রাজনীতি

সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ

আজ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অমরেশ রায়

করোনাকালে ঝিমিয়ে পড়া আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলের সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি পূর্ণাঙ্গকরণ, বিভাগীয় উপকমিটি চূড়ান্ত করা এবং শূন্য হওয়া সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামছে ক্ষমতাসীন দলটি।
এর আগে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের সমন্বয়ে বিভাগভিত্তিক সাংগঠনিক টিমগুলোর মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ হওয়া দলের বিভাগীয় উপকমিটি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি যাচাই-বাছাই করা হবে। যাতে কোনো অবস্থায় বিতর্কিত কেউ এসব কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে দল ও সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারেন।
এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। আজ শনিবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে সভাপতিত্ব করবেন।
দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের ইস্যুগুলো নিয়ে আজকের বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে করোনার কারণে দীর্ঘদিন আটকে থাকা দলের বেশ কয়েকটি সাংগঠনিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নেতারা বলছেন, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগসহ দলের সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ এবং শ্রমিক লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও করোনার কারণে এতদিন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা যায়নি। একই সঙ্গে দলের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলের আগে-পরে ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৩১টি জেলার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরে করোনার কারণে জেলা সম্মেলন কার্যক্রম যেমন স্থবির হয়ে যায়, তেমনি যেসব জেলার সম্মেলন হয়েছে, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটিও গঠন আটকে যায়।
এই অবস্থায় গত মাসের শেষ ভাগে দলের সভাপতিমণ্ডলীর বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব সহযোগী সংগঠন এবং জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলো জমা পড়লেও যাচাই-বাছাই শেষ না করে কোনো কমিটিই ঘোষণা করা হবে না। এজন্য পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলো প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় নেওয়া হবে।
এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগসহ অন্য পাঁচটি সহযোগী সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটিই কেন্দ্রে জমা পড়েছে। সেই সঙ্গে দলের ১৯টি কেন্দ্রীয় সম্পাদকীয় বিভাগের বেশিরভাগের উপকমিটির খসড়া তালিকাও জমা পড়েছে। দলীয় নির্দেশনা মেনে উপকমিটিগুলোর আকার সর্বোচ্চ ৩৫ সদস্যের মধ্যে রেখে কেন্দ্রে জমা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিক, সম্মেলন হওয়া ৩১টি জেলার মধ্যে প্রায় ২৫টির মতো জেলার খসড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটিও কেন্দ্রে জমা পড়েছে। অবশ্য দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কোন্দলের কারণে কোনো কোনো জেলা থেকে একাধিক কমিটিও জমা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একাধিক জেলা থেকে দ্বন্দ্ব-কোন্দলে জড়িয়ে পড়া জেলা সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ থেকে পৃথক কমিটি জমা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কোথাও দল ভারী করতে গিয়ে বিতর্কিত, অনুপ্রবেশকারীসহ নানা অপরাধ কর্মে জড়িতদের নামও খসড়া কমিটির তালিকায় রয়েছে।
সূত্রমতে, এসব পূর্ণাঙ্গ কমিটি যাচাই-বাছাইসহ সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দলের পক্ষ থেকে আটটি বিভাগের জন্য আটটি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। দলের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্যের নেতৃত্বে এবং সংশ্নিষ্ট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদককে সমন্বয়ক করে এসব সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটিগুলোতে বিভাগীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যরাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের আজকের বৈঠকে প্রস্তাবিত এসব সাংগঠনিক কমিটি চূড়ান্ত করা হতে পারে।
দলীয় নেতারা বলছেন, আজকের বৈঠকে আগামীতে দলের সাংগঠনিক কর্মপরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হবে। বিশেষ করে করোনাভাইরাসের কারণে ঝিমিয়ে পড়া সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারে নতুন কী পরিকল্পনা নেওয়া যায়, সেটা নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত আসতে পারে। বৈঠকে শূন্য হওয়া পাঁচটি আসনের উপনির্বাচন এবং জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ আগামী দিনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হবে।
প্রায় সাত মাস পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার দিনই গত ৯ মার্চ কার্যনির্বাহী কমিটির জরুরি বৈঠক ডেকে করোনার কারণে 'মুজিববর্ষের' সব কর্মসূচিসহ সব সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করে ক্ষমতাসীন দলটি। প্রায় ছয় মাস পর গত মাসের শুরু থেকে আবারও সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেছে আওয়ামী লীগ।
তবে করোনার কারণে আজকের বৈঠকটি কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে দলের সভাপতি শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে সীমিত সংখ্যক সদস্য নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। ৮১ সদস্য কার্যনির্বাহী সংসদের মধ্যে বর্তমানে আছেন ৭৫ জন। তবে অনেকেই এই বৈঠকে আমন্ত্রণ পাবেন না। কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের ৩৪ জন নেতাকে নিয়ে এই বৈঠকটি হবে। বৈঠকে যারা উপস্থিত থাকবেন, তাদের ইতোমধ্যে টেলিফোন করে আমন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা বাড়তে পারে বলেও জানা গেছে।
এরই মধ্যে গত ১৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তৃণমূলে পাঁচ দফা সাংগঠনিক নির্দেশনাও পাঠানো হয়েছে সব জেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে। এই পাঁচ দফার মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ বাকি সাংগঠনিক জেলাগুলোতে সম্মেলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে জেলা সম্মেলনের আগে তৃণমূলে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের অংশ হিসেবে জেলার অধীন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা সম্মেলনগুলো শেষ করতে বলা হয়েছে। নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ত্যাগী-পরীক্ষিত-সৎ, বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও করোনাকালে যারা দেশের মানুষের কল্যাণে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদের মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি কড়াকড়িভাবে প্রতিপালন এবং করোনা মহামারি প্রতিরোধে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে নেতাকর্মীদের কাজ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সসদ্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান সমকালকে বলেছেন, করোনার কারণে স্থবির হয়ে পড়া আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক থেকেও এ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা আসতে পারে।
একই বক্তব্য দিয়ে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী ও জোরদারের প্রসঙ্গটি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে।