পাঁচ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। কারণ দলঘোষিত প্রার্থীকে মেনে নিতে চাইছেন না অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। অন্যদিকে মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীর সমর্থকরাও নানা বিরোধে জড়িয়ে পড়ছেন সদ্যপ্রয়াত এমপিদের সমর্থক নেতাকর্মীদের সঙ্গে। এরই মধ্যে ঢাকা-৫ ও পাবনা-৪ আসনে মনোনয়নকেন্দ্রিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। অন্য আসনগুলোতেও পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ববিরোধ মেটাতে তৎপর হয়ে উঠেছেন কেন্দ্র থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। তারা মনে করছেন, পুরো মাত্রায় নির্বাচনী কার্যক্রম ও ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করলে দ্বন্দ্ব-কোন্দলে জড়িত সব পক্ষকে এককাতারে নিয়ে এসে সর্বাত্মক নির্বাচনী প্রচারকাজ চালাতে সমস্যা হবে না। এর পরও যারা দল মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নেবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর পাবনা-৪ এবং ১৭ অক্টোবর ঢাকা-৫ ও নওগাঁ-৬ আসনে উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। করোনার কারণে ইসি বাকি দুটি আসন সিরাজগঞ্জ-১ ও ঢাকা-১৮-এর উপনির্বাচন ৯০ দিন পিছিয়েছে। ক্ষমতাসীন দল থেকে ঢাকা-৫-এ যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, পাবনা-৪-এ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান বিশ্বাস এবং নওগাঁ-৬-এ রানীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন হেলালকে প্রার্থী করা হয়েছে।

নেতারা বলছেন, সদ্যপ্রয়াত এমপিদের পরিবার ও কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে এমপিবিরোধী ও দলীয় প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের দ্বন্দ্ব-কোন্দলই মূলত উপনির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। এমপিবিরোধী হিসেবে পরিচিত এসব নেতাকর্মী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কোণঠাসা হয়ে ছিলেন। প্রয়াত কয়েকজন এমপি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা ও নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু আসন্ন উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ায় তারা এখন অনেকটাই 'শক্তিহীন'। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নির্যাতিত নেতাকর্মীদের অনেকেই দলীয় প্রার্থীকে 'সমর্থন' দিয়ে এলাকায় প্রভাব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হামলা ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন।

এখন পর্যন্ত ঘোষিত তিনটি আসনের উপনির্বাচনেই প্রয়াত এমপির পরিবারের কাউকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। ঢাকা-৫ আসনে চারবারের এমপি সদ্যপ্রয়াত হাবিবুর রহমান মোল্লার ছেলে ও ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা সজল দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেও তাকে প্রার্থী করা হয়নি। পাবনা-৪ আসনে টানা পাঁচবারের এমপি ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর স্ত্রী ও ঈশ্বরদী উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগ সভাপতি কামরুন নাহার শরীফ এবং বড় ছেলে ও ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য গালিবুর রহমান শরীফসহ তার পরিবারের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছয়জনের কারও ভাগ্যেই মনোনয়ন জোটেনি। নওগাঁ-৬ আসনের প্রয়াত এমপি ইসরাফিল আলমের স্ত্রী সুলতানা পারভিন বিউটিও মনোনয়ন পাননি।

দলের নীতিনির্ধারক নেতাদের কয়েকজন বলেছেন, প্রয়াত এমপিসহ তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই নানা অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে। এ কারণে তারা দলীয় মনোনয়ন পাননি। তিন আসনেই দলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়েছে।

তবে উপনির্বাচনকে ঘিরে দলীয় প্রার্থী ও মনোনয়নবঞ্চিত এমপি পরিবারের সমর্থকদের দ্বন্দ্ব নির্বাচনী এলাকাগুলোতে সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। পাবনা-৪ আসনের উপনির্বাচন সামনে রেখে গত ১৪ সেপ্টেম্বর দলীয় প্রতিনিধি সভায় অভ্যন্তরীণ সংঘাতে আহত হয়েছেন ২৫ জন। ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে দলীয় প্রার্থী এবং মনোনয়নবঞ্চিত ডিলু পরিবারের সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা-৫ আসনে দলীয় প্রার্থী কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর সমর্থক কাউন্সিলর প্রার্থী চপলের কর্মীদের সঙ্গে প্রয়াত এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লার ঘনিষ্ঠ ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৬৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাসুদুর রহমান মোল্লা বাবুলের কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাসহ একটি ক্লাব দখলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ওই সংঘর্ষে কয়েকজনকে কুপিয়ে আহত করার পাশাপাশি আরও আটজনকে মারধর করা হয়। এর ফলে আসন দুটিতে চলছে উত্তেজনা।

নেতারা বলছেন, উপনির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী হলেও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এমপি সমর্থক নেতাকর্মীরা শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামবেন কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ছড়াছড়ি ছিল। সিরাজগঞ্জ-১ আসনে মাত্র তিনজন মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও বাকি চারটিতে সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৫৬ জন দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। মনোনয়নপ্রত্যাশী সব নেতার অসন্তোষ দূর করে তাদের নির্বাচনী কার্যক্রমে সমন্বিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে।

অবশ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা প্রত্যেক মনোনয়নপ্রত্যাশীকেই মাঠে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। মনোনয়ন না পাওয়া প্রার্থীদের সঙ্গে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। নতুন করে কেউ যেন সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে না পারেন, সে বিষয়ে কঠোর মনিটরিংও করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের উপনির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতা ও দলের সভাপতিম লীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক সমকালকে বলেন, আওয়ামী লীগের মতো বড় দলে একটি আসনে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকবেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। আসন্ন উপনির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। তবে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলে শেষ পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতাকর্মীই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনীত নৌকার প্রার্থীর পক্ষে সর্বাত্মক প্রচারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়বেন।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, যিনি নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন তার পক্ষে সব মনোনয়নপ্রত্যাশী কাজ করবেন- এটাই আওয়ামী লীগের রীতিনীতি। যারা দলের শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।