যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে ২০১৩ সালে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে ২০১৫ সালে সহিংসতাপূর্ণ হরতাল-অবরোধ ডেকে রাজপথে থাকলেও গত কয়েক বছর বাহ্যত নীরব জামায়াতে ইসলামী। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর নানা ইস্যুতে হঠাৎ কিছু ঝটিকা মিছিল-জমায়েত এবং গণমাধ্যমে পাঠানো বক্তৃতা-বিবৃতি ছাড়া দলটির দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। তবে দলটির ভেতরে খবর যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট যে, প্রচণ্ড বৈরিতার মধ্যে, দুই দশকের পুরোনো মিত্র বিএনপির সঙ্গেও দূরত্ব নিয়ে জামায়াত নীরবে ধৈর্যের সঙ্গে সংগঠন গুছিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে অনুকূল সময়ের অপেক্ষা করছে। সর্বশেষ বিএনপি যখন বর্তমান কমিশনের অধীনে সব ধরনের নির্বাচন বর্জনের পথে, ঠিক তখনই ভোটের রাজনীতিতে ফেরার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে জামায়াতে।

পর্যুদস্ত ও একা: ২০ দলীয় জোটে নামকাওয়াস্তে একত্রে থেকেও বিএনপি এখন জামায়াতকে এড়িয়ে চলে। এর মধ্যে গত সপ্তাহে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজনের মৃত্যু হওয়ায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বিপরীতে রহস্যজনকভাবে প্রতিবাদ-বিবৃতি বিএনপি অফিস থেকে জোটের নামেই মিডিয়ায় যায়। তবু এটা জামায়াতের সঙ্গে কোনো পুনঃনৈকট্যের আলামত নয় বলেই বিএনপি নেতারা সমকালকে জানান। জামায়াত এখন কার্যত একা।

মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদসহ শীর্ষ চার নেতার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর দলটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও পর্যুদস্ত।

দলের বর্তমান অবস্থা ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাঝারি স্তরের একাধিক নেতা সমকালকে বলেন, রাজনীতির বর্তমান অবস্থায় নীরব থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও অপেক্ষা ছাড়া কিছুই করার নেই।

কিন্তু দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জামায়াত দুর্বল বা নীরব নয়। জাতীয় ও ইসলামিক ইস্যুতে সরব, সোচ্চার আছে। নিয়মিত কর্মসূচি পালন করছে। ক'দিন আগেও রাজধানীতে বড় মিছিল করেছে। গণমাধ্যমের চোখে তা না পড়লে কী করার আছে! অনেক অনেক সাংগঠনিক কাজ চলছে। ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার পর যারা দলের দায়িত্বে এসেছিলেন, তারা পরের কয়েক বছর মামলা মাথায় নিয়ে হয় জেলে নয়তো আত্মগোপনে ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা জেলায় জেলায় যাচ্ছেন। সাংগঠনিক সভা করছেন। নানা দুর্ঘটনায় হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে সহায়তা ও সহানুভূতি জানাতে যাচ্ছেন দেশের নানা জায়গায়। অথচ বছরখানেক আগেও তাদের জনসমক্ষে দেখা যেত না।

জামায়াতের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আগের মতো ধরপাকড় না চলার কারণ 'সমঝোতা' নয়, রাজনীতিতে নীরব থাকা। তারা বলেছেন, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নেতাকর্মীরা। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতারা অসংখ্য মামলার আসামি হয়ে কারাগারে গিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নিহত ও পঙ্গু হয়েছেন। যেহেতু আন্দোলন-সংঘাতে সরকার বদলের সম্ভাবনা নেই, তাই জামায়াত ফের ক্ষতিগ্রস্ত হতে সরকারের সঙ্গে সংঘাতে যাবে না।

জেলায় সফরকে দল ঠিক রাখার সাংগঠনিক কাজ বলেছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি সমকালকে বলেন, 'গত ১০ বছরে জামায়াতের ওপর যে অত্যাচার হয়েছে, তা বিএনপি বা আওয়ামী লীগের ওপর হলে তাদের খুঁজে পাওয়া যেত না। জামায়াত গত ১০ বছরে কোথাও দলের অফিস খুলতে পারছে না, স্বাভাবিক রাজনীতি করতে পারছে না। জামায়াত অনেক গোছানো দল, অনেক কাজ। তাই টিকে আছে।'

বিএনপির প্রেম-অপ্রেম: স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী, গণহত্যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সক্রিয় সহযোগী ও ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়েছিল। নেতারা পালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের সরকার তাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করে। পরবর্তী ছয়টি জাতীয় নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ থেকে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে প্রদত্ত ভোটের সর্বোচ্চ তথা ১২.১৩ শতাংশ ও ১৮টি আসন এবং ২০০৮ সালে সর্বনিম্ন ৪.৭০ শতাংশ ভোট ও দুটি আসন পায়। এ থেকে তাদের জনসমর্থন অনুমান করা যায়। কিন্তু জিয়ার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে প্রথম চারদলীয় গাঁটছড়ায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াত ২০০১-০৬ মেয়াদে সরকারের অংশ ছিল এবং দু'জন মন্ত্রী ছিলেন, যারা পরে ফাঁসিতে লটকেছেন। এই চার দলই ২০১২ সালে ডান, মধ্যডান ও ছদ্ম বামপন্থিকে নিয়ে ২০ দলের জোটে রূপ নেয়।

জামায়াতের ঘোষণাপত্রে দেশের সাংবিধানিক গণতন্ত্র প্রত্যাখ্যাত থাকায় ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে তারা নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন তথা এক প্রতীক নিয়ে দলগতভাবে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকার হারায়। ২০১৪ সালে বর্জন করার পর ২০১৮ সালে একটি নতুন জোটে সমঝোতায় বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ২১টি আসনে অংশ নিয়ে কোনো আসন পায়নি। আগে থেকে চলে আসা বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে তখন ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম ও আরও কয়েকটি দলের জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে মোর্চা হয়েছিল। সেবারে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে অবশ্য আওয়ামী লীগের একতরফা বিজয় হয়। মোর্চাটিও ঝিমিয়ে পড়ে।

ওই নির্বাচনে জাল-জালিয়াতির অভিযোগ তুলে জামায়াত ঘোষণা দিয়েছিল, বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো ভোটে অংশ নেবে না। এরপর উপজেলা ও সিটি নির্বাচনে জামায়াতের কেউ প্রার্থী হয়নি। কিন্তু সদ্যসমাপ্ত পৌরসভা নির্বাচনে রাজশাহীর কাটাখালীতে জামায়াত নেতা মাজেদুর রহমান এবং নোয়াখালীর বসুরহাটে মোশাররফ হোসেন মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। তবে জয় পাননি।

কড়া শৃঙ্খলার জামায়াতে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে প্রার্থী হলে বহিস্কার নিশ্চিত। কিন্তু ওই দু'জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি জামায়াত। দলের একজন নেতা সমকালকে জানিয়েছেন, নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। ভোট ছাড়া সরকার বদলের পথ নেই। নির্বাচনে অংশ নিলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা চাঙ্গা থাকেন। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও জামায়াতের নেতারা প্রার্থী হতে পারেন।

এ বিষয়ে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কেউ স্বনামে কথা বলতে রাজি হননি। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তেই তারা অটল রয়েছেন। স্থানীয় নির্বাচনগুলো স্থানীয় ইস্যু, আত্মীয়তা ও পাড়া-মহল্লার বিষয় থাকে। তাই দু'জন হয়তো প্রার্থী হয়েছেন।

নির্বাচনী পরাজয় ও বিপর্যয়ের কারণে সম্প্রতি ২০ দলের মধ্যে নানা টানাপোড়েন দেখা যায়। মাঝে এই জোটের শরিক এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম জাতীয় মুক্তি মঞ্চ নামে পৃথক একটি প্ল্যাটফর্ম গড়েন, যেটা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পাল্টা বলে পরিচিতি পায়। বিএনপি ছাড়া জামায়াতকে সেখানে ঘেঁষতে দেখা যায়। আবার কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মুহাম্মদ ইবরাহিম একটি দোয়া মাহফিলের আয়োজন করলে সেখানে বিএনপির গুটিকতক 'ক্ষুব্ধ নেতা' এবং গোলাম পরওয়ারসহ জামায়াতের প্রতিনিধি দলকে দেখা যায়। কিন্তু গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জোটের শরিক দলের আমন্ত্রণে অংশ নেওয়া ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই।

মাঝেমধ্যে গুঞ্জন ছড়ায়, বিএনপি ও জামায়াতের ২২ বছরের পুরোনো সখ্য ভেঙে যাচ্ছে। ২০১৮-এর নির্বাচনের আগে শোনা গিয়েছিল, জামায়াতই জোট ছাড়ছে। তা সত্য হয়নি। আর সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় জামায়াত ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়, যা এখনও কার্যকর হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, খবরের কাগজে কী বের হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ভাঙার কথা বলেনি। জামায়াতকে জানায়নি। জামায়াত জোটে আছে। জোটও রয়েছে।

তবে জোটবদ্ধ কোনো কর্মসূচি ইদানীং নেই।

অটল-অনড় পুরোনা নেতৃত্ব: জামায়াতে সংস্কার এবং একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন দলটিতে দীর্ঘদিন নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে তিনি ছিলেন জামায়াতের একজন দৃঢ় আইনজীবী। নিজেকে সরিয়ে নিয়ে তিনি এখন লন্ডনপ্রবাসী।

একই দাবি জানিয়ে বহিস্কৃত হন মজলিসে শূরার সদস্য ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু। সে সময়ে জামায়াতের বিকল্প নতুন নামে দল গঠনের 'চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে'র কথা জানিয়ে তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে কমিটি গঠনের কথা জানানো হলেও এখন তা আর আলোচনায় নেই।

জামায়াত ত্যাগ করা মজলিসে শূরার আরেক সদস্য সাবেক জনপ্রশাসন সচিব এ এফ এম সোলায়মান চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে গত বছর মজিবুর রহমান মঞ্জু এবি পার্টি (আমার বাংলাদেশ পার্টি) নামে একটি দল গঠন করেন। এতে তৃণমূলের কয়েকজন নেতাসহ অনেক কর্মী-সমর্থক যোগ দিয়েছেন।

এই দলবদলকে গুরুত্ব দিতে নারাজ গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, কত লোকই তো দল ছাড়ে। তাতে দলের কী হয়। জামায়াত কোনোদিন ভাঙেনি, ভাঙবেও না।

জামায়াতের মহানগর ও থানা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, নতুন নামে দল গঠন নিয়ে এখন আর কোনো কথা নেই। আবদুর রাজ্জাক দল ছাড়ার পর অনেকেই বিক্ষুব্ধ হয়ে একই পথ অনুসরণ করতে পারেন বলে ধারণা ছিল। যুদ্ধাপরাধের বোঝা ঝেড়ে ফেলতে নতুন নামে দল গঠনের ঘোষণা ছিল নেতাকর্মীদের শান্ত রাখার একটি কৌশল মাত্র। নিষিদ্ধ না হলে নতুন নামে গঠন করা হবে না।

নিষিদ্ধ হবে? :ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত ভারতে ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠার পর জামায়াত 'ইসলামী শরিয়া রাষ্ট্রের' দাবি নিয়ে রাজনীতির মাঠে রয়েছে। পাকিস্তানেও একবার নিষিদ্ধ হয়েছিল। বাংলাদেশেও একবার।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত জামায়াতকে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দলগতভাবে দায়ী করেছেন। সন্ত্রাসী দল বলেছেন। সরকারও অনেক বছর ধরে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে আইন করার কথা বলছে। জামায়াত নেতাদের অভিমত, যুদ্ধাপরাধের ইস্যু জিইয়ে রাখতে আওয়ামী লীগ সরকার কখনোই তাদের দলকে নিষিদ্ধ করবে না।

মন্তব্য করুন