অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে পর্দার অন্তরালে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করছেন তার পরিবার ও দলের নেতারা। সরকারের অনুমতি পাওয়ার সবুজ সংকেত পেলেই পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে নতুন করে আবেদন করা হবে। এর জন্য প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
করোনাক্রান্ত বিএনপি নেত্রীর শারীরিক অবস্থার অনেকটা অবনতি ঘটায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরাও। গতকাল মঙ্গলবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা এ পরামর্শ দেন। বিএনপির হাইকমান্ডকেও এ পরামর্শ দিয়েছেন তারা। ১০ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। তবে অক্সিজেন সাপোর্ট এখনও দিতে হচ্ছে। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
এ পরিস্থিতিতে বিএনপির নেতাকর্মীরাও আশা করছেন, সরকার মানবিক কারণে খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার অনুমতি দেবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেবে।
করোনায় আক্রান্ত খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি হওয়ার পর থেকেই তার পরিবার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশ নিতে চাইছে। বিএনপি চেয়ারপারসন নিয়মিত চিকিৎসা নিতেন মূলত সিঙ্গাপুর ও লন্ডনে। তাকে এ দুটি দেশের যে কোনো একটিতেই নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। বিষয়টি নিয়ে আলাপ করতে এবং খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা জানতে গতকাল এভারকেয়ার হাসপাতালে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানে তিনি পৌনে এক ঘণ্টা অবস্থান করে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন।
এ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানানো হয়েছে। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে মহাসচিব বলেন, তার অবস্থা আগের দিনের (সোমবার) চেয়ে ভালো, অনেকটা স্থিতিশীল। তাকে দুই লিটার পরিমাণ অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বাইরে নেওয়া প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন আদালতের কথা :স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে হলে আদালতের অনুমতি নিতে হবে। তাকে তার পছন্দের হাসপাতালেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে তার সর্বোচ্চ চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
অবশ্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া যে শর্তে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন সে অনুযায়ী তার বিদেশে যাওয়ার সুযোগ নেই; তবে সরকার যদি সেই শর্ত শিথিল করে তাহলে খালেদা জিয়ার বিদেশে যেতে আইনগত কোনো বাধা থাকে না। এটা নির্ভর করছে একেবারেই সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। কিন্তু তারা বিএনপি বা খালেদা জিয়ার পরিবার থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ক কোনো আবেদন পাননি।
খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠানোর অনুমতির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী সরকার তাকে মুক্তি দিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, তাকে বিদেশ নিতে হলে অনুমতির জন্য আদালতে আসতে হবে। খালেদা জিয়ার চিকিৎসা যতটুকু প্রয়োজন তা দেশে সম্ভব কিনা, সবকিছু সরকার বিবেচনা করবে।
এদিকে সরকারের কাছে খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার জন্য অনুমতি চেয়ে একটি আবেদন আগেই করা আছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। এ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়া জরুরি। সরকারের দেওয়া নির্বাহী আদেশ সংশোধন করে বিদেশে যাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করলেই শুধু এটা সম্ভব। এটি সম্পূর্ণ সরকারের একক এখতিয়ার। বিএনপি কিংবা তার পরিবার কিংবা আইনজীবীদের এখানে কিছুই করার নেই।
গত ১০ এপ্রিল করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর ২৭ এপ্রিল রাতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। হাসপাতালটির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসা করছে। এ অবস্থায় গত সোমবার শ্বাসকষ্ট অনুভব করায় হাসপাতালের সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয় খালেদা জিয়াকে। অন্যদিকে সোমবার রাতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব। এরপর থেকেই খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার প্রসঙ্গ সামনে আসে। সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, দল ও পরিবারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন বলেন, আমাদের বিশ্বাস, জনপ্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসায় সরকার এগিয়ে আসবে। তিনি শুধু এ দেশের নয়, পুরো বিশ্বের গণতন্ত্রমনা সব মানুষের নেত্রী। মানবিক কারণে হলেও সরকার খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে বলে তিনি আশা করেন।
এদিকে খালেদা জিয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে রাতে সংবাদ সম্মেলনে তার চিকিৎসক ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেছেন, খালেদা জিয়ার অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। তার চিকিৎসা চলছে।
এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা খালেদা জিয়ার যেসব পরীক্ষা করানো হয়েছিল সেগুলো রিভিউ করেছেন। চিকিৎসায় কিছু পরিবর্তন করেছেন।

মন্তব্য করুন