ছেষট্টির আগে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আরও 'এজেন্ডা' ছিল। কিন্তু ছয় দফা ঘোষণা দেওয়ার পর 'জাতীয়তাবাদে'র বিষয়টি একমাত্র এজেন্ডায় পরিণত হয়। এই এক এজেন্ডা দিয়েই আন্দোলন-সংগ্রাম করে একাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পূর্ববঙ্গের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন ও শোষণ নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠে। শুরু হয় নিরাপত্তাহীনতা ও মানুষের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করার মচ্ছব। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দিনে দিনে বৈষম্য এবং বিরোধ ক্রমান্বয়ে বাড়ার কারণে জনগণও এই ক'বছরের রাজনৈতিক ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে সচেতন হয়ে ওঠে। তাদের মধ্যে তৈরি হয় অধিকার ফিরে পাওয়ার বোধ। আর এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালির মুক্তির এই কর্মসূচিই হচ্ছে ছয় দফা; যা বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে।

১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে চুক্তি হয়। তাশখন্দ চুক্তির ফলে ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সমাধান হয়। এই চুক্তিকে অভিনন্দন জানান শেখ মুজিবুর রহমান। এর মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে পূর্ববঙ্গের জনগণের সমর্থন বেড়ে যায়। এ অবস্থার মাঝে ছেষট্টি সালের ১৩ জানুয়ারি পূর্ববঙ্গের তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খান হিন্দুদের সম্পত্তি নিয়ে শত্রু সম্পত্তি সংক্রান্ত এক আদেশনামা জারি করেন। এই আদেশের ফলে হিন্দুদের সহায়-সম্পত্তি নিয়ে সরকার সমর্থিত সন্ত্রাসীদের উৎপাত বেড়ে যায়। পূর্ববঙ্গে নিজেদের অনিরাপদ ভাবতে শুরু করে হিন্দু জনগোষ্ঠী। পাশাপাশি শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক হয়রানিমূলক মামলা অব্যাহত রাখে সরকার।

পাকিস্তানি গোষ্ঠী বুঝে গিয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের যে জনসমর্থন তা আর থামানো সম্ভব নয়। তাই তাকে জেলে রাখার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খান। প্রকাশ্যে তিনি ঘোষণা করেন, যতদিন পূর্ববঙ্গের গভর্নর থাকবেন, ততদিন মুজিবুর রহমানকে জেলে থাকতে হবে। (সূত্র: সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ভাস্কর প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০১)। মোনায়েম খানের এই নিপীড়নমূলক দম্ভোক্তির পর ফুঁসে ওঠে পূর্ববঙ্গের রাজনীতিসচেতন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। বঙ্গবন্ধু যেমন জনগণের সঙ্গে ছিলেন, জনগণও তাকে ছেড়ে যায়নি। তাই জনগণই বারবার তাকে নিয়ে এসেছে মানুষের মাঝে। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের লাহোরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে আহূত এক জাতীয় সম্মেলনে যোগ দেন শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল। সম্মেলনের সাবজেক্ট কমিটির সভায় ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ঘোষণা করেন ছয় দফা; এতে বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃৃতিক স্বার্থ সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়। তবে সেখানে নেতবৃন্দ ছয় দফা প্রশ্নে কোনো আলোচনা করতে সম্মত হননি। এ অবস্থায় সম্মেলন ত্যাগ করে ১১ ফেব্রুয়ারি প্রতিনিধি দলকে নিয়ে ঢাকায় ফেরেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছয় দফা নিয়ে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দেয়। বিরুদ্ধ মত আসে আওয়ামী লীগ থেকেও। তবে চট্টগ্রামের এম এ আজিজ, এম এ হান্নান, আবদুল্লাহ আল হারুনসহ কয়েকজন নেতা ১৩ ফেব্রুয়ারি ছয় দফার সমর্থনে বিবৃতি দেন, ছয় দফা সমর্থন দিয়ে বিবৃতি দেয় ছাত্রলীগও। (সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জীবন ও রাজনীতি, বাংলা একাডেমি, ২০০৮, পৃষ্ঠা-৩২৩)

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬, মহান শহীদ দিবসে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় ছয় দফা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন লাভ করে। মূলত ছয় দফা ছিল শেখ মুজিবের চিন্তার ফসল; যা ২১ ফেব্রুয়ারির পর দলীয় ইশতেহারে পরিণত হয়। পুরো দেশের মানুষের একক এজেন্ডায় রূপ লাভ করে। ছয় দফা পেশ করে বঙ্গবন্ধু ঘরে বসে ছিলেন না। তার এই দাবির মর্মার্থ মানুষকে বোঝাতে দেশজুড়ে চষে বেড়ান তিনি, অসংখ্য সভা-সমাবেশ করেন। এই কাজটি শুরু হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মাধ্যমে। কিন্তু বাঙালিবিদ্বেষী ও প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকারও বসে নেই। জননন্দিত এই নেতার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করে। তিনি গ্রেপ্তার হন, জামিন পান, আবার আরেক মামলায় গ্রেপ্তার হন। ষাটের দশকে অর্থাৎ ছয় দফার সময়ের দেশে সামরিক শাসন ছিল না। কিন্তু 'মৌলিক গণতন্ত্রে'র মাধ্যমে শাসনক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন স্বৈরাচার আইয়ুব খান। ওই সময় ছয় দফার বিরুদ্ধে আইয়ুব-মোনায়েমের বিষোদ্গার চলতেই থাকে। তবে মুজিব দেশজুড়ে তার গণতান্ত্রিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বন্ধ করেননি।

১৮ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু খুলনা সমাবেশ করে যশোরে ফিরছিলেন। ওইদিন রাতে তাকে পাকিস্তন প্রতিরক্ষা আইনের ৪৭(৫) ধারায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০ মার্চ ঢাকার পল্টন ময়দানে রাষ্ট্রবিরোধী ভাষণ দেওয়ার অভিযোগে হয়রানিমূলক মামলায় তাকে যশোরে গ্রেপ্তার করা হয়। যশোরে জামিন পেয়ে প্লেনে ঢাকায় ফেরেন শেখ মুজিবুর রহমান, সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ। ঢাকা বিমানবন্দরে তাকে বিশাল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ সময় সবার মুখে স্লোগান ছিল একটাই- 'ছয় দফা মানতে হবে'। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের দাবি ক্রমেই জোরালো হতে শুরু করে। এর মাঝে ২১ এপ্রিল সিলেটে গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিব। ২৫ এপ্রিল ময়মনসিংহ জেলা জজ আদালতে তিনি মুক্ত হন। এর মাঝে কর্মসূচি চলছেই। শাসকগোষ্ঠীর তীক্ষ্ণ ষড়যন্ত্রও থেমে নেই, বরং প্রতিনিয়ত বিস্তার ঘটছে এর জাল। ১৯৬৬ সালের ৮ মে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় পাটকল শ্রমিকদের এক সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার পর ৯ মে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে নেওয়া হয়। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হন তাজউদ্দীন আহমদসহ আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা। তাদের বন্দি করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পড়ে সৈয়দ নজরুল ইসলামের ওপর। অন্য নেতৃবৃন্দকে নিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যান তিনি। (সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি, বাংলা একাডেমি, ২০০৮, পৃষ্ঠা-৩৩৫)। জনগণ বঙ্গবন্ধুকে প্রচণ্ড ভালোবেসেছে এবং ভালোবাসে। তাকে এ ধরনের হয়রানিতে জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এর মাঝে দলের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ছয় দফার বায়স্তবায়ন নীতি অব্যাহত রাখা এবং ৭ জুন প্রদেশব্যাপী হরতাল পালন করার। এ কর্মসূচি ঘোষণার পর শাসকগোষ্ঠী প্রচারকাজে ব্যাপক বাধা সৃষ্টি ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের বেআইনিভাবে আটকে রাখার কৌশল নেয়। কিন্তু দমে যায়নি বাঙালি। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। উল্টো মোনায়েম খান কঠোর হস্তে এসব দমন করার হুমকি দেন। হরতালকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় পত্রপত্রিকার ওপর। পত্রপত্রিকার ওপর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও দেশব্যাপী ৭ জুন হরতালের খবর ছড়িয়ে পড়ে। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করে।

হরতাল-কর্মসূচি চলাকালে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গীতে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ১১ জনকে হত্যা করে পুলিশ। এই দমন-পীড়নের মাঝেই খবর আসে গোপালগঞ্জে শেখ মুজিবুর রহমানের মা অসুস্থ। কিন্তু তিনি প্যারোলে মুক্তি নিতে আগ্রহী নন, কারণ তার মা চান না, ছেলে প্যারোলে মুক্তি নিন, নিঃশর্ত মুক্তি চান। (সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি, বাংলা একাডেমি, ২০০৮; পৃষ্ঠা-৩৩৫)।

ছয় দফা যখন জনগণের ব্যাপক সমর্থন পায়, ঠিক সেই সময় অর্থাৎ ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসানো হয় শেখ মুজিবকে। তার সঙ্গে আসামি করা হয় ২৮ জন আমলা, সেনা ও রাজনীতিককে। বন্দি করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে সেখানে উপস্থিত হন ডেপুটি জেলার তোজাম্মেল। দরজা খুলে দেন জেলে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গী আওয়ামী লীগের নেতা মোহনগঞ্জের আব্দুল মোমেন। দরজা খুলতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে একটি কাগজ দেখিয়ে তোজাম্মেলন বললেন, 'স্যার, আপনাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।' এর আগে কারাগারে বসে শেখ মুজিবুর রহমান শুনেছেন, তাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়ানো হয়েছে। তোজাম্মেলকে তিনি প্রশ্ন করলেন, 'আমাকে খালাস দেওয়া হলো কি নতুন কোনো ফাঁদে নেওয়ার জন্য'?

তোজাম্মেল কোনো কথা বলেননি। নিজের অজান্তেই তখন শেখ মুজিবুর রহমান বলে উঠলেন, 'বুঝলাম, সংগ্রাম ঘনিয়ে আসছে, মুক্তি এগিয়ে আসছে, বাংলার মুক্তি।' অশ্রুসিক্ত মোমেনকে বুকে জড়িয়ে বাঙালির প্রিয় এই নেতা বললেন, 'বন্ধু, বাংলাদেশকে আপনাদের হাতে রেখে গেলাম। জানি না, কোথায় এরা আমাকে নিয়ে যাবে- হয়তো বাংলার মাটি থেকে এ আমার শেষ যাত্রা। যাওয়ার সময় আপনাকে শুধু একটি কথা বলে গেলাম- বাংলাদেশের সাথে আমি কোনোদিন বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, কোনোদিন করব না। আপনারা রইলেন বাংলাদেশ রইল, এই দেশকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সার্বভৌম স্বাধীনতাই আমার স্বপ্ন, আমার লক্ষ্য।'

জেলখানা থেকে বের হলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই আশঙ্কাই যেন সত্য হলো। আবারও নতুন ফাঁদে ফেলা হলো তাকে। জেলগেটে বিজাতীয় ভাষায় উর্দি পরা অফিসার বলল, তুমি আবারও বন্দি! জেলগেটেই ফের গ্রেপ্তার হলেন বঙ্গবন্ধু। মিলিটারি ভ্যানে ওঠার আগে কারাগারের সামনে একমুঠো মাটি কপালে ঘষে বললেন, 'এই দেশেতে জন্ম আমার, যেন এই দেশেতেই মরি ...।' বঙ্গবন্ধুকে হত্যায় ষড়যন্ত্র করেছিল পাকিস্তান সরকার, কিন্তু জনগণের শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের মাঝেই ফিরে এলেন। দেখা দেয় উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, এর ফলে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় আইয়ুব সরকার। দুর্ভাগ্য, বঙ্গবন্ধুকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি। কিন্তু তারই দেখানো পথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য গতিতে সোনার বাংলার দিকে ধাবিত হচ্ছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ঘুমিয়ে রয়েছেন, টুঙ্গিপাড়ায়। এভাবেই তিনি বেঁচে থাকবেন বাঙালির ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায়- হৃদয়ের মণিকোঠায়।

মন্তব্য করুন