বিশ্বব্যাপী প্রায় দেড় বছর ধরে করোনাভাইরাসের মহামারি চলছে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত বিশ্বের ১৫ কোটির বেশি মানুষ আক্রান্ত এবং ৩২ লাখের বেশি এই ভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেছেন। করোনা রোগীদের অধিকাংশের মধ্যেই ফুসফুস ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যারা করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের বড় একটি অংশের ফুসফুসে তীব্র সংক্রমণ হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে অক্সিজেন সংকট তৈরি হয়েছে। গত এপ্রিলে বাংলাদেশেও করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অক্সিজেনের চাহিদা ছিল আগের তুলনায় অনেক বেশি।
গবেষণা বলছে, করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ১২ শতাংশ রোগী অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছিলেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এ ধরনের রোগীদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক গুণ বেশি। মৃত্যুঝুঁকিও বেশি। সুতরাং অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীরা করোনা আক্রান্ত হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন; অন্যথায় বড় বিপদ হতে পারে।
এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব অ্যাজমা দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'কুসংস্কার দূর করুন, অ্যাজমা রোগী সুস্থ থাকুন'। গ্লোবাল ইন ইনিশিয়েটিভ ফর অ্যাজমা (জিনা) তাদের ওয়েবসাইটে এক বিজ্ঞপ্তিতে করোনাকালে অ্যাজমা রোগীদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত এক বছরে অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বেড়েছে। অ্যাজমা আক্রান্ত রোগীদের ইনহেলার এবং ওষুধ নিয়মিত ব্যবহার করতে হবে। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে অক্সিজেন থেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ব্রঙ্কোলজি অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল পালমনোলজির (বিএবিআইপি) মহাসচিব ডা. সাইদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্তদের করোনাভাইরাস সংক্রমণজনিত জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাদের মৃত্যুঝুঁকিও অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। তাই যাদের অ্যাজমা আছে কিংবা জ্বরে আক্রান্ত তাদের করোনা হোক বা না হোক নিজস্ব তত্ত্বাবধানে কোয়ারেন্টাইনে থাকা প্রয়োজন। তাদের বাসাবাড়ির বাইরে বের হওয়া বন্ধ রাখতে হবে। অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টের রোগী করোনা আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব হাসপাতালে হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা, আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা আছে, এসব হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
টেলিহেলথ সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ে একটি গবেষণা করেছে। গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ৪৫ দিনের তথ্য বিশ্নেষণ করে প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে বলা হয়, করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে আগে থেকে ৩৬ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপ, ৩৬ শতাংশ ডায়াবেটিস, অ্যাজমায় ১২ শতাংশ, হৃদরোগজনিত সমস্যায় ৪ শতাংশ, কিডনি সমস্যা ৩ শতাংশ এবং ৯ শতাংশ রোগী অন্যান্য রোগে ভুগছিলেন।
কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, আইসিইউতে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে অ্যাজমা, হাঁপানি, শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিন্ড্রোম (এআরডিএস) আক্রান্ত ছিলেন অনেকে। এ জন্য তাদের আইসিইউ সাপোর্ট দিতে হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আবার কাউকে কাউকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, করোনা সংক্রমিতদের কতজন কোন রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং মৃতদের কতজন কোন রোগে আক্রান্ত ছিলেন সে সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এটি পুরোপুরি সম্পন্ন হলে তা প্রকাশ করা হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষ অ্যাজমায় ভুগছে। বাংলাদেশে ৭ শতাংশ মানুষ অ্যাজমায় আক্রান্ত। বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশে এক কোটি ১০ লাখ মানুষ অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত বলে জানানো হয়।
অ্যাজমা নিয়ে কাজ করে এমন আরেকটি সংগঠন অ্যাজমা অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ। সংগঠনটির ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশে ৭০ লাখ মানুষ অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত বলে জানানো হয়েছিল। এর পর অ্যাজমা রোগী বা এ রোগ সংক্রান্ত কোনো পর্যবেক্ষণ হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, গবেষণা কাজে যে পরিমাণ আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন, তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর দিচ্ছে না। এ কারণে গবেষণা কাজ করা সম্ভব হয় না।
ভয় যে কারণে :বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আলী হোসেন সমকালকে বলেন, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস সংক্রমণে যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে প্রায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশের শ্বাসতন্ত্রীয় সমস্যা ছিল। ভাইরাসটি শ্বাসক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত স্ট্রাকচার ও টিস্যুতে আক্রমণ করে। জটিলতার মধ্যে শুধু তীব্র নিউমোনিয়া নয়; অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিন্ড্রোমও (এআরডিএস) দেখা দিতে পারে। এআরডিএসে ফুসফুসের টিস্যু পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। যেসব ফুসফুসীয় রোগ করোনা জটিলতার উচ্চ ঝুঁকি বহন করে, তা হলো অ্যাজমা ও ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি)। সিওপিডির মধ্যে ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ও এল্ফিম্ফসেমা উভয়ই রয়েছে। সিওপিডির প্রধান কারণ হচ্ছে ধূমপান। তাই যারা বছরের পর বছর ধূমপান করে আসছেন তাদেরও করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে সৃষ্ট জটিলতার বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে।
ডা. আলী হোসেন আরও বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের আরেকটি ঝুঁকি হচ্ছে অ্যাজমা। উপসর্গ প্রকাশ পায়নি এমন অ্যাজমা রোগীদের ফুসফুসের কার্যক্রমও কিছু না কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শ্বাসতন্ত্রের যে কোনো সংক্রমণে অ্যাজমা রোগীদের ফুসফুসের বায়ু চলাচল নালিতে প্রদাহ হয়ে অ্যাজমা অ্যাটাক হতে পারে। সুতরাং অ্যাজমা রোগীদের সতর্ক থাকতে হবে। অ্যাজমা রোগীরা কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। কারণ তার শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। তখন আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সাপোর্টের প্রয়োজন হবে।
রাজধানীর শ্যামলী ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আবু রায়হান সমকালকে বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় অ্যাজমা রোগী বেড়েছে। করোনাকালে এ সংকট আরও বেড়েছে। আমাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে যারা অ্যাজমা কিংবা শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন, তাদের তীব্র শ্বাসকষ্ট ছিল। অধিকাংশের আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়েছে।
ডা. আবু রায়হান আরও বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তি বয়স্ক হলে সমস্যা বহু গুণ বেড়ে যাবে। কারণ করোনা মূলত ফুসফুসে আক্রমণ করে। আগে থেকে কারও ফুসফুস সংক্রমিত থাকলে তার কার্যক্ষমতা কম থাকে। ওই ব্যক্তির ফুসফুস সংক্রমিত হলে তাকে সহজেই কাবু করে ফেলবে। এতে মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, অ্যাজমা রোগীদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে ভাইরাস তাদের আক্রমণ করলেও দুর্বল করতে পারে না। কিন্তু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্তকে সহজেই দুর্বল করে ফেলতে পারে। তাই সুরক্ষিত থাকতে হবে। এসব ব্যক্তি কীভাবে সুরক্ষিত থাকবেন, এ সংক্রান্ত একটি গাইডলাইন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমেও সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব বিষয় মেনে চললে বিভিন্ন রোগে আক্রান্তরা সুরক্ষিত থাকবেন।

মন্তব্য করুন