পদ-পদবি কেড়ে নেওয়াসহ দল থেকে বহিস্কার এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথ রুদ্ধ করার হুঁশিয়ারি দিয়েও বিদ্রোহ দমানো যাচ্ছে না আওয়ামী লীগে। পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ করে একের পর এক বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে চতুর্থ ধাপে ৫৬ পৌরসভার নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার হিড়িক পড়েছে।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত বিদায়ী মেয়র অনেকেই দলীয় সিদ্ধান্তকে অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। অথচ তাদের অনেকেই দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। কয়েকটি পৌরসভায় বিদায়ী মেয়ররা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও তাদের আত্মীয়স্বজন কেউ কেউ নির্বাচনে লড়ছেন। দলে তাদেরও পদ-পদবি রয়েছে।

আওয়ামী লীগ দলীয় এমপির আত্মীয়ও বিদ্রোহী প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন। নাটোর সদর পৌরসভায় বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য সাজেদুল আলম খান চৌধুরী। তিনি নাটোর-২ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলের ভগ্নিপতি। অবশ্য এই পৌরসভার নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়েছে।

কোনো কোনো পৌরসভায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকরাও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। অথচ বিদ্রোহী প্রার্থীদের সতর্ক করে দলের কড়া নির্দেশনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট বলেছেন, পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিজয়ীরা (বিদ্রোহী) ভবিষ্যতে দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসার সুযোগ পাবেন না। তারা (বিদ্রোহী) জয় পান কিংবা পরাজিত হোন, তাদের কোনো নির্বাচনে দলের মনোনয়ন দেওয়া হবে না। এটা আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত।

নাটোর পৌরসভায় আওয়ামী লীগ দলীয় এমপির একজন আত্মীয়ের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন সমকালকে জানিয়েছেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২৬ জানুয়ারি। এই সময়ের মধ্যে ওই বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে যেতে পারেন। এস এম কামাল হোসেন বলেছেন, জেলা কমিটি বিদ্রোহী প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করে তাদের দল থেকে অব্যাহতি দেবে। পরে ওই  কমিটি বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিস্কারের সুপারিশ কেন্দ্রে পাঠাবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্রীয় কমিটি।

এদিকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে দলীয়ভাবে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল পৌরসভায় বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি। দলের ছয় নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে বিদায়ী মেয়র আলমগীর সরকারও রয়েছেন। তিনি উপজেলা যুবলীগের সভাপতি। অন্য পাঁচ বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিউল ইসলাম, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নওরোজ কাউসার কানন, উপজেলা যুবলীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল খালেক, পৌর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য সাধন বসাক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা রোকনুল ইসলাম ডলার ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ইস্তেকার আলী।

ঠাকুরগাঁও সদরে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা তিন। তারা হচ্ছেন- জেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুল মজিদ আপেল, জেলা যুব মহিলা লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ তাহমিনা আখতার মোল্লাহ এবং জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক বাবলুর রহমান বাবুল। লালমনিরহাট সদরের বিদায়ী মেয়র রিয়াজুল ইসলাম রিন্টু বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য। এ ছাড়াও জেলা যুবলীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক রেজাউল করিম স্বপন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক। পাটগ্রামে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন কাজী আসাদুজ্জামান আসাদ। তিনি পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

রাজশাহীর নওহাটায় বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল বারী খান। গোদাগাড়ীতে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বিদায়ী মেয়র মনিরুল ইসলাম বাবু। চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। আলমডাঙ্গায় বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন মতিয়ার রহমান ফারুক। তিনি পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি বায়েজিদ হোসেন ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আফজাল হোসেন সনজিব দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদার উদ্দিন আহমেদ মাসুম বেপারি।

বরিশালের বানারীপাড়ায় বিদ্রোহী হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়াউল হক মিন্টু। মুলাদীতে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা পাঁচ। তারা হচ্ছেন পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আলমগীর হোসেন হিরণ হাওলাদার, উপজেলা কৃষক লীগের আহ্বায়ক দিদারুল আহসান খান, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওহিদুজ্জামান আনোয়ার তালুকদার, যুবলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য দেলোয়ার হোসেন হাওলাদার ও প্রজন্ম লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এম এ আজিজ।

টাঙ্গাইলের গোপালপুরে বিদ্রোহী হয়েছেন চারজন। তারা হচ্ছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন, উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক জিল্লুর রহমান শিহাব, কার্যনির্বাহী সদস্য বেলায়েত হোসেন ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক আশরাফুজ্জামান আজাদ। কালিহাতীতে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা হুমায়ুন খালিদ।

শেরপুর সদরে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম আজহার ও শ্রমবিষয়ক সম্পাদক আরিফ রেজা। শ্রীবরদীতে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মেরাজ উদ্দিন চৌধুরী ও উপজেলা যুবলীগের কার্যনির্বাহী সদস্য হাবিবুল্লা হবি বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। ময়মনসিংহের ফুলপুরে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাহজাহান।

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ হোসেন হাসু বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। সিলেটের কানাইঘাটে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা নিজাম উদ্দিন। তিনি বিদায়ী মেয়র। নরসিংদী সদরে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোন্তাজ উদ্দিন ভূইয়া, পৌর যুবলীগের সাবেক সভাপতি আশরাফুল হক সরকার, জেলা শ্রমিক লীগের সাবেক আহ্বায়ক রিপন সরকার ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক এস এম কাইয়ুম। মাধবদীতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে বিদায়ী মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য শেখ মোহাম্মদ নিজামের ভাই শেখ মোহাম্মদ নজরুল বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। রাজবাড়ী সদরে যুবলীগের স্থানীয় নেতা আলমগীর শেখ টিটু বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি সাবেক মেয়র শাহ আলম চৌধুরীর মেয়ে তাসলিমা চৌধুরী সিমিন এবং পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মিয়া বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।

ফরিদপুরের নগরকান্দায় বিদ্রোহী প্রার্থী চারজন। তারা হচ্ছেন পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দুলু, পৌর যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক কামরুজ্জামান মিঠু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুর রহমান সুইট ও পৌর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য আরিফ আহমেদ বিপ্লব। চাঁদপুরের কচুয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আহসান হাবিব প্রাঞ্জল।

নোয়াখালীর চাটখিলে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বিদায়ী মেয়র মোহাম্মদ উল্যাহ পাটওয়ারি ও যুবলীগের স্থানীয় নেতা বেলায়েত হোসেন। সোনাইমুড়ীতে জেলা যুবলীগের কার্যনির্বাহী সদস্য আবু সায়েম, উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক খলিলুর রহমান, পৌর যুবলীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় চারজন বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। তারা হচ্ছেন- উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি নুরুল হক ভূইয়া, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোবারক হোসেন রতন ও যুবলীগের স্থানীয় নেতা শফিকুল ইসলাম খান।

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর, কালাই, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, রাজশাহীর তানোর, তাহেরপুর, নাটোরের বড়াইগ্রাম, যশোরের চৌগাছা, বাগেরহাট সদর, সাতক্ষীরা সদর, জামালপুরের মেলান্দহ, নেত্রকোনা সদর, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, করিমগঞ্জ, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, কুমিল্লার হোমনা, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরের রামগতি, চট্টগ্রামের পটিয়া, খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা, বান্দরবান সদর, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও চট্টগ্রামের চন্দনাইশ পৌরসভায় কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই।

আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি এ সব পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে কোনো প্রার্থী না থাকায় ফেনীর পরশুরামে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নিজাম উদ্দিন আহমেদ শাজেল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।