ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে কৌশলী বিএনপি

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে কৌশলী বিএনপি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ২১:৪৫ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ২১:৪৫

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের ইস্যুতে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে বিরোধী দল বিএনপি। সরাসরি কোনো পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে দলটি। অবশ্য সরকারই কৌশলী ভূমিকা নিয়েছে বলে দাবি করছেন বিএনপি নেতারা।

তবে গুরুত্বপূর্ণ এ ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করা উচিত বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। অন্যথায় মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যাবে বলে জানিয়েছেন তারা।

এদিকে বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, তারা নীরব নন। উভয় পক্ষকেই সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এ উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে সোশ্যাল হ্যান্ডেল এক্সে টুইট করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ওই বার্তাকেই বিএনপির অবস্থান বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। 

বিএনপি নেতাদের দাবি, ওই বার্তায় ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার দ্বন্দ্বের নজিরবিহীন বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে সব ধরনের সহিংসতার নিন্দা জানানো হয়েছে। অবিলম্বে রক্তপাত বন্ধ ও বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানে এগিয়ে আসতে জাতিসংঘ, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং বিশ্বনেতাদের প্রতি দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ সমকালকে বলেন, বিএনপি হয়তো এখনও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের নীরব থাকা উচিত নয়। এই ভয়াবহ যুদ্ধের ইস্যুতে বিএনপির নীরবতায় দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে। 

যেভাবে গাজার ওপর হামলা চালানো হচ্ছে, তা জেনোসাইড উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পরও বিএনপি যদি নীরব থাকে, তাহলে মানুষ ভাববে যুক্তরাষ্ট্র অখুশি হবে মনে করেই বিএনপি চুপ থাকছে। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান যাতে বহাল থাকে, সে ব্যাপারে হয়তো সতর্কতা অবলম্বন করছে দলটি। সুতরাং বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করা উচিত। 

বিএনপি নেতারা জানান, ফিলিস্তিন ইস্যুতে সরকারই কৌশলী ভূমিকা নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, বিএনপিও সরকারের লাইনে হাঁটছে। বিএনপি তো সরকারে নেই। বিষয়টিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখার দায়িত্ব সরকারের। তাদের বিবৃতি কিংবা উদ্যোগ নেওয়ার মতো অবস্থান রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলটিও আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইস্যুতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে। তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষ নেয়নি। সংঘাত বন্ধে তারাও উভয় পক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে। আর এটাই হচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান। সেখানে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের চেয়ারম্যান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে বিএনপি নীরব নয়। সবার আগে এই ইস্যুতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সরব হয়েছেন। তিনি সোশ্যাল হ্যান্ডেল এক্সে টুইট করেছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিভিন্ন বক্তব্যে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। এই ইস্যুতে বিএনপি চুপ রয়েছে– এমন তথ্য সঠিক নয়।

সূত্র জানায়, উদার গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি ফিলিস্তিন ইস্যুতে পশ্চিমাদের নীতি অনুসরণ করছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সুসম্পর্কের কারণে কোনোভাবেই বিতর্কিত কোনো অবস্থান নেবে না বিএনপি। এ কারণে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজে পক্ষে-বিপক্ষে না থেকে বিবৃতি দিয়েছেন। 

সাধারণত এ ধরনের ইস্যুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করে থাকেন। কিন্তু ফিলিস্তিন ইস্যুতে এবার তিনিসহ সব নেতাই কার্যত নীরব রয়েছেন। একটি সংবাদ পোর্টালকে বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সুসম্পর্কের কারণে কোনোভাবেই বিতর্কিত কোনো অবস্থান নেবে না বিএনপি।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, অবস্থানগত কারণে সরকারের যেসব বাধ্যবাধকতা থাকে, বিরোধী দলের সামনে তা ততটা না থাকায় তাদের সোচ্চার হওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু সেই সহজ জিনিসটাই এখন সম্ভবত বিএনপির জন্য অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি এখন সরকারের পতন ঘটানো প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমের ওপর অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি নিভর্রশীল হয়ে পড়েছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমাবেশে বলেছেন, ‘আমরা একা নই। পশ্চিমা বিশ্ব গণতন্ত্রের পক্ষে কমিটেড। এই অঙ্গীকার আমাদের সাহস জোগাচ্ছে।’ সেখানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরও বলেছেন, ‘পিটার হাস আমাদের জন্য অবতার হয়ে এসেছেন।’

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিসহ সব বিরোধী দল জানে, গোটা পশ্চিমই ইসরায়েলের অকুণ্ঠ সমর্থক। সে কারণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উচিত কথা বলে তারা বন্ধু তথা ‘অবতার’কে অখুশি করতে চান না। এর মধ্যে বাম ও ধর্মভিত্তিক ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোকে যতটুকু প্রতিবাদ করতে দেখা যাচ্ছে, সেটিও স্পষ্টতই দায়সারা গোছের বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা এও বলছেন, অতীত ইতিহাস অনুযায়ী মুসলিম দেশ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে শুধু বিএনপি নয়– সরকারি দলসহ অন্য সব দলের আরও সরব হওয়ার কথা। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই হয়তো সবাই কৌশলী ও দায়সারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন।

আরও পড়ুন

×