শূন্য হয়েছে। তারা আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য।