দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না দেয়ায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছে বিএনপি। ওয়ান ইলেভেনের ধারাবাহিকতায় খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত দিয়েছে বলে দলটির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন।

রোববার রাতে এক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মাহসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকারের এ নেতিবাচক সিদ্ধান্তে নিঃসন্দেহে তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। শুধু মানবিক কারণে নয়, রাজনৈতিক কারণেও অনুমতি দেয়া জরুরি ছিল। কারণ, খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। স্বাধীনতা থেকে এখন পর্যন্ত তার যে অবদান তা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। দুর্ভাগ্য- সরকার তাদের প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি চরিতার্থ করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার অবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে হাসপাতালের সামনে সংবাদমাধ্যমকে বিএনপি মহাসচিব বলেন, যে ধারাতে সাজা স্থগিত করেছে ওই ধারাতে বিদেশে যেতে এবং দণ্ড মওকুফ করার সুযোগ আইনে রয়েছে। সরকার বলেছে-কোনো নজির নেই। সরকার অসংখ্য নজির সৃষ্টি করেছে। তারা ফাঁসির আসামিকে বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারেন, মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতার জন্য কোনো মানবতা, শিষ্টাচার ও মূল্যবোধ তাদের কাজ করে না। খালেদা জিয়া রাজনীতির শিকার হচ্ছেন।

তিনি বলেন, এ কথা অত্যন্ত সত্য ও স্পষ্ট যে, একটি মিথ্যা ও সাজানো মামলায় খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্যটাই হচ্ছে যে- খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া। এটা আজকের বিষয় নয়। এটা ওয়ান ইলেভেন থেকে শুরু হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় খালেদা জিয়াসহ অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে এবং দেশের প্রায় ৩৫ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে পুরো দলকেই রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চক্রান্ত চলছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, দেশে এখন সবচেয়ে বড় চক্রান্ত চলছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। কারণ তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। তিনি এদেশের জন্যগণের, গণতন্ত্রের এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তিনি ফ্যাসীবাদী সরকারের বিরুদ্ধে যখনই লড়াই শুরু করেছেন, আন্দোলন শুরু করেছেন তখনই একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে মিথ্যা মামলায় কারাগারে নেওয়া হয়েছে এবং আজ পর্যন্ত তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা এই সরকার করেনি।

খালেদা জিয়াএরানায় আক্রান্ত হওয়ার পরে তিনি যে চিকিৎসা এখানে নিচ্ছেন তাতে তার চিকিৎসকরাই বলেছেন- এই চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। করোনা পরবর্তি যেসব উপসর্গ এখন দেখা দিচ্ছে তাতে তার বয়স এবং আগে থেকে তার যেসব রোগ আছে তাতে যথেষ্ট ঝুকির সম্মুখীন আছেন। তার জীবনের ঝুঁকির সম্মুখীন অবস্থায় আছেন তিনি।

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজ আমি নিজে তাকে দূর থেকে দেখে এসেছি। আগের থেকে ভালো মনে হয়েছে। অক্সিজেন ছাড়াই শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছেন। ফুসফুসে টিউব লাগানো আছে। উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে। চিকিৎসকরাই বলেছেন- এই চিকিৎসা তার জন্য যথেষ্ট নয়। করোনা পরবর্তী যে জটিলতা দেখা দিচ্ছে, তাতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। কারণ তার আগের রোগ ও বয়সের কারণে জীবন ঝুঁকি রয়েছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, চেয়ারপাসরনের বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে দলের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়নি, তার পরিবার আবেদন করেছে। এখন পরিবার সিদ্ধান্ত নিবে- তারা কি করবেন।

বিদেশে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে সরকারের এ সিদ্ধান্তকে মানতে পারছেন না দলের অন্যান্য নেতাকর্মীরাও। তাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিলো- সরকারের সবুজ সঙ্কেত পেয়েই খালেদা জিয়ার পরিবার আবেদন করেছিলেন এবং সেই মতে অন্যান্য প্রস্তুতিও সম্পন্ন করছিলেন। কিন্তু সেই সুযোগ না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন তারা। তাদের মধ্যে খালেদা জিয়ার সুস্থতা নিয়ে এক ধরণের ভীতি সঞ্চার শুরু হয়েছে।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার সমকালকে বলেন, মানবিক কারণে খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার বিষয়ে সরকারের এ সিদ্ধান্ত ঠিক হলো না। খালেদা জিয়ার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। এ অবস্থায় তাকে বিদেশে চিকিৎসা সুযোগ দেয়া উচিৎ ছিলো।

এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা জরুরি। তার চিকিৎসা সংকট আছে। দেশের অভ্যন্তরের হাসপাতালগুলোতে তার চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। এ অবস্থায় খালেদা জিয়াকে নিঃশর্ত মুক্তি দিন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় জাতীয়তাবাদী প্রজন্ম '৭১ এর উদ্যোগে খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির জন্য দোয়া মাহফিল ও দুঃস্থ-অসহায়দের মাঝে ঈদ সামগ্রি বিতরণ উপলক্ষে অনুষ্ঠানে তিনি এসব বলেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বিষয়টা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। খালেদা জিয়া শুধু তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নয়, দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার গৌরবজ্জল ভূমিকা রয়েছে। সেটার সাথে তার ভগ্ন স্বাস্থ্যের বিষয়কে বিবেচনায় রেখে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে জাতি হিসেবে গৌরবান্বিত হতো। এখন সেটা হবে না। এর দায় সম্পূর্ণ সরকারকেই বহন করতে হবে।

সাবেক এমপি জহিরউদ্দিন স্বপন বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো-এই সরকার কতটা অমানবিক। গোট রাষ্ট্র ও সংবিধানকে তারা দলীয় হাতিয়ারে পরিণত করেছে। খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তাকে তারা ভয় পায়।

স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলের প্রধান খালেদা জিয়া। তাকে এভাবে চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে শুধু বিএনপির নেতাকর্মী নয় আপাময় জনগণকে কষ্ট দিয়েছে। বিনা ভোটের সরকার হওয়ায় তারা এমন অমানবিক আচরণ করছে।




বিষয় : বিএনপি খালেদা জিয়া

মন্তব্য করুন