বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও দারুণ এক সংকটের মুখে। একদিকে জীবন বাঁচানো, আরেকদিকে বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে জীবিকা রক্ষার লড়াইয়ে দেশের মানুষ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে করোনায় সৃষ্ট এই সংকট নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে সরকার পরিচালনাকারী দল আওয়ামী লীগকেও।
এ মুহূর্তে অন্তত চারটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতাসীন দলটিকে- এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। তাদের মতে, করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে মানুষকে বাঁচানো এবং তাদের জীবন-জীবিকার পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা সচল রাখার বিষয় দুটি সরকারের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত এক যুগের 'উন্নয়ন-অগ্রগতির' ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার কঠিন দায়িত্বও দলটির সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। সর্বোপরি প্রায় দেড় বছর স্থবির রাজনীতির সময়ে দল গোছানোর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তারা।
এ অবস্থায় আজ বুধবার ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যার যাত্রা শুরু। ৭২ বছরের মাথায় এসে সেই দলটি আসলে কতটা এগোল? এমন প্রশ্নে নানা প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেছেন দলটির সাধারণ নেতাকর্মী-সমর্থক আর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরাও।
রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, এ মুহূর্তে বৈশ্বিক মহামারি করোনা দেশকে যে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তা থেকে উত্তরণে আওয়ামী লীগকেই প্রধান ভূমিকায় নামতে হবে। কেননা স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের প্রতিই মানুষের প্রত্যাশা বেশি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দলটি দেশের স্বাধীনতা এনেছে। আর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অতীতের অনেক ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে এ দলটিই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় দেশকে দাঁড় করিয়েছে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস-সাম্প্রদায়িকতাসহ নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে আওয়ামী লীগ আজকের অবস্থানে এসেছে।
আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই বাণীতে চলমান করোনা সংকট মোকাবিলায় দেশ ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, সুখী-সমৃদ্ধ, উন্নত ও আধুনিক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন শেখ হাসিনা।
দলের সক্রিয়তা :গত বছরের মার্চে দেশে করোনা-দুর্যোগের শুরু। এক বছরের মাথায় চলতি বছরের এপ্রিলে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানায় তা আরও সংকটময় মোড় নিয়েছে। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, কেবল দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর নয়, গত বছর করোনা সংকটের শুরু থেকে আওয়ামী লীগ ও সরকার মানুষের পাশে রয়েছে। সরকারের তরফে মানুষের চিকিৎসাসহ সুরক্ষার সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি অর্থনীতি রক্ষার নানা প্রণোদনা ঘোষণা ও বাস্তবায়ন চলছে। বিশ্বের যে দেশগুলো প্রথম দফায় করোনার গণটিকা কার্যক্রম শুরু করেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যদিও চাহিদার তুলনায় টিকার অপ্রতুলতা এবং বিভিন্ন দেশ থেকে টিকা সংগ্রহ নিয়ে নানা জটিলতায় কিছুটা থমকে রয়েছে এ কার্যক্রম। তারপরও জটিলতা কাটিয়ে দেশের সব মানুষকে টিকার আওতায় আনতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সরকার। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগও করোনা মোকাবিলায় জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি ত্রাণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রেখেছে।
পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে দল গোছানোর চ্যালেঞ্জেও আওয়ামী লীগ। যদিও করোনাকালে থেমে থেমে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অথবা সীমিত পরিসরে শারীরিক উপস্থিতিতে চলেছে কিছু সাংগঠনিক কার্যক্রম। জাতীয় ও দলসংশ্নিষ্ট ঐতিহাসিক দিবস পালন, স্থবির তৃণমূল সম্মেলন ও সাংগঠনিক সফর যথাসম্ভব সচল রাখা, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কোন্দল মিটিয়ে দলকে শক্তিশালী করতে বৈঠকাদি চলেছে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে। সর্বশেষ ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুনভাবে সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আর কেন্দ্র থেকে পাঠানো চিঠিতে দলের একেবারে মাঠপর্যায় পর্যন্ত 'সাংগঠনিক টিম' গঠন করে দলকে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করার সাংগঠনিক কার্যক্রমগুলো এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনাও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যাশা :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সমকালকে বলেন, এই জুন মাস আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছাড়াও জাতির ইতিহাসের আরও কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পঁচাত্তরে জাতির পিতার বিয়োগান্ত হত্যার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ জুন প্রথমবারের মতো জনগণের ভোটে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে আওয়ামী লীগ দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। ২০০৮ সালের ১১ জুন স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে নতুন যাত্রা শুরু করেছিলেন, যার ফসল আজকের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। কাজেই জুনের চেতনায় আওয়ামী লীগ ও তার সরকার আবারও দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে করোনা নামের নতুন শত্রুর বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধে সফল হবে বলে বিশ্বাস করি।
ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও আশাবাদের কথাই শুনিয়েছেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু সমকালকে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশকে স্বাধীন করে যেতে পারলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ জনগণের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দেওয়ার সময় পাননি। তার সেই অসমাপ্ত কাজটিই বাস্তবায়ন করছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। উন্নয়নের ধারায় দেশকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন। তার প্রচেষ্টায় দেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে ওঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। এমনই এক সময়ে গত এক বছরের বেশি সময় বিশ্বব্যাপী করোনার থাবা অগ্রগতির পথকে কিছুটা হলেও স্তিমিত করে দিয়েছে- এটা ঠিক। কিন্তু শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশের মানুষ অন্য সব সংকটের মতো করোনার এই সংকট থেকেও মুক্তি পাবে; আবারও দেশকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নেবে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিকবার বলেছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে করোনা সংকটের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা এবং মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতির চাকা সচল রেখে মাটি ও মানুষের সংগঠন আওয়ামী লীগই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
৭২ বছরের পথচলা :১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন পুরান ঢাকার কেএম দাস লেনে খানবাহাদুর মৌলভি কাজী আবদুর রশীদের রোজ গার্ডেনের বাসভবনে প্রগতিবাদী ও তরুণ মুসলিম লীগ নেতাদের উদ্যোগে রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে জন্ম হয় পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ১৯৫৫ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দ বাদ দেওয়া হয়। নতুন নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার পর নামকরণ হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
প্রতিষ্ঠাকালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক ও কারাবন্দি অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান দলের অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালে দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৫৩ থেকে টানা ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন শেখ মুজিব। এর পর ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে দলের সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামে সামনের কাতারে থেকে তরুণ শেখ মুজিব নিজেকে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে ১৯৭১ সালে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতা লাভ। এ ছাড়া বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় ও সরকার গঠন, বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচিত ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাবিরোধী এবং ১১ দফা আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভসহ গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসন অর্জনের সব আন্দোলন-সংগ্রামেও দলটি ছিল প্রথম কাতারে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর তারই কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে এসে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র এবং মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। বাবার মতো তাকেও দফায় দফায় কারারুদ্ধ হতে হয়েছে। তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে চার দফায় ক্ষমতাসীন হয়েছে।
সীমিত পরিসরের কর্মসূচি :করোনা সংকটের কারণে গত বছরের মতো এবারও জনসমাগম এড়িয়ে ও সীমিত পরিসরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করবে আওয়ামী লীগ। আজ সূর্যোদয়ের ক্ষণে দলের কেন্দ্রীয় ও দেশব্যাপী কার্যালয়গুলোতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল নয়টায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও সকাল ১১টায় টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বিকেল ৪টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় সভাপতিত্ব করবেন।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক বিবৃতিতে সীমিত পরিসরে ও যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করার জন্য দল ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থক ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

বিষয় : ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আওয়ামী লীগ

মন্তব্য করুন