দুই বছরের বেশি সময় ধরে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যেও বেহাল অবস্থায় বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলো। দলের ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ছাত্রদল ছাড়া অন্য সবক'টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব অঙ্গসংগঠনের নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেনি হাইকমান্ড। এতে একদিকে যেমন কাঙ্ক্ষিত নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না, তেমনি হতাশ ও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। আবার দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমও গতিশীল করা সম্ভব হচ্ছে না।
দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় এর আগে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়ে কয়েকটি অঙ্গসংগঠনের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। যেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে দেড় বছর আগে। অথচ মেয়াদোত্তীর্ণ সংগঠনগুলোর নতুন কমিটি গঠনের কোনো তোড়জোড় নেই। স্কাইপের মাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈঠক করলেও বাস্তবে এসব সংগঠনের কার্যক্রম জোরদার হচ্ছে না।
বিএনপির অঙ্গসংগঠন ৯টি আর সহযোগী সংগঠন দুটি। এ সবের মধ্যে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল মেয়াদ শেষ করেছে সুপারফাইভ কমিটি দিয়েই। মেয়াদ শেষে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে সম্প্রতি। কৃষক দল, মৎস্যজীবী দল, তাঁতি দল ও ওলামা দলের কমিটি ভেঙে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেসবের মেয়াদও শেষ হয়েছে অনেক আগে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো সংগঠনই কাউন্সিল করতে পারেনি। মহিলা দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগে। সহযোগী সংগঠনের মধ্যে শ্রমিক দলের মেয়াদ শেষ হয়েছে আরও চার বছর আগে। ছাত্রদলের কমিটি চলছে আংশিক কমিটি দিয়ে।
ছাত্রদল :২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কাউন্সিলে ফজলুর রহমান খোকন সভাপতি ও ইকবাল হোসেন শ্যামল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিন মাস পর ২০১৯ সালের ২১ ডিসেম্বর ৬০ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। বয়সের সীমা বেঁধে দিয়ে গঠিত সংগঠনের নতুন কমিটিকে গতিশীল করতে নানা চেষ্টা চালাচ্ছেন ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান। সারাদেশে সাংগঠনিক টিম গঠন করে তৃণমূল থেকে সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া অনেকটা শেষ পর্যায়ে। কিন্তু আন্দোলনের জন্য কেন্দ্রীয় ৮টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি পুনর্গঠন করতে পারেননি নেতারা। তিন মাসের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন করতে তারা দেড় বছর সময় নিয়েও কোনো কমিটি গঠন করতে পারেননি বলে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।
আবার দুই বছর মেয়াদি কেন্দ্রীয় কমিটির বয়স ১৬ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না হওয়ায় বিক্ষুব্ধ পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। গত বৃহস্পতিবার পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীরা সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে আগামী সোমবারের মধ্যে কমিটিকে পূর্ণাঙ্গকরণে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। এতে তারা বলেন, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সুপারফাইভ গত ১ জানুয়ারি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও পূর্ণাঙ্গকরণের আশ্বাস দিলেও তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিগত দিনের মতো এবারও টালবাহানা করা হচ্ছে। রাজপথে 'দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়' নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

যুবদল :বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন যুবদলের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১৭ জানুয়ারি। ২০১৭ সালে সাইফুল আলম নীরবকে সভাপতি ও সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে সাধারণ সম্পাদক করে সুপারফাইভ কমিটি ঘোষণা করা হয়। মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় এক মাস পর ১১৪ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে বিগত দিনের সাবেক ছাত্রদল নেতাদের পদায়ন সম্ভব হয়নি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি কবে ঘোষণা করা হবে, তা কেউ জানে না। সারাদেশে জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠনে তৎপর রয়েছে সংগঠনটি। এসব কমিটি গঠনেও নানান অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। আন্দোলন-সংগ্রামের প্রধান ক্ষেত্র ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যুবদলের কমিটিও রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণের তালিকায়। সুপারফাইভ কমিটি দিয়েই তাদের মেয়াদ শেষ হয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক দল :২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি ঘোষণা করেন বিএনপি মহাসচিব। ঘোষিত কমিটিতে সংগঠনের সভাপতি করা হয় প্রয়াত শফিউল বারী বাবুকে। সাধারণ সম্পাদক হন আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েল। মেয়াদ শেষের এক বছর পর গত ১৯ সেপ্টেম্বর সুপারফাইভ কমিটিকে ১৪৯ সদস্য বিশিষ্ট আংশিক কমিটি করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি কবে হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না। তবে সারাদেশে সাংগঠনিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে সংগঠনটির। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন থানা কমিটি গঠনে অনিয়মসহ অনেক জায়গায় বিতর্কিত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শ্রমিক দল :অভ্যন্তরীণ কোন্দল-গ্রুপিংয়ে হযবরল অবস্থার শিকার মেয়াদোত্তীর্ণ শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে ও সংগঠনে গতি আনতে বিএনপি নানা উদ্যোগ নিলেও তা কাজে লাগেনি। দু'বছরের কমিটি পা রেখেছে সাত বছরে। একাধিকবার সময় দিয়েও কাউন্সিল করতে পারেনি শ্রমিক দল। ২০১৪ সালের ১৯ ও ২০ এপ্রিল জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের জাতীয় কাউন্সিলে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়।
মহিলা দল :২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মহিলা দলের আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ এ কমিটিকে গত বছরের ৪ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ করা হয়। কিন্তু একাধিক গ্রুপে বিভক্ত এ সংগঠনকে এড়িয়ে চলছেন মহিলা দলের নেতাকর্মীরাই। এ সংগঠনের সাধারণ নেতাকর্মীরা এখন নারী ও শিশু অধিকার ফোরামসহ অন্যান্য সংগঠনে জড়িয়ে পড়ছেন। যুব মহিলা দল গঠনে দলের হাইকমান্ডের কাছে আবেদন-নিবেদন করছেন নেতাকর্মীরা।
জাসাস :২০১৭ সালের ১৯ জানুয়ারির গঠিত জাসাসের আংশিক কমিটিকে গত বছরের ২৩ নভেম্বর পূর্ণাঙ্গ করা হয়। কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকবলয়ের নেতাকর্মীদের পাল্লা ভারী করার প্রতিযোগিতায় বেশিরভাগ নতুন মুখ নিয়ে আসা হয়েছে, যারা কোনোদিন এ সংগঠনে সম্পৃক্তই ছিলেন না। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনো ভূমিকাই পালন করতে পারছে না বিতর্কিত জাসাস কমিটি। সংগঠনের নেতাকর্মীরা নতুন কমিটির দাবিতে তারেক রহমানের কাছে লিখিত দাবি জানিয়েছেন। তারা নতুন আহ্বায়ক কমিটির কয়েকটি খসড়াও জমা দিয়েছেন। জাসাসের অস্তিত্ব সংকট থাকায় বিএনপি মনোভাবাপন্ন শিল্পী, সাংস্কৃতিক জগতের প্রতিনিধিরা এ সংগঠনকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলছেন।
কৃষক দল :দীর্ঘ দুই দশক পর ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কৃষক দলের কমিটি ভেঙে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান দুদুকে আহ্বায়ক এবং কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনকে সদস্য সচিব করে ১৫৩ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু শক্তিশালী এ সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর কোনো প্রক্রিয়াই শুরু করা হয়নি। নতুন কমিটির দায়িত্বশীল এক নেতা লন্ডন যোগাযোগের মধ্যেই সংগঠনকে আটকে রেখেছেন বলে অভিযোগ নেতাকর্মীদের। তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয়দানকারী ওই নেতার ব্যাপারে সারাদেশের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মৎস্যজীবী দল :২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ১০ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ মৎস্যজীবী দলের কমিটিকে ভেঙে সংগঠনের সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম মাহতাবকে আহ্বায়ক ও আব্দুর রহিমকে সদস্য সচিব করা হয়। দেড় বছরের বেশি সময় পেরোলেও নতুন কমিটি গঠনের ধারেকাছেও যেতে পারেননি নেতারা। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দপ্তর শাখাকে কবজা করে কমিটি গঠনের কার্যক্রম প্রলম্বিত করছেন এক নেতা।
ওলামা দল :১৪ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ ওলামা দলের কমিটি ভেঙে ২০১৯ সালের ৫ এপ্রিল সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাওলানা শাহ মো. নেছারুল হককে আহ্বায়ক এবং মাওলানা নজরুল ইসলাম তালুকদারকে সদস্য সচিব করে ১৭১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। তবে মেয়াদ শেষে এখন পর্যন্ত কাউন্সিলের দিনক্ষণ নির্ধারণ করতে পারেননি এ সংগঠনের নেতারা। শুধু মিলাদ-মাহফিলের মধ্যেই সংগঠনের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, অভিযোগ নেতাকর্মীদের।
এসব কমিটির বাইরে মুক্তিযোদ্ধা দলের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ এবং তাঁতি দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলেও তার কোনো হদিস নেই।
এসব বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক তৎপরতা চলমান প্রক্রিয়া। সরকারের বাধা-বিপত্তিকে পাশ কাটিয়ে তাদের কাজ করতে হচ্ছে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম দীর্ঘদিন স্থগিত থাকায় পুনর্গঠন হয়ে ওঠেনি।