৭ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা। তারা বলেছেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা আর ভাষণ এক জিনিস নয়। সেদিন সমগ্র জাতি, মুক্তিকামী জনতা স্বাধীনতার ঘোষণার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করলেও তা দেওয়া হয়নি। বরং পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল- আসুন বসুন আলোচনা করুন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করুন। অবশ্য তখনকার প্রেক্ষাপটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ওই ভাষণই যুক্তিযুক্ত ছিল।’

রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় বিএনপি নেতারা এ দাবি করেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৭ মার্চ উপলক্ষে এই সভার আয়োজন করে বিএনপি। তবে ব্যানারে ৭ মার্চ আলোচনা সভার কথা লেখা থাকলেও বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কোনো উল্লেখ ছিল না।

সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অত্যন্ত সুপরিকল্পিভাবে নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস থেকে বঞ্চিত করে ভ্রান্ত ইতিহাস শেখাচ্ছে। একজন মানুষ, একটি পরিবার আর একটি গোষ্ঠীকে মহিমান্বিত করতেই তাদের সব প্রচেষ্টা।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বক্তব্যের কোথাও তোফায়েল আহমেদের কথা খুঁজে পাবেন না। তারা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কথা একবারও উচ্চারণ করে না। এমনকি যুদ্ধের সেনাপতি এমএজি ওসমানীর নামও একবারও উচ্চারণ করে না। আর যুদ্ধকালীন সরকারের যিনি নেতৃত্ব দিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, তার নামও একবারও উচ্চারণ করে না।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘৭ মার্চ একটা দিন, ২৬ মার্চ আরেকটা দিন। কিন্তু এর আগে দীর্ঘকাল ধরে এই দেশের মানুষ স্বাধিকারের জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছে। এটা কোনো একক ব্যক্তির অবদান নয়। স্বাধীনতা সমগ্র দেশের। এই স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছে হাজার হাজার তরুণ, যুবক, কৃষক, ছাত্র-ছাত্রী। এই স্বাধীনতার আমাদের মা-বোনেরা তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন।’

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘সংগ্রাম আর যুদ্ধ এক নয়। তাই শেরেবাংলার কথা, সোহরাওয়ার্দীর কথা, আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কথা, শেখ মুজিবুর রহমানের কথা, অলি আহাদের কথা উচ্চারণ করা প্রয়োজন। এই রকম অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা এই দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য সংগ্রাম করেছেন। আর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা মানুষকে যুদ্ধের জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল।’

সভাপতির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ অবশ্যই ঐতিহাসিক। কারণ এই ভাষণ জনগণকে উদ্বেলিত করেছিল এবং এতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার কিছু নির্দেশনা ছিল। কিন্তু সেদিন শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তাহলে তো বলা যেতেই পারে, সে সময় পাকিস্তানের তৎকালীন সময়ের সরকারের সঙ্গে দরকষাকষির অংশ হিসেবেই তিনি এই কথা বলেছিলেন।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘৭ মার্চ আমরা বাঁশ ও লাঠি নিয়ে গেছি। একটা ঘোষণা তো আসবেই। কিন্তু কোনো ঘোষণা আসেনি। রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে এ দেশের জনগণ। যদি কেউ বলেন, জিয়ার ভাষণে দেশে স্বাধীনতা আসেনি, তাহলে আমরাও বলতে পারি, ৭ মার্চের ভাষণে দেশে স্বাধীনতা হয়নি।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেকগুলো মাইলফলকের মধ্যে একটা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের যে অন্য মাইলফলকগুলো আছে, সেগুলো ধুলায় ঢেকে গেছে। সেগুলো ভেঙে যাচ্ছে। সেই মাইলফলকগুলোকে ধুলামুক্ত করতে হবে এবং সংস্কার করতে হবে।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণে আমরা উত্তেজিত হয়েছি। কিন্তু ওই ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। আইনগতভাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আহ্বান ছিল ওই ভাষণে।’

তিনি বলেন, ‘৭ মার্চের পরের দিন আওয়ামী লীগের দেওয়া প্রেস নোটে তাজউদ্দীন স্বাক্ষর করলেন। সেখানে বলা হলো, বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ক্ষমতায় আসার জন্য এই ভাষণ (৭ মার্চ ভাষণ) দেওয়া হয়েছে। সেটা যে স্বাধীনতার ঘোষণা না, আওয়ামী লীগের সেই প্রেস নোটেই বোঝা গেছে।’

সভায় আরও বক্তব্য দেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। ব্যানারে নাম থাকলেও অনুষ্ঠানে ছিলেন না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান।

সভায় অতিথির সারিতে ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক সংসদ সদস্য জহিরউদ্দিন স্বপন, ফজলুল হক মিলন, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এমপি, ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক, আব্দুস সালাম আজাদ, শহীদুল ইসলাম বাবুল, আমীরুল ইসলাম খান আলীম প্রমুখ।