রাজনীতি

সম্মেলনের দশ মাসেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অমরেশ রায়

সম্মেলনের দশ মাস পরও পূর্ণাঙ্গ কমিটি পায়নি আওয়ামী লীগের পাঁচটি সহযোগী সংগঠন। একই অবস্থা দলের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণসহ ৩১টি সাংগঠনিক জেলা কমিটিরও। কেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে সবাই। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, এদিকে অনুপ্রবেশকারী, বিতর্কিত ও নানা অপকর্মে যুক্ত ব্যক্তিদের কমিটিগুলোতে প্রবেশ ঠেকাতে অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলো যাচাই-বাছাইসহ দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারে আটটি বিভাগীয় টিম গঠন করা হয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতি, চলমান উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যস্ততাসহ নানা কারণে যাচাই-বাছাই শুরু করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় টিমের নেতারা। অবশ্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার আশাও করছেন তারা।
গত ৬ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় জমা হওয়া পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলো দুই পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা প্রথমে যাচাই-বাছাই করে খসড়া তৈরি করবেন। আর সাংগঠনিক জেলাগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি যাচাই-বাছাই হবে বিভাগীয় টিমগুলোর মাধ্যমে। সহযোগী সংগঠনের কমিটিগুলো যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেবেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যস্ততা কমলেই এই যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
সহযোগী সংগঠনগুলোর অবস্থা :গত বছরের ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের আগে ৬ নভেম্বর কৃষক লীগ, ৯ নভেম্বর জাতীয় শ্রমিক লীগ, ১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং ২৩ নভেম্বর যুবলীগ ও ২৯ নভেম্বর মৎস্যজীবী লীগের সম্মেলন হয়। এই পাঁচ সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের দিনই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা দিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে জাতীয় শ্রমিক লীগ সম্মেলনের তিন দিনের মধ্যে ৩৫ সদস্যের কমিটির খসড়া দলীয় প্রধানের কাছে জমা দেয়। ২৩ নভেম্বর ১১১ সদস্যের খসড়া কমিটি জমা দিয়েছিল কৃষক লীগ। মৎস্যজীবী লীগের ১১১ সদস্যের খসড়া কমিটিও জমা পড়ে সম্মেলনের পরপরই। এরপর পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিতে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলে স্বেচ্ছাসেবক লীগের ১৫১ সদস্যের কমিটি জমা পড়ে। তবে সর্বশেষ বেঁধে দেওয়া সময়সীমা ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিতে পারেনি যুবলীগ। এ ব্যাপারে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল সমকালকে বলেছেন, করোনা পরিস্থিতিসহ নানা কারণেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিতে পারেননি তারা। তাছাড়া নতুন কমিটির নেতা হতে দেড় হাজারের বেশি জীবনবৃত্তান্ত জমা পড়েছে। এত বিপুলসংখ্যক জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই করে নেতৃত্ব বেছে নেওয়াটাও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এরপরও দ্রুত যাচাই-বাছাই শেষ করে কমিটি জমা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
কৃষক লীগের সভাপতি কৃষিবিদ সমীর চন্দ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ, জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক কে এম আযম খসরু এবং মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আজগর নস্কর অভিন্ন ভাষায় বলেছেন, অনেক আগেই তাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া জমা দেওয়া হয়েছে।
জেলা কমিটিগুলোর পরিস্থিতি :আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শাখা ঢাকা মহানগর উত্তর এবং দক্ষিণের সম্মেলন গত বছরের ৩০ নভেম্বর একসঙ্গে হয়েছিল। গত মাসে এই দুটি শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা পড়ে।
এ ছাড়া দলের জাতীয় সম্মেলনের আগে ও পরে অনুষ্ঠিত হয়েছে আরও ২৯টি সাংগঠনিক জেলার সম্মেলন। সেগুলো হচ্ছে সিলেট, সিলেট মহানগর, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা উত্তর, ফেনী, নোয়াখালী, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম উত্তর, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, রংপুর মহানগর, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, রাজশাহী, রাজশাহী মহানগর, কুষ্টিয়া, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, খুলনা, খুলনা মহানগর, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, বরিশাল মহানগর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ূয়া জানান, সম্মেলন হওয়া ৩১টি সাংগঠনিক জেলার প্রায় সবগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা পড়েছে। এগুলোই এখন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিভাগীয় টিমগুলোর কাছে পাঠানো হচ্ছে।
ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেছেন, তার বিভাগের ১৪টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৭টির সম্মেলন ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা পড়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতি এবং উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততার কারণে সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
বরিশাল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন জানান, তার বিভাগের যে তিনটি জেলার সম্মেলন হয়েছে, তার মধ্যে ঝালকাঠি জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটির বেশিরভাগ নেতার নাম সম্মেলনের দিন ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে এটা আর যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন পড়ছে না। পটুয়াখালী জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটিও দু'একদিনের মধ্যে এসে যাবে। বিভাগীয় টিমের সমন্বয়ক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও অন্যতম সদস্য কেন্দ্রীয় নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর অসুস্থতার কারণে বরিশাল মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনও তৈরি করা যায়নি।
অনুপ্রবেশকারী ও বিতর্কিতদের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা :জমা হওয়া পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলোর মধ্যে বিশেষ করে জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলো নিয়ে নানা অভিযোগ আসতে শুরু করেছে। কোনো কোনো জেলা কমিটির বিবদমান সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের পক্ষে আলাদা আলাদা কমিটি জমা দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ 'দলভারী' করতে ত্যাগীদের বাদ দিয়ে আত্মীয়স্বজন, অনুপ্রবেশকারী ও বিতর্কিতদের কমিটিতে ঠাঁই দিয়েছেন- এমন অভিযোগও রয়েছে।
তবে এবার দলের কোনো পর্যায়ের কমিটিতে কোনো ধরনের বিতর্কিত ও অপকর্মকারীদের ঠাঁই দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। বিতর্কিতদের বাদ দেওয়া এবং দলীয় কর্মী ছাড়া কাউকে পদ না দেওয়ার বিষয়ে কঠোর নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৩ অক্টোবর দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তিনি বলেছেন, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে যারা আওয়ামী লীগ গঠনে যুক্ত ছিলেন এমন প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি ত্যাগী, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করতে হবে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বিভাগীয় টিমের যাচাই-বাছাইয়ের পরই সব পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে। এতে কমিটি ঘোষণায় কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। তবে কোনো পর্যায়ের কমিটিতেই অনুপ্রবেশকারী, বিতর্কিত ও অপকর্মকারীদের ঠাঁই দেওয়া যাবে না। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সাংগঠনিক কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দুর্দিনের ত্যাগী পরীক্ষিত ও নিবেদিত নেতাকর্মীরা যাতে বাদ না পড়েন, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে নির্দেশও দিয়েছেন।

বিষয় : আওয়ামী লীগ