ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী তথা এ জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলের শিক্ষার পাশাপাশি রাজনীতি, সংস্কৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখে চলেছে। পূর্ববাংলার বাঙালি জনগোষ্ঠী বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের এগিয়ে নিতে একটি জ্ঞানভিত্তিক, উন্নত ও অসাম্প্রদায়িক মধ্যবিত্ত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখার যে বিশেষ লক্ষ্য সামনে রেখে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; শতবর্ষেও তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারা অবশ্যই আমাদের জন্য বেদনার। তারপরও যেটুকু অর্জন হয়েছে, তাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনসহ গণমানুষের বিভিন্ন অধিকার আদায়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সময়ের প্রেক্ষাপটে ইতিহাসে কিছু গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা থাকলেও দীর্ঘ তিন দশকে সেটিও খুব একটা দেখা যায়নি; বরং বর্তমান অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসকদের কাছে নতজানু ভূমিকায় দেখা গেছে। ২০১৮ সালের বিনা ভোটের নির্বাচন যেখানে দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য হয়নি, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১শ শিক্ষক সে নির্বাচনের সাফাই গেয়ে বিবৃতি দেন।
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক শিক্ষা-গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টিতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পিছিয়ে- এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা পাকিস্তানের মতো দেশেরও একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম থেকে ৮০০-এর তালিকায় থাকে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান না থাকা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার করুণ চিত্রই তুলে ধরে।
দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি শুধু শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই ধ্বংস করেনি; শিক্ষকদের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতাও নষ্ট করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উঁচুমানের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও গবেষণায় চৌর্যবৃত্তিতে জড়াচ্ছেন।
আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের দেখাশোনায় যেখানে প্রতিটি হলে আবাসিক শিক্ষক ও প্রশাসন থাকেন; সেখানে শিক্ষার্থীদের মনে হয় একবিংশ শতাব্দীর দাসত্ব বরণ করে হলে থাকতে হয়। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল-মিটিংয়ে গেলে হলে থাকা যায়, না হলে যায় না; যাতে শিক্ষকদের সততা ও দায়িত্ববোধ প্রশ্নবিদ্ধ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের যেখানে গণমানুষের অধিকার আদায়ে গণতন্ত্র, সুশাসনের জন্য সোচ্চার দেখা যায়, সেখানে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার ছাত্র সংসদ নির্বাচন দীর্ঘ ২৮ বছর ছিল না। ২০১৯ সালে একবার অনুষ্ঠিত হলেও সেটি ধারাবাহিকভাবে আর হয়নি। ডাকসু না থাকাটা শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বড় অপূর্ণতা, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরও বিপরীত।
তাই প্রত্যাশা থাকবে, শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ইতিহাস-ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে শিক্ষা, গবেষণা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাবে। শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুযোগ-সুবিধা সংবলিত শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি উন্নত আবাসিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে মেধাবীদের জন্য শিক্ষকতা ও গবেষণায় সুযোগ সৃষ্টি করবে। সংকীর্ণ দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বের হয়ে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করবেন।
সাবেক ভিপি, ডাকসু