ভেঙে গেল গণফোরাম

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে গেল গণফোরাম। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে দলীয়প্রধান বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত বর্ধিত সভায় দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু ও নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাইয়িদসহ আটজন নেতাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।

বহিষ্কৃতরা হলেন- দলটির নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা জগলুল হায়দার আফ্রিক, হেলালউদ্দিন, লতিফুল বারী হামিম, খান সিদ্দিকুর রহমান ও আবদুল হাসিব চৌধুরী। তাদের মধ্যে হেলাল, লতিফুল, সিদ্দিকুর ও হাসিব চৌধুরীকে আগেই সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিল।

শনিবার দুপুরে এ সভায় ১২ ডিসেম্বর জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। আহ্বায়ক কমিটির ৭০ সদস্যসহ ১৩০ জন প্রতিনিধি এতে অংশ নেন বলে জানানো হয়।

গণফোরামের দুই অংশই শনিবার পৃথক কর্মসূচি পালন করে। একাংশ জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভেতরে আয়োজন করে বর্ধিত সভা, অপরাংশ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও সমাবেশের আয়োজন করে।

গত ১২ মার্চ দলটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর এটিই কমিটির প্রথম সভা। আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোকাব্বির খান এমপির সভাপতিত্বে সভায় গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া, কেন্দ্রীয় নেতা আওম শফিক উল্লাহ, মহসিন রশিদ, সুরাইয়া বেগম, জানে আলম ও মোশতাক আহমেদ মূল মঞ্চে ছিলেন। শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রতিনিধি ও কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা বক্তব্য দেন। বেইলি রোডের বাসা থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত থেকে বক্তব্য দেন ড. কামাল হোসেন।

দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আর কোন্দলে গত ২৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে বর্ধিত সভা করে কাউন্সিল করার ঘোষণা দেয় মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বাধীন অংশ। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে গণফোরামের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল হয়। তিন বছর পর পর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার বিধান থাকলেও এক বছরের মাথায় আবার কাউন্সিল আহ্বান করেন বিভক্ত নেতৃবৃন্দ। দলকে ব্যবহার করে আলাদা কাউন্সিল করার ঘোষণায় ক্ষুব্ধ দলটির সভাপতি ড. কামাল হোসেন ওইসব নেতাকে কারণ দর্শানোর চিঠি দেন। তারা চিঠির কোনো জবাব না দিয়ে উল্টো উকিল নোটিশ পাঠান ড. কামাল হোসেনের নামে। এবার তাদের বহিষ্কার করা হলো।

সভায় ড. কামাল হোসেন বলেন, গণতন্ত্র শুধু বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তবে প্রতিষ্ঠায় তৃণমূলে দলকে সংগঠিত করতে হবে। দেশে গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হবে। মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।

নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। দলকে জেলায় জেলায় সংগঠিত করুন, দলে তরুণ ও নারীর সংখ্যা বাড়ান। দলের পক্ষ থেকে সারাদেশে সভা-সমাবেশ করুন এবং গণফোরামের নীতি-আদর্শ সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরুন। বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলুন। এই সদস্য শুধু নামকাওয়াস্তে চাঁদা নেওয়ার জন্য নয়, যাদের সদস্য করা হবে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তনের জন্য তাদের কাজ করতে হবে।

বৈঠক শেষে গণফোরামের সদস্য মোশতাক আহমদ সভার লিখিত সিদ্ধান্ত পড়ে শোনান। এতে বলা হয়, আগামী ১২ ডিসেম্বর শনিবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও গঠনতন্ত্রবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার অভিযোগের বিষয়ে পাঠানো শোকজ নোটিশের জবাব না দেওয়ায় মন্টু, সাইয়িদ, সুব্রত ও জগলুলকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকেও বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গণফোরামের মহানগর নেতা হারুন তালুকদার এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দেন। তবে সভার অন্য সবাই হাততালি দিয়ে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে সমর্থন জানান। পরে সভার সভাপতি মোকাব্বির খান এমপি বলেন, বর্ধিত সভায় বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত পাস হয়েছে। তিনি বলেন, যারা দলীয় শৃঙ্খলা মানেন না, দলীয় সিদ্ধান্ত মানেন না, দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কথা শোনেন না, তাদের রেখে লাভ নেই। এ অবস্থায় একটি সংগঠন চলতে পারে না। প্রতিটি দলেই একটা নিয়ম থাকে, তার একটা গঠনতন্ত্র থাকে, সবাইকে সেই গঠনতন্ত্র মেনে চলতে হয়। আজ যেভাবে গণফোরামকে নিয়ে কতিপয় ব্যক্তি জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছেন, গণফোরামকে নিয়ে একটা খেলায় মেতে উঠেছেন, সেটা মেনে নেওয়া যায় না।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, এক দলকে ছেড়ে আরেক দল করা বা অন্য দলে চলে যাওয়া গণফোরামে এটা অনেক হয়েছে। কিন্তু দলকে ছেড়ে দলের ক্ষতি করার চেষ্টা করাটা অন্যরকম ব্যাপার।

এদিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভেতরে যখন গণফোরামের বর্ধিত সভা চলছিল, ঠিক তখন বাইরে দলটির অপর অংশ নারী-শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি পালন করে।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মোস্তফা মোহসীন মন্টু। বক্তৃতা করেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জগলুল হায়দার আফ্রিক, মেজর (অব.) আসাদুজ্জামান, খান সিদ্দিকুর রহমান, আইয়ুব খান ফারুক, আতাউর রহমান, হাসিব চৌধুরী, মাহমুদ-উল্লাহ মধু প্রমুখ।

মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, দেশব্যাপী নারী-শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও বলাৎকার বেড়ে চলেছে। দেশ, জাতি, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তি মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এর জন্য দায়ী চলমান জবাবদিহিহীন শাসন ব্যবস্থা। দেশের চলমান এ নৈরাজ্যজনক অবস্থার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তি, গণতান্ত্রিক সকল রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।